নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখন নির্বাচনে ব্যস্ত হয়ে উঠবে। এ অবস্থায় রাজনীতিকরা কীভাবে দেখছেন এ নির্বাচনকে? এ নিয়ে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রধান উপদেষ্টা কমরেড খালেকুজ্জামান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক জয়ন্ত সাহা।
খবরের কাগজ: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। এই নির্বাচন নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী? কেমন নির্বাচন হবে বলে ভাবছেন।
খালেকুজ্জামান: আমরা বলছি নির্বাচন হলো একটা দুর্ভাবনা কিংবা দুর্ঘটনা। আগামী নির্বাচন ঘিরে এই দুই বিষয় চলতে থাকবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় আয়োজন এখনো সম্পন্ন হয়নি। আয়োজনের শতভাগ তো দূরের কথা, আংশিকও বাস্তবায়ন করা যায়নি। যে কাজটি আমরা ভালোভাবে সম্পন্ন হওয়ার আশা করছি, তা শুধু আকাঙ্ক্ষায় থাকলে চলবে? নাকি তার পরিপূরক হিসেবে আয়োজনগুলো সম্পন্ন করতে হবে? নির্বাচনের কোনো পরিবেশ দেখছি না। ভোট নিয়ে জনগণের মধ্যেও আস্থার অভাব আছে। জনগণের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল মানুষের মধ্যে, তা বাস্তবায়িত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখছি না।
খবরের কাগজ: নির্বাচনের আগে অনেকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলছেন। আপনি কি মনে করেন এখন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রতিষ্ঠা হয়েছে? পরিস্থিতি আসলে কেমন মনে করছেন?
খালেকুজ্জামান: লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কথাটাই তো ত্রুটিযুক্ত। নির্বাচন কোনো খেলার মাঠ না যে একদল লোক খেলবে আর বাকি জনগণ তামাশা দেখবে। এখানে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর খেলা দেখার জন্য মানুষ গ্যালারিতে বসে থাকবে না। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ একটা নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলবে, সেই প্রক্রিয়াও তো গোলমেলে হয়ে গেছে। নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ হবে, জনগণ কোন শক্তির ওপর বেশি আস্থাশীল থাকবে, তা যেন দূরে সরে গিয়েছে। এখন কথাবার্তা চলছে টাকার খেলা আর পেশিশক্তি নিয়ে, চলছে প্রশাসনিক কারচুপি নিয়ে আলোচনা।
খবরের কাগজ: অন্তর্বর্তী সরকারের দুজন উপদেষ্টা পদত্যাগ করেছেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে তাদের এই পদত্যাগকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
খালেকুজ্জামান: ওরা সরকারি চাকরিতে ঢুকেছিল, চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। এটা আলোচনার কোনো বিষয় না। কিংস পার্টির সদস্য হিসেবে তারা সরকারি আনুকূল্যে, নানা পৃষ্ঠপোষকতায় উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দিয়েছিলেন। এখন আবার সেই চাকরি থেকে তারা ইস্তফা দিয়েছেন। ফলে তাদের অংশগ্রহণটাও কিন্তু যথার্থ ছিল না। আর এখন তারা বেরিয়ে আসায় তা আলোচনার কোনো বিষয়বস্তু হতে পারে বলে আমি মনে করি না।
খবরের কাগজ: জুলাই অভ্যুত্থানের পর একটা কথা খুব আলোচনায় এসেছিল, তা হলো- নতুন বন্দোবস্ত। বাম দলের নেতারাও অনেকবার বলেছেন নতুন বন্দোবস্তের কথা। নতুন বন্দোবস্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি কেমন দেখছেন?
খালেকুজ্জামান: এটা বন্দোবস্তের ব্যাপার না। একটা ব্যবস্থা ছিল, অর্থাৎ যেখানে কোটাবিরোধী আন্দোলন চলছিল, তা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে চলে আসে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন মানেই হলো- বৈষম্য যদি দূর করতে হয় তাহলে সমাজের ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। সমাজে শোষণমূলক অবস্থা বহাল রেখে বৈষম্যবিরোধী চেতনা বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব না। এবার গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন না। তবে এবারও জনগণের শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং শোষণের যে ব্যবস্থা, সেই ব্যবস্থাটাই বহাল থাকছে। তাহলে নতুন বন্দোবস্তের নামে শুধু টোটকা কবিরাজি দিয়ে সমাধান হবে না। রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
খবরের কাগজ: গণভোটের বিষয়ে সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে। গণভোটের মাধ্যমে কি লক্ষ্য পূরণ হবে? আপনি কী মনে করছেন?
খালেকুজ্জামান: এর আগে দেশে তিনটি গণভোট হয়েছে। দুটি ছিল সামরিক শাসকদের অধীনে, অপরটি ছিল পার্লামেন্টারি ফর্ম না প্রেসিডেনশিয়াল ফর্ম হবে, সে বিষয়ে। শেষটিতে মাত্র ৩৫ ভাগ ভোট পড়েছিল। ৩০ লাখের মতো ভোটার ‘না’ ভোট দিয়েছিল। ফলে অতীতের গণভোটের অভিজ্ঞতা ভালো না। এখন গণভোটের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটার সাংবিধানিক স্বীকৃতি নেই; যৌক্তিকতাও নেই।
খবরের কাগজ: জুলাই অভ্যুত্থানের পরে আপনি একাধিকবার বলেছেন, দেশে দক্ষিণপন্থি রাজনীতির বিকাশ হচ্ছে। এখন সেই রাজনীতি কোন দিকে মোড় নিয়েছে?
খালেকুজ্জামান: বামপন্থা দুর্বল হলে দক্ষিণপন্থা শক্তিশালী হবে, এটাই স্বাভাবিক। দক্ষিণপন্থার বিপরীতে বামপন্থা যতখানি শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে, তত দ্রুত এর অবসান ঘটবে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে। আমি বলব, ধর্মভিত্তিক দল হয় না। রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি ধর্ম যুক্ত করা হয় সুবিধা আদায়ের জন্য। আর্থিক, রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা অর্জন করার জন্য রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়। ধর্মকে রাজনীতির ময়দানে নিয়ে আসার মানে হলো এর পিছনে একটা অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে আনার উদ্দেশ্য মানুষের অর্জন, গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক চেতনা ও মূল্যবোধ নষ্ট করে দেওয়া। ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে আনার কুফল অতীতে আমরা অনেকবার দেখেছি। তাই এর পুনরাবৃত্তি বাংলাদেশে হবে, এটা মানুষ আশা করে না। তার পরও যখন উগ্র দক্ষিণপন্থার কথা আসছেই, এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলাই এখন দরকার।
খবরের কাগজ: এ সময়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
খালেকুজ্জামান: গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত লোকেরাই বলেন যে তারা লিখতে পারেন না, বলতে পারেন না। তাদের কলম চলে না। জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে যখন শাসন চলে তখন গণমাধ্যম মুক্ত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে না।