ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৭ মার্চ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টস্থ মইনুল রোডের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেই সময়ে তাকে রিমান্ডে নিয়ে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। তাকে চোখ বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়, উঁচু থেকে সিমেন্টের মেঝেতে ফেলে দিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে দেওয়া হয়, দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টাই চোখ বেঁধে রাখা হয়। তার মেরুদণ্ডের ৩৩টি হাড়ের দূরত্ব কমে যায়। কারণ মেরুদণ্ডের ৬ ও ৭ নম্বর হাড় ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। এই ভয়াবহ নির্যাতনের ফলে তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছিল। তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতেন না, বসতে পারতেন না। হুইলচেয়ার ও স্ট্রেচারই ছিল চলাফেরার উপকরণ।
তার ডান পায়ের পেশি শুকিয়ে গিয়েছিল, যার কারণে পঙ্গুত্বের ঝুঁকি ছিল। নির্যাতনের ফলে ব্যথায় তিনি অস্থির হয়ে পড়তেন। পেইন কিলার সেবনের কারণে তার কিডনিও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রিজন সেলের টয়লেটে পড়ে গিয়ে তখন মাথায়ও প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছিলেন। সেই সময়ে ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পেয়ে সপরিবারে লন্ডনে চিকিৎসার জন্য যান।
বিএনপির নেতা-কর্মীরা মনে করেন, ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সেই সময়ে তারেক রহমানকে মৃত্যুর ঝুঁকির পাশাপাশি রাজনীতি থেকে তাকে মাইনাস করার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। এরপর তাকে আর দেশে আসতে দেওয়া হয়নি। আজ সেই ১৭ বছরের অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে।
লন্ডনে প্রথম পাঁচ বছর তাকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। লন্ডনের ওয়েলিংটন হাসপাতাল, হ্যামারস্মিথ হাসপাতাল, কিংস ওক হাসপাতাল ও লন্ডন ক্লিনিকে তার চিকিৎসা হয়েছে। মেরুদণ্ডের একাধিক অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি তাকে দীর্ঘমেয়াদি থেরাপি দিতে হয়েছে। লন্ডনে পৌঁছার পরই তিনি বিশেষায়িত ফিজিওথেরাপি এবং নিউরোলজিক্যাল চিকিৎসা নেন। এর ফলে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। ২০১৩ সালের ২০ মে লন্ডনে তাকে প্রথম কোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে দেখা যায়। যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত ওই কর্মসূচিতে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তারেক রহমান নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান।
বিএনপির হাইকমান্ড বলছে, প্রায় ১৭ বছর লন্ডনে প্রবাসজীবন কাটিয়ে ব্রিটিশ গণতন্ত্র, গণমাধ্যম এবং সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনি। তার বিভিন্ন সভা ও সাক্ষাৎকারে এই অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি লক্ষ করেছেন, ব্রিটেনের মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় না। সেখানে শক্তিশালী জবাবদিহি বিদ্যমান রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও এমন একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালুর স্বপ্ন দেখেন তিনি, যেখানে শাসকগোষ্ঠী জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। লন্ডনে অবস্থানকালে ব্রিটিশ সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। তিনি বিভিন্ন সময় বলেছেন, তার বিশ্বাস, গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অপরিহার্য এবং গণমাধ্যমকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের সেবায় কাজ করতে হবে।