আসন্ন সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা শেষ হচ্ছে আজ সোমবার। কয়েক দিন পরে নির্বাচনি প্রচার শুরু করবেন প্রার্থীরা। ইতোমধ্যে কথার লড়াই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে। এই শোরগোলে নির্বাচন নিয়ে খবরের কাগজকে নিজস্ব ভাবনার কথা বলেছেন সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খবরের কাগজের নিজস্ব প্রতিবেদক জিয়াউদ্দিন রাজু।
খবরের কাগজ: নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়েছে। সিপিবির পক্ষ থেকে অনেক দিন ধরে একটি ‘ভালো নির্বাচনের’ কথা বলা হচ্ছে। সেই ‘ভালো’ নির্বাচনের পরিবেশ দেখছেন এখন?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: আমরা অনেক দিন ধরে বলছি, নির্বাচনব্যবস্থার আমল সংস্কার করা খুব জরুরি। সেই কাজটা হয়নি। খুব ভালো নির্বাচনের জন্য ভোটে দাঁড়ানো এবং ভোট প্রদানে সমঅধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছিলাম। নির্বাচনের আগে সেটি হয়নি। গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা শুরু করার জন্য যে ধরনের পরিবেশ চেয়েছিলাম, পুরোটা না হলেও যে পরিবেশ এখন আছে তার মধ্যে কতটা ভালো নির্বাচন করা যায়, তা আমাদের ভাবতে হবে।
খবরের কাগজ: নির্বাচন সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: এখন টাকা না থাকলে, পেশিশক্তি না থাকলে কেউ ভোটে দাঁড়াতে পারে না। আমরা বলেছি পাঁচটি দুরবস্থা থেকে নির্বাচনকে মুক্ত করতে হবে। এক নম্বর হচ্ছে টাকার খেলা; দুই নম্বর পেশিশক্তির দাপট, তিন নম্বর ভয়ের রাজত্ব, চার নম্বর সাম্প্রদায়িক প্রচার-প্রচারণা, পাঁচ নম্বর প্রশাসনিক কারসাজি। নির্বাচনের সব দায়দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন গ্রহণ করলে টাকার খেলা বন্ধ করা যেত। কিন্তু তারা সেটি করেনি। ফলে ভোটে দাঁড়ানোর সমঅধিকার কিন্তু আমাদের সবার নাই।
খবরের কাগজ: আপনি কী বলতে চাইছেন, নির্বাচনে প্রার্থী হতে এখনো নানা প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: সে তো রয়েই গেছে। এবার নির্বাচনের আগে অন্যতম বড় সংকট হলো সাম্প্রদায়িক প্রচার-প্রচারণা। সাম্প্রদায়িক দাপট ধর্মের অপব্যবহারকে এখন এমন একটা জায়গায় নিয়ে গেছে যে, অনেক দল বলছে ‘জান্নাতে যেতে হলে অমুক মার্কায় ভোট দিতে হবে।’
অথচ এ ধরনের প্রচার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন ছিল। আমরা মনে করি, ভোটে দাঁড়ানো এবং ভোট দেওয়ার সমঅধিকার নিশ্চিত করার জন্য যে পাঁচটি দুরবস্থার কথা বললাম, সেটি রোধ করতে পুরো নির্বাচনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো দরকার ছিল। সেটি এখনো হয়নি। কিন্তু এবার আমি সেটি প্রত্যাশা করছি না। আমরা যতটুকু হয়েছে তার মধ্য দিয়েই নির্বাচনের যে তারিখ ঘোষিত হয়েছে, সেই সময়ে একটি ভালো নির্বাচন সম্পন্ন করা দরকার বলে মনে করি।
খবরের কাগজ: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আপনি সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করছেন। নির্বাচনের আগে এ ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি কি হয়েছে? কোথায় আরও কাজ করতে হবে?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: এখনো মব সন্ত্রাস চলছে। তাই যারা মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন এটিই প্রধান কাজ। ধর্মের অপব্যাখ্যা বন্ধ করতে হবে। সব প্রার্থী যেন সমান সুযোগ পান, সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে বিশেষ ভূমিকা নিতে হবে। মানুষ যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন তার জন্য এই ন্যূনতম ব্যবস্থা নিতে হবে। এই কাজগুলো যদি আমরা করতে পারি, তাহলে আমার ধারণা, কিছুটা সফলতার সঙ্গে নির্বাচনের যাত্রাটা শুরু করতে পারব।
খবরের কাগজ: নির্বাচনের আগে প্রশাসনিকব্যবস্থা কেমন দেখছেন?
রুহিন হোসেন প্রিন্স: মব সন্ত্রাস বন্ধ করা যায়নি, তাই প্রশাসনের যথাযথ ভূমিকা এখনো দেখতে পাচ্ছি না। নির্বাচনি প্রচারে প্রার্থীরা কে কত টাকা খরচ করতে পারবেন, তা বেঁধে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আমরা মনে করি, এই টাকার পরিমাণ আরও কমানো দরকার ছিল। নির্বাচনের শুরুতেই তো ভোট কোটি টাকার উৎসব হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের কোনো ভূমিকা দেখতে পাচ্ছি না।
খবরের কাগজ: নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। গণভোট নিয়ে সিপিবি ও অন্য বাম দলগুলোর প্রবল আপত্তি আছে....
রুহিন হোসেন প্রিন্স: আমরা প্রথম দিন থেকে বলেছি এই মুহর্তে গণভোট অপ্রয়োজনীয়। ধরেন, আপনি ভোট দিতে গেলেন। আপনি সব পয়েন্টে একমত নন। কিছু পয়েন্টে একমত, আবার কিছু পয়েন্টে একমত নন। তাহলে আপনি কি ভোট দেবেন! হ্যাঁ আর না ছাড়া কোনো অপশন নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম কোনো ভোট হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
গণভোটের বিধান সংবিধানে নেই। সংবিধানে তা যুক্ত করতে গেলে আগামী সংসদ অধিবেশনে করতে হবে। গণভোট করতে হলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংশোধনী আনতে হবে, তাতে জনগণের মতামত নিতে হবে। গণভোটের বিষয়টা জনগণের ওপর ছেড়ে দিলেই ভালো।