বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরায় দলের ভেতরে নতুন গতি এসেছে। অন্যদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন দল ও জোট নতুন করে তাদের কৌশল সাজানো শুরু করেছে। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন থেকে শুরু করে তার কর্মসূচি ঘিরে ব্যাপক জনসমাগম হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছেও যাচ্ছে নতুন বার্তা। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বক্তব্যও সুধী সমাজ থেকে সাধারণ জনগণ—সবার মাঝে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। দেশ পুর্নগঠনে ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ (আমার একটি পরিকল্পনা আছে) এমন ঘোষণা সবার মধ্যে প্রভাব ফেলেছে। তার দিকেই তাকিয়ে আছে দেশ ও দেশের জনগণ। তবে তারেক রহমান দেশে ফেরার পর দলের অনেক বিদ্রোহী প্রার্থীর দৌড়ঝাঁপ কমেছে। অথচ কয়েকদিন আগেও যারা ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ইচ্ছাপোষণ করেছিলেন।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে জাতীয় রাজনীতি ও বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি- দু্ই দিকেই গতি ফিরেছে। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াত ও এনসিপি নতুন পরিকল্পনা নিয়ে তৎপর হয়েছে। আগামী ৩ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামী ও ৯ জানুয়ারি চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন ঢাকায় মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছে। তবে শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচির পালনের নেপথ্যে জামায়াতের ভূমিকা আছে বলে রাজনীতিতে আলোচনা আছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাত্র দেড় মাস বাকি আছে। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে তারেক রহমান দেশে ফেরায় এখন বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ের সব নেতা-কর্মী পুরোদমে উজ্জীবিত। তারা যেন নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন। নির্বাচন ঘিরে তারা গা ঝাড়া দিতে শুরু করেছেন। সাংগঠনিক তৎপরতার পাশাপাশি নির্বাচনি প্রচারও পেয়েছে নতুন গতি। ইউনিট কমিটিগুলোও নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। দলটির একাধিক নীতিনির্ধারক বলেছেন, নির্বাচন ঘিরেও দল ও দেশ পরিচালনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তৈরি করেছেন তারেক রহমান। এখন সমগ্র দেশে তা ছড়িয়ে দেবেন। প্রতিটি খাত ধরে ধরে পরিকল্পনা তৈরি করেছেন। ইতোমধ্যে আট খাতের পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ আকারে প্রকাশ করেছেন। যেমন–ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড, কৃষি কার্ড, কৃষকদের ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে এসে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা ইত্যাদি। নির্বাচনি ইশতেহারে আরও বিশদভাবে তুলে ধরা হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরায় নেতা-কর্মীরা এখন উজ্জীবিত। জনগণ এতদিন একধরনের অস্বস্তির মধ্যে ছিল, তাদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরে এসেছে। তাকে ঘিরে জনগণ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। দেশে উগ্রবাদী যে একটা গোষ্ঠী ছিল, তারা এখন স্তিমিত হয়ে গেছে। আগামী দিনে তারেক রহমান যত বেশি মুভমেন্ট করবেন, তত বেশি চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদী গোষ্ঠী নিস্তেজ হযে পড়বে।’
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে দলের রাজনৈতিক বার্তা আরও স্পষ্ট ও ধারাবাহিক হচ্ছে। প্রবাসে থাকার কারণে অনেক সময় সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হতো। কিন্তু এখন আর সেই সমস্যা নেই। নির্বাচনকেন্দ্রিক বার্তা, স্লোগান ও কর্মসূচি আরও গোছানোভাবে মাঠে নামার পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, তারেক রহমান দেশে ফেরায় নির্বাচনি কার্যক্রমে নতুন গতি এসেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত বিএনপির সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর নেতা-কর্মীরা নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তাদের মধ্যেও কাজের তাগিদ বেড়েছে। তাদের বিশ্বাস, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বিএনপির রাজনীতিতে নতুন গতি এনে দেবে।
জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের পাল্টা শোডাউনের প্রস্তুতি
তারেক রহমান দেশে ফেরার পর টাইমলাইন থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপিসহ অন্য দলগুলো। তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও ভেতরে ভেতরে বড় শোডাউনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন। আগামী ৩ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামী মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও ৯ জানুয়ারি চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছে। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মতোই সারা দেশ থেকে নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ঢাকায় এনে জনসমাগম করার টার্গেট রয়েছে দল দুটির। এই মহাসমাবেশ সফল করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। সেখানে নির্বাচন নিয়ে বিএনপিকে নতুন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন তারা।
জামায়াতের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের সমাবেশে কয়েক লাখ নেতা-কর্মী ও সমর্থক জমায়েত করার চেষ্টা করা হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায় থেকেও লোকজন সমাবেশে যোগ দেবে।
আসন সমঝোতা নিয়ে ১০ দলের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন
বর্তমানে জোট গঠন বা আসন্ন সমঝোতা নিয়ে জামায়াতে ইসলামীসহ আট দল ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ তিনদলীয় জোটেও টানাপোড়েন চলছে। আজ রবিবার ১০ দলের মধ্যে আসন সমঝোতার ঘোষণা আসতে পারে। তবে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ ভাঙনের সুর। জোট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। এ ছাড়া এনসিপির মধ্যেও দেখা দিয়েছে নানা সংকট। দল থেকে ইতোমধ্যে যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারাসহ দুজন পদত্যাগ করেছেন। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, এনসিপি থেকে তিন-চারজন কেন্দ্রীয় নেতা বিএনপিতে যোগ দিতে পারেন।
জোট ও আসন সমঝোতা প্রসঙ্গে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, দলের বৈঠকে জামায়াতের সঙ্গে জোট বা আসন সমঝোতা নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ উভয় মতামতই এসেছে। এসব মতামত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। দু-এক দিনের মধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
অন্যদিকে জামায়াত ও সমমনা আটদলীয় জোটেও আসন সমঝোতা নিয়ে চলছে টানাপোড়েন। ইতোমধ্যে জামায়াতকে ১৫০ আসন রেখে বাকি ১৫০ আসন ৭ দলকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন। তবে জামায়াত এত আসন দিতে রাজি হয়নি। তারা সর্বোচ্চ ১০০ আসনের মতো ছাড় দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল শনিবার গভীর রাত পর্যন্ত ১০ দলের মধ্যে আলোচনা চলে। আজ রবিবার আসন সমঝোতা নিয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে।
জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধান খবরের কাগজকে বলেন, আট দলের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে। সব দলই একত্র থাকছে, কেউ কোথাও যাচ্ছে না। আগামীকাল (আজ রবিবার) চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে।
যা বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমান দেশে ফেরায় জাতীয় রাজনীতি নতুন মোড় নিয়েছে। সামগ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। একদিকে নির্বাচন নিয়ে যত অনিশ্চয়তা ছিল, তা দূর হয়ে গেছে। অন্যদিকে তার নেতৃত্বে বিএনপি পুনর্জাগরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরা ইতিবাচক। জনগণের মধ্যেও স্বস্তি ফিরেছে। নির্বাচন হবে, এ ব্যাপারে সবাই আশাবাদী। তিনি (তারেক রহমান) দল ও জোট গোচ্ছেন। দলের মধ্যেও নতুন প্রাণসঞ্চার হয়েছে। তবে নির্বাচনি আবহ এখনো তৈরি হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এখনো উন্নতি হয়নি। নির্বাচনে সহিংসতা রোধ করতে সরকার ও সব দলকে উদ্যোগী হতে হবে।