ঢাকা ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
পটিয়ায় যুবক খুন কাপ্তাই হ্রদে ডুবে চবি শিক্ষার্থীর  মৃত্যু শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁতীদলের আলোচনা সভা সরকারি বাঙলা কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা ১০ জুলাই জবিতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের প্রকাশ্যে মানববন্ধন পটিয়া প্রেস ক্লাব কার্যালয় দখলচেষ্টার অভিযোগে থানায় অভিযোগ অনার্স কোর্স থেকে বাংলা ও ইতিহাস বাদ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই: শিক্ষামন্ত্রী ‘শর্ত সাপেক্ষে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা’ মানিকগঞ্জে পতাকা টাঙাতে গিয়ে ব্রাজিল সমর্থকের মৃত্যু সিংড়ায় তিন কুকুর টেনে তুলল মায়ের বস্তাবন্দি মরদেহ! কোথায় আমাদের সতর্ক থাকা উচিত? ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াত ইসলামও ইসলাম নয় শাহরাস্তিতে সরকারি গাছ কাটার ঘটনায় বিএনপি নেতার সাফাই নারায়ণগঞ্জে ময়লার গাড়িরচাপায় ছাত্রদল নেতাসহ নিহত ২ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারে ৫০ বিলিয়ন ইয়েন ঋণ সহায়তা দেবে জাপান ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে বৈশ্বিক যোগসূত্র স্থাপন করতে চায় বাংলাদেশ’ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয় পদ্মা সেতুতে সৌরবিদ্যুতের ইতিবাচক প্রভাব, এক মাসেই সাড়ে ৪ লাখ টাকা সাশ্রয় বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে বয়স বৃদ্ধি ও বেসরকারি চিকিৎসকদের বেতন কাঠামোর সুপারিশ হেডফোন লাগিয়ে হাঁটার সময় ট্রেনের ধাক্কায় কিশোর নিহত গাজীপুরে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে গ্রেপ্তার সিলেটে স্কুলছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যু, মরদেহর ময়নাতদন্ত না করতে চিরকুট! রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ: এনবিআরের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত? ভূমিকম্পে ক্ষতির বড় কারণ শুধু কম্পন নয়, বরং খারাপ মানের ডিজাইন ও নির্মাণ পাকিস্তানে টিটিপি’র হামলায় ৬ আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য নিহত চমেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট, শৃঙ্খলা ফেরাতে ৬ নির্দেশনা জাতীয় পরিবেশ পদক পেলেন ঢাবি উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সালাম চীনের পরিবেশবান্ধব গাড়ি রপ্তানি দ্বিগুণ বেড়েছে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে ১৪৯৬ কোটি টাকা জরিমানা: অর্থমন্ত্রী ঝিনাইদহে ভাতিজার লাঠির আঘাতে চাচার মৃত্যু
Nagad desktop

এস.আলমের নাগরিকত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি: বাস্তব তথ্য ও আইনি প্রেক্ষাপট

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৫, ১০:১৯ এএম
আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০২৫, ১০:২৩ এএম
এস.আলমের নাগরিকত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি: বাস্তব তথ্য ও আইনি প্রেক্ষাপট
প্রতীকী ছবি

সম্প্রতি দেশের কিছু মিডিয়া ও দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের মুখে একটি নাম বারবার পুনরুচ্চারিত হচ্ছে - ‘এস. আলম গ্রুপের মালিক সিঙ্গাপুরে পালিয়ে গেছেন, দেশে তাদের কিছুই নেই।’

এই বক্তব্য শুধু তথ্যভিত্তিক বিভ্রান্তি নয়, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জনমনে ঘৃণা ও আস্থাহীনতা ছড়ানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। তাই বিষয়টি তথ্যের আলোয় বিশ্লেষণ করা জরুরি।

নাগরিকত্ব নেওয়া আইনসম্মত, অপরাধ নয়
মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তার পরিবারের সদস্যরা ২০১১ সালে সিঙ্গাপুরে স্থায়ীভাবে বসবাসের (Permanent Residency) অনুমতি পান। পরবর্তীতে ২০২০ সালে তারা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, যা একটি সম্পূর্ণ আইনগত ও স্বীকৃত প্রক্রিয়া।

অনেক আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তার মতো তারাও গ্লোবাল ব্যবসা, নিরাপত্তা ও কর-কৌশলগত কারণে এই সিদ্ধান্ত নেন। এটি কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ ছিল না। বাংলাদেশের পাসপোর্ট তারা নিয়ম মেনে সরকারের কাছে ফেরত দেন। 

সিঙ্গাপুর যেহেতু দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদন করে না, তাই এটি ছিল একটি স্বাভাবিক নিয়ম মাফিক পদক্ষেপ।

আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কী বোঝায়?
কোনো দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করা আন্তর্জাতিক আইনে বৈধ। কেউ নাগরিক পরিবর্তন করলেই তাকে ‘অপরাধী ’ বা ‘পলাতক’ বলা চলে না।

বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি (BIT, 2004) রয়েছে। এই চুক্তির আওতায়, সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে এস. আলম গ্রুপের কর্ণধাররা বাংলাদেশে ব্যবসা চালালে সেই বিনিয়োগের উপর জোরপূর্বক দখল, রাজনৈতিক হয়রানি বা বৈষম্যমূলক আচরণ করলে তারা আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনালের আশ্রয় নিতে পারবেন।

তাহলে দেশে তাদের কী কিছু নেই?
যারা বলছেন ‘তারা লুট করে পালিয়েছে ’, তাদের কাছে প্রশ্ন - তাহলে কেন এস. আলম গ্রুপের দেশে ২ দশমিক ৫ লাখ কোটি (আড়াই লাখ কোটি) টাকার বেশি বিনিয়োগ এখনো বহাল আছে?

তাদের ব্যাংকে স্থিতির পরিমান প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা; আবাসন, শিল্প ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা; বিভিন্ন কোম্পানিতে শেয়ার ও অংশীদারত্ব প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা। এসব তথ্যই প্রমাণ করে, তারা দেশ থেকে অর্থ পাচার করে পালাননি, বরং দেশের ভেতরেই সবচেয়ে বড় শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে অর্থনীতির একটি বড় অংশে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন।

দূরভিত্তিক প্রচারণার উদ্দেশ্য কী?
এস. আলম গ্রুপের নাগরিকত্ব, সম্পদ ও ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ ঘিরে একটি রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যপ্রসূত প্রচারণা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রণ হারানোর পরই হঠাৎ ‘অপরাধী’ হিসেবে মিডিয়ায় প্রচার করা হচ্ছে। ৯ বছরের ব্যাংক পরিচালনায় যখন গ্রাহকদের কোনো অভিযোগ ছিল না, তখন কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এখন যখন নিয়ন্ত্রণ অন্যদের হাতে, তখন দায় চাপানো হচ্ছে আগের মালিকদের ঘাড়ে - যারা ইতোমধ্যেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

আমাদের অবস্থান কী হওয়া উচিত?
আমরা চাই আইনভিত্তিক তদন্ত হোক, যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধ আছে তাদের বিচার হোক। কিন্তু নাগরিকত্বকে অস্ত্র বানিয়ে কাউকে সামাজিকভাবে নিঃশেষ করার অপপ্রয়াস গ্রহণযোগ্য নয়। একজন ব্যবসায়ী আন্তর্জাতিক নাগরিক হতে পারেন, বিনিয়োগ ছড়িয়ে দিতে পারেন - তাতে তার দেশপ্রেম বা দায়িত্ববোধ কমে না। বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব সঠিক তথ্য দিয়ে জনমনে আস্থা ফেরানো, গুজব না ছড়ানো।

উপসংহার: 
তথ্যের ওপর ভিত্তি হোক আলোচনার
একটি দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় - আস্থাহীনতা ও বিভ্রান্তি। এস. আলম গ্রুপের মতো যেকোনো বৃহৎ বিনিয়োগকারীকে মূল্যায়ন করতে হলে সেটা হোক আইনের আলোকে, বাস্তবতার ভিত্তিতে - not through whispers of populist outrage। সত্য বলুন। বিভ্রান্তি নয়। গণমিথ্যা কিংবা ঘৃণার রাজনীতি মাতৃভূমি তথা আমাদের কারও জন্যই ভালো নয়।

আরিফ রেজা: বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বিনিয়োগ বিষয়ক লেখক

রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ: এনবিআরের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:০৩ পিএম
রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ: এনবিআরের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের নানা হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে। সরকার যেহেতু ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে, তাই প্রথমে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন; পরে সে অনুযায়ী আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে ব্যয়ের দিক থেকে সরকার চেষ্টা করে কতটা সংকোচন করা যায়, অর্থাৎ ব্যয় কতটা কমানো সম্ভব। অপরদিকে, আয়ের ক্ষেত্রে সরকার চেষ্টা করে কীভাবে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা যায়। আয়ের খাত যত বৃদ্ধি পাবে, সরকার তত বেশি আর্থিকভাবে নিশ্চয়তা লাভ করবে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর বছরে ন্যূনতম ১ হাজার টাকা ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন খাতে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধির পরিকল্পনাও করছে এনবিআর। অর্থাৎ, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর অন্যতম কৌশল হিসেবে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান সরকার অগ্রিম কর বৃদ্ধির পরিকল্পনাও করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকার কেন ভ্যাট ও আয়কর বৃদ্ধির এই পরিকল্পনা গ্রহণ করছে? একই সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–এ উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং আদৌ কতটা সফল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে?

সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বাজেট বৃদ্ধি করছে। ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারকে আয় বৃদ্ধি করতে হবে, অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি ঘটাতে হবে। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সুতরাং, শুধু বর্তমান অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলেও আগামী অর্থবছরে ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে হবে। এ কারণেই যাদের মোট বার্ষিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকা, তাদের কাছ থেকে বছরে ১ হাজার টাকা ভ্যাট আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককেই বহন করতে হবে। 

বর্তমান সরকার আগামী অর্থবছরেই ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ লাখ থেকে ২০ লাখে উন্নীত করতে চায়। অথচ বর্তমানে নিবন্ধিত ৮ লাখ প্রতিষ্ঠানের সবাই নিয়মিত ভ্যাট প্রদান করে না। এর মধ্যে মাত্র সাড়ে ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট দেয়। আবার যারা ভ্যাট প্রদান করে, তারা সবাই সঠিকভাবে ভ্যাট দেয় কি না, সে বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অন্যদিকে অবশিষ্ট আড়াই লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ভ্যাট প্রদান করে না এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি।

সুতরাং প্রশ্ন থেকেই যায়, এ সংখ্যা ৮ লাখ থেকে ২০ লাখে উন্নীত করা কতটা সম্ভব হবে? আর যদি তা সম্ভবও হয়, তাহলে সবাই কি সঠিকভাবে ভ্যাট প্রদান করবে? আমাদের দেশে যারা ভ্যাট বা আয়কর প্রদান করেন, তাদের শনাক্ত করা এবং অডিট করার জন্য পর্যাপ্ত কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু যারা ভ্যাট বা আয়কর দেন না, অথচ যাদের তা দেওয়ার সামর্থ্য ও যোগ্যতা উভয়ই রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করার জন্য রাষ্ট্র কিংবা এনবিআরের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা খুব একটা দেখা যায় না। ফলে যারা নিয়মিত ভ্যাট প্রদান করেন, তাদের অনেকের মধ্যেই এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে ভ্যাট দেওয়ার চেয়ে না দেওয়াই যেন সুবিধাজনক। অন্যদিকে, যারা আয়কর বা ভ্যাট প্রদান করেন, তারাও সব সময় যে সঠিক ও পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাবের ভিত্তিতে তা দেন, এমনটিও নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভুল বা শুদ্ধ–যেভাবেই হোক, তারা অন্তত কর ও ভ্যাট প্রদান করছেন। তাহলে যারা একেবারেই ভ্যাট বা আয়কর দেন না, তাদের কেন আমরা কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারছি না?

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দেশের কল্যাণে কতটুকু নিবেদিত? রাষ্ট্রের স্বার্থে তাদের আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীলভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক নাগরিকেরও নিজের অধিকার ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, দৈনিক কালবেলা পত্রিকায় ৪ জুন ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘রয়্যালটি কমিয়ে ২০০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজারের মহেশখালীতে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে নির্মাণাধীন ‘মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড’ প্রকল্পে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন এবং শতকোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্র রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য যতই চেষ্টা করুক না কেন, বাস্তবতা অনেকটা সর্ষের মধ্যে ভূতের মতো। একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সে প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অপরদিকে, অনেক করদাতাও ভ্যাট বা আয়কর পরিশোধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যাদের মোট বার্ষিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকা, তাদের জন্য বছরে ১ হাজার টাকা ভ্যাট প্রদান করার কথা কোনো বড় বিষয় হওয়ার কথা নয়। তার পরও অনেকে বিভিন্ন উপায়ে কীভাবে কর ফাঁকি দেওয়া যায়, সেই পথ খোঁজেন। দেখা যায়, এনবিআরে নিবন্ধিত হিসাবে যে ব্যাংক হিসাবের তথ্য দেওয়া আছে, অনেকেই বাস্তবে সেই হিসাবে লেনদেন করেন না। আবার যারা রাষ্ট্রের হয়ে দায়িত্ব পালন করেন, তাদের মধ্যেও অনেকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে দেশের যে পরিমাণ উন্নয়ন হওয়ার কথা, তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। আরও একটি উদাহরণ হলো–গত মে ৫, ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ হিমাগার মালিক সমিতিকে চিঠি দেয় এনবিআর। প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনটির সভাপতি বলেন, যারা সংগঠনের সদস্য নন তাদের তথ্য আমরা দিতে পারব না। আর সদস্যরা বলবেন, ‘সদস্য হয়ে আমরা বিপদে পড়েছি।’ এতে সমিতি দুর্বল হবে, ব্যবসায়ীদের আস্থা কমবে। এ ধরনের চিন্তা অবিবেচনাপ্রসূত এবং দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা। ঠিক যেন রাষ্ট্রের চেয়ে সংগঠন বড়, সংগঠনের চেয়ে ব্যক্তি।

অপরদিকে, সরকার যদি আয়কর বৃদ্ধির তুলনায় ভ্যাট বৃদ্ধি করাকে সহজতর মনে করে, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতিও এক ধরনের পরোক্ষ কর, যার প্রভাব থেকে একজন দিনমজুরও রেহাই পান না। আবার ভ্যাট বৃদ্ধি করা হলে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা সরকারের সাফল্য অর্জনের পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি বছরে যে আয় করেন, তার করযোগ্য আয়ের অংশ ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি হলেই তিনি আয়কর প্রদান করবেন। অর্থাৎ তার আয়কর দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে বলেই তিনি আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী সরকার তথা এনবিআরকে আয়কর প্রদান করবেন। কিন্তু সরকার যদি কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করে, তবে তা আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও এর প্রভাব হবে ব্যাপক। কারণ এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা একজন দিনমজুরও এড়াতে পারবেন না। অথচ আয়কর আদায় বৃদ্ধি পেলে মূলত যারা আয়কর দেওয়ার যোগ্য, তারাই এর প্রত্যক্ষ প্রভাব বহন করবেন। নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠী এ ধরনের করের প্রভাব থেকে অনেকাংশে মুক্ত থাকবে। তাই রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। আমাদের দেশে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো প্রায়ই এমন কৌশল খোঁজে, যার মাধ্যমে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে কর-সুবিধা কিংবা আয়কর মওকুফের সুযোগ নেওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে সরকারও ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাদের সেই সুবিধা দিতে বাধ্য হয়। এর ফলে গত কয়েক দশকে বিত্তবান শ্রেণি আরও বেশি সম্পদশালী হয়েছে, অথচ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ তাদের আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারেনি।

সরকারের বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার কারণে রাষ্ট্রের এই কঠিন সময়ে সফল হওয়ার অন্যতম প্রধান উপায় হলো সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। তবেই হয়তো আমাদের দেশেও মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আয়কর ও ভ্যাট প্রদান করতে উৎসাহিত হবে। যখন নাগরিকরা দেখবেন যে তাদের প্রদত্ত কর সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে, তখন কর প্রদানের প্রতি তাদের আস্থা ও আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে এবং উন্নয়নের সুফল পৌঁছে যাবে প্রতিটি মানুষের কাছে। সর্বোপরি, রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন তখনই সম্ভব হবে, যখন সরকার ও নাগরিক উভয়েই নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশীদার হবে দেশের প্রতিটি মানুষ ও প্রতিটি নাগরিক।

লেখক: ব্যাংকার ও লেখক
[email protected]

ভূমিকম্পে ক্ষতির বড় কারণ শুধু কম্পন নয়, বরং খারাপ মানের ডিজাইন ও নির্মাণ

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:০১ পিএম
ভূমিকম্পে ক্ষতির বড় কারণ শুধু কম্পন নয়, বরং খারাপ মানের ডিজাইন ও নির্মাণ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি করতে পারে। তবে প্রকৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো–ভূমিকম্পে মানুষ সাধারণত কম্পনের কারণে মারা যায় না; বরং ভবন, সেতু ও অন্যান্য কাঠামো ধসে পড়ার কারণেই অধিকাংশ প্রাণহানি ঘটে।

একই মাত্রার ভূমিকম্পে কোনো কোনো ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়ে, আবার কোনো ভবন সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই পার্থক্যের মূল কারণ ডিজাইনের মান, নির্মাণের গুণগত মান এবং প্রকৌশলগত নিয়ম মেনে কাজ করা হয়েছে কি না। তাই বলা যায়–ভূমিকম্প নয়, দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ ভবনই মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু।

কেন ডিজাইন এত গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকম্পের সময় মাটির কম্পনের কারণে ভবনের ওপর বিভিন্ন ধরনের বল কাজ করে। ভবনের নিজস্ব ওজনের পাশাপাশি অতিরিক্ত গতিশীল বল (Dynamic Force) সৃষ্টি হয়।
প্রধানত দুই ধরনের বল গুরুত্বপূর্ণ: অনুভূমিক বল (Lateral Force)। ভূমিকম্পে মাটি ডানে-বামে কাঁপে। ফলে ভবনের ওপর অনুভূমিক বল কাজ করে। সাধারণত ভবনগুলো উল্লম্ব লোড (নিজস্ব ওজন) বহনের জন্য বেশি প্রস্তুত থাকে, কিন্তু ভূমিকম্পের অনুভূমিক লোড ভবনের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। গতিশীল বল (Dynamic Load)। ভূমিকম্প একটি গতিশীল ঘটনা। কম্পনের ফলে ভবনের বিভিন্ন অংশে ত্বরণ (Acceleration) সৃষ্টি হয়, যা অতিরিক্ত বল তৈরি করে। ভবনের ওজন যত বেশি, তত বেশি ভূমিকম্পীয় বল সৃষ্টি হয়।

খারাপ ডিজাইনের প্রধান সমস্যাসমূহ
Soft Storey (দুর্বল নিচতলা): বাংলাদেশে অনেক ভবনের নিচতলা গ্যারেজ, দোকান বা খোলা জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে নিচতলায় দেয়াল কম থাকে এবং কাঠামোগত দৃঢ়তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ভূমিকম্পের সময় ওপরের তলাগুলো তুলনামূলক শক্ত থাকলেও নিচতলা অতিরিক্ত বিকৃত হয়।
একে বলা হয়: Soft Storey Failure। এর ফলে পুরো ভবন একসঙ্গে নিচের দিকে ধসে পড়তে পারে। অনেক ভূমিকম্পে দেখা গেছে যে, পার্কিং ফ্লোরযুক্ত ভবনগুলো প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। Irregular Shape (অসামঞ্জস্যপূর্ণ আকৃতি): স্থাপত্যগত সৌন্দর্যের জন্য অনেক সময় L-Shape, U-Shape বা অন্যান্য জটিল আকৃতির ভবন নির্মাণ করা হয়।

সমস্যা কোথায়
ভূমিকম্পের সময় ভবনের সব অংশ সমানভাবে নড়াচড়া করে না। ফলে ভবনের ওপর Torsion (মোচড়) Uneven Stress Distribution Concentrated Damage সৃষ্টি হয়। ফলে একটি অংশে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে কাঠামোগত ব্যর্থতা ঘটতে পারে। নিম্নমানের উপকরণ ও নির্মাণকাজ: ডিজাইন যত ভালোই হোক, নিম্নমানের নির্মাণকাজ পুরো প্রকল্পকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। নিম্নমানের সিমেন্ট ব্যবহার, অপর্যাপ্ত রড, অপর্যাপ্ত কংক্রিট কভার, ভুল রড বাঁধাই, পর্যাপ্ত curing না করা। এর ফলে কংক্রিটের শক্তি কমে যায় এবং ভূমিকম্পের সময় কাঠামো ভেঙে পড়ে। সঠিক Load Path না থাকা। Roof→Beam→Column→Foundation. যদি Load Path সঠিক না হয় তাহলে স্থানীয়ভাবে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। কিছু অংশ হঠাৎ ব্যর্থ হয় অর্থাৎ Progressive Collapse শুরু হতে পারে। ফলে পুরো ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দুর্বল কলাম–শক্তিশালী বিম সমস্যা।

ভূমিকম্পপ্রতিরোধী ডিজাইনের একটি মৌলিক নীতি হলো: Strong Column–Weak Beam
অর্থাৎ কলাম হবে শক্তিশালী এবং বিম তুলনামূলক দুর্বল। ভূমিকম্পের সময় বিম ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবন সাধারণত দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু কলাম ব্যর্থ হলে পুরো ভবন ধসে পড়তে পারে। তাই আধুনিক ভূমিকম্প প্রতিরোধী ডিজাইনে কলামকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কীভাবে ভালো ডিজাইন জীবন বাঁচায়? Ductility (নমনীয়তা): ভূমিকম্পের সময় একটি ভালো ভবন সম্পূর্ণ শক্ত ও অনমনীয় হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ভবন এমনভাবে ডিজাইন করা উচিত যাতে এটি: শক্তি শোষণ করতে পারে। কিছুটা বাঁকতে পারে। হঠাৎ ভেঙে না পড়ে: এটাই Ductility। Redundancy (বিকল্প লোড বহন ব্যবস্থা): ভালো ডিজাইনে একাধিক Structural System থাকে। একটি উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য অংশগুলো লোড বহন করতে পারে। ফলে সম্পূর্ণ ধসের সম্ভাবনা কমে যায়।

Regularity (সুষম বিন্যাস): সুষম আকৃতির ভবনে Stress Distribution ভালো হয়। Torsion কম হয়। ভূমিকম্পের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকে। Code Compliance (কোড অনুসরণ): ভূমিকম্প প্রতিরোধী ডিজাইনের জন্য অবশ্যই প্রযোজ্য বিল্ডিং কোড অনুসরণ করতে হবে।
বাংলাদেশে: BNBC (Bangladesh National Building Code)। আন্তর্জাতিকভাবে: ACI, ASCE, ,IBC. Eurocode-এর নীতিমালা অনুসরণ করা হয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতা: বিশেষ করে ঢাকা শহর একটি ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। বর্তমানে অনেক প্রধান সমস্যাগুলো অনুমোদিত ডিজাইন অনুসরণ না করা। প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানের অভাব। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী। অতিরিক্ত তলা নির্মাণ। পুরোনো ভবনের কাঠামোগত মূল্যায়ন না করা। সঠিক Soil Investigation না করা। এসব কারণে ভূমিকম্পের সময় ক্ষতির ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়।

নেপাল ভূমিকম্প ২০১৫–একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ। ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছিল। তদন্তে দেখা যায় দুর্বল নকশা, অপর্যাপ্ত রড, নিম্নমানের কংক্রিট, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ, ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম কারণ ছিল। অন্যদিকে সঠিক প্রকৌশল নীতিতে নির্মিত অনেক ভবন উল্লেখযোগ্যভাবে টিকে ছিল। এটি প্রমাণ করে ভালো ডিজাইন জীবন বাঁচায়। প্রকৌশলীদের করণীয়: Structural Analysis নিশ্চিত করা, Static Analysis, Dynamic, Analysis, Response Spectrum Analysis, প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হবে। Seismic Load বিবেচনা করা: ডিজাইনের শুরু থেকেই ভূমিকম্পীয় লোড অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। Proper Detailing নিশ্চিত করা, Beam-Column Joint, Stirrup Spacing, Anchorage Length, Lap Splice সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। Construction Supervision জোরদার করা। ডিজাইন অনুযায়ী নির্মাণ হচ্ছে কি না তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

ভূমিকম্প থামানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, প্রকৌশল নকশা, মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী এবং দক্ষ তদারকির মাধ্যমে ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
একটি নিরাপদ ভবন কেবল ইট, বালি, সিমেন্ট ও রডের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রতীক।

লেখক: প্রকৌশলী বিভাগীয় প্রধান, প্রকৌশল বিভাগ, স্টুডিও ডিএনএ, প্রতিষ্ঠাতা, হেলদি কংক্রিট ও হেলদি এডুকেশন

নারীর নিরাপত্তা নিয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতা

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৮ পিএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৮ পিএম
নারীর নিরাপত্তা নিয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

আমাদের দেশে পত্রিকান্তরে নারী নির্যাতনের যে খবর প্রায়ই  সামনে আসে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। এরই অংশ হিসেবে দেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মামলার ক্রমবর্ধমান সংখ্যা নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। পরিসংখ্যান বলছে, নির্যাতনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এটি একটি গভীর সামাজিক সংকেত। উন্নয়ন ও অগ্রগতির নানা আলোচনার মধ্যেও এ বাস্তবতা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ একটি সমাজের প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় তার সব নাগরিকের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, তার ওপর। সে জায়গায় আমরা যেন বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছি।

পুলিশের দেওয়া এক মাস আগের তথ্য বলছে, এক বছরে ধর্ষণের মামলা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে হওয়া মামলার সংখ্যাও বেড়েছে। এ সংখ্যাগুলো কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে একজন মানুষের কষ্ট, একটি পরিবারের দুঃখ এবং একটি সমাজের দায়। একটি মেয়ে বা শিশুর ওপর নির্যাতনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি আমাদের সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে।

২০২৫ সালে দেশে নারী নির্যাতনের প্রায় ২২ হাজার মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাত হাজারের বেশি মামলা ধর্ষণের অভিযোগে। গড় হিসাবে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন অভিযোগ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। কিন্তু আমরা জানি, বাস্তব সংখ্যা হয়তো আরও বেশি। অনেক ঘটনা থানায় পৌঁছায় না। সামাজিক চাপ, পারিবারিক সংকোচ কিংবা অপমানের ভয় অনেককে নীরব থাকতে বাধ্য করে।

এই নীরবতাই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। অপরাধীরা তখন আরও সাহসী হয়ে ওঠে। তারা ধরে নেয়, শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়াবে না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি অপরাধকে উৎসাহিত করে। ফলে সমাজে ভয় এবং অসহায়ত্বের অনুভূতি বাড়তে থাকে।

ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের দৃশ্য অনেক কিছুই বলে দেয়। আদালতের করিডরে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়। কেউ মেঝেতে বসে আছেন। কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন। অনেকের সঙ্গে স্বজন রয়েছে। আবার অনেকেই একা। তাদের চোখে ক্লান্তি। মুখে উদ্বেগের ছাপ। কেউ হয়তো প্রথমবার আদালতে এসেছেন। কেউ বছরের পর বছর ধরে একই পথে হাঁটছেন।

অনেক সময় আদালতের ভেতরে জায়গা হয় না। বিচারপ্রার্থীদের বাইরে বসে থাকতে হয়। কেউ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। কেউ উদ্বেগে আইনজীবীর দিকে তাকান। এই অপেক্ষা শুধু মামলার ডাকের জন্য নয়। এটি ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। অনেকের কাছে এটি মর্যাদা ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম।

আইন আছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে। কিন্তু আইন থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। বাস্তবতা আরও জটিল। আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে আইন কাগজেই থেকে যায়। তদন্তে ধীরগতি বা প্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা থাকলে মামলার ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হলেও মামলা করতে পারেন না। পরিবার থেকে চাপ আসে। সমাজের ভয় থাকে। কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা সামনে আসে। তখন ভুক্তভোগীর পক্ষে এগিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় আপসের চাপ তৈরি হয়। কখনো অর্থের প্রলোভন দেওয়া হয়। কখনো আবার ভয় দেখানো হয়।

যেসব মামলা আদালতে আসে, সেগুলোরও দ্রুত নিষ্পত্তি হয় না। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারাধীন। অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এতে বিচারপ্রার্থীরা হতাশ হয়ে পড়েন। অনেক সময় দেখা যায়, মামলার তারিখের পর তারিখ পড়ছে। কিন্তু অগ্রগতি খুব কম।

বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে সাক্ষী পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকে দূরে সরে যান। কেউ ভয় পান। কেউ আর ঝামেলায় জড়াতে চান না। ফলে মামলার অগ্রগতি থমকে যায়। এতে বিচারব্যবস্থার প্রতিও মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মাঝেমধ্যে নৃশংস ঘটনার খবর সামনে আসে। কোথাও কিশোরী ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। কোথাও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কোথাও দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি ঘটনা সমাজকে নাড়া দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভও দেখা যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ক্ষোভ ম্লান হয়ে যায়।

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, নারী নির্যাতনের পেছনে নানা কারণ কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক মানসিকতার সংকট, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অনেক অপরাধী মনে করে শেষ পর্যন্ত তারা পার পেয়ে যাবে। এ ধারণাই অপরাধ করতে উৎসাহিত করে।

এই বাস্তবতা বদলাতে হলে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন। নারীর প্রতি সম্মান এবং সমতার ধারণা পরিবার থেকেই গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এই দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মানবিক মূল্যবোধ শেখানো জরুরি। 

গণমাধ্যমের দায়িত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নির্যাতনের ঘটনা সামনে আনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সমাজকে ভাবতে বাধ্য করাও প্রয়োজন। সংবাদ কেবল তথ্য দেয় না। এটি সমাজকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের অনেক ইতিবাচক উদাহরণ রয়েছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রশাসন এবং রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। এটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। একই সঙ্গে নারী নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা।

উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। নারী ও শিশু যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে উন্নয়নের সাফল্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজেরও দায় রয়েছে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নির্যাতনের পর অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তাদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন হয়। এ সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে তারা দীর্ঘদিন মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়ান।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারী অধিকার কোনো স্লোগান নয়। এটি মৌলিক মানবাধিকার।

প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব এবং প্রত্যেক নারীর মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। এই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। এখন প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। তাহলেই পরিবর্তনের পথ তৈরি হবে।

লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক

গণতন্ত্রে হতাশা এবং নেতৃত্বে অসন্তোষ

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৪ পিএম
গণতন্ত্রে হতাশা এবং নেতৃত্বে অসন্তোষ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রচারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিশ্রুতি, তা কখনোই ওয়াশিংটনকে সামরিক স্বৈরশাসক এবং স্বৈরাচারী শাসকদের সমর্থন করতে বাধা দেয়নি। অথচ ওয়াশিংটনের নীতি ছিল এতে বাধা দেওয়া। স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালে, উন্নত পুঁজিবাদী বিশ্বের কাছে একের পর এক আত্মসমর্পণ করে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো। সে সময় ওয়াশিংটন এবং তার মিত্রদের কাছে এসব উন্নয়নশীল দেশ ব্যাপক সামরিক কর্তৃত্ববাদের শিকার হয়। আজও সে পরিস্থিতি ভিন্ন কিছু নয়। পৃথিবীতে এমন মানুষ আছেন, যারা মনে করেন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধের পেছনে ভয় বা সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং অন্যান্য দেশের প্রতি অবজ্ঞাই প্রধান প্রেরণা। এক সময় রাশিয়া ছিল বিশ্বের দুই পরাশক্তির একটি; কিন্তু সেই মর্যাদা সে হারিয়েছে। রাশিয়া জানে, অন্যান্য দেশের সম্মান সে আর পায় না। বারাক ওবামা একসময় রাশিয়াকে কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ইউক্রেন যুদ্ধ সেই হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারেরই একটি প্রচেষ্টা। যা কিছুটা বিস্ময়কর, তা হলো ইউরোপের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানও একই ধরনের প্রেরণায় চালিত। পুরোনো ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সৃষ্টি ছিল আধুনিক ইউরোপ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতি পুনর্গঠনে সহায়তা করে, উদারপন্থি দলগুলোর সাফল্যকে উৎসাহ দেয় এবং প্রয়োজনে নীরবে সেই শক্তিগুলোকে দুর্বল করে, যাদের তারা খুব বেশি বাম বা ডান বলে মনে করত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐতিহাসিক শিকড় রয়েছে মার্শাল পরিকল্পনার মাধ্যমে বিতরণ করা মার্কিন সহায়তা সমন্বয়ের জন্য গড়ে তোলা এক ব্যবস্থায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বেড়ে উঠে জাতিরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা, আইনের গুরুত্ব ও উদার গণতন্ত্রের ভিত্তিতে ইউরোপের জন্য এক নতুন শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলে। 

পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত আধিপত্য ভেঙে পড়ার পর, গণতান্ত্রিক নীতিমালা আত্মস্থ করার শর্তে ইইউ দক্ষিণ ও পূর্বের দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে সম্প্রসারিত হয়। বহু দিক থেকে, যুক্তরাষ্ট্রসৃষ্ট উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল্যবোধকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি করে ধারণ করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এখন ট্রাম্প প্রশাসন পুরোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়ে ক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থের ওপর দাঁড়ানো এক নতুন ব্যবস্থায় তা প্রতিস্থাপন করতে চায়। বিশ্বের অবস্থা দেখে মন খারাপ লাগছে? এর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে? এমনটা শুধু আপনারই নয়–অনেক মানুষই এখন এভাবেই ভাবছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে রাজনীতি নিয়ে হতাশা এখন খুব সাধারণ বিষয় হয়ে গেছে। ইউরোপ আর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে, ডান আর বামপন্থিদের চরমপন্থা বাড়ছে, অর্থনীতি ভালো যাচ্ছে না, ধনী-গরিবের ফারাক বাড়ছে। তার সঙ্গে আছে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, বর্ণবাদ, বড় প্রযুক্তি কোম্পানির প্রভাব, প্রাণী ও প্রকৃতির ধ্বংস আর জলবায়ুসংকট। সব মিলিয়ে মানুষ মনে করছে পৃথিবীটা যেন ক্রমেই কঠিন আর অস্থির হয়ে উঠছে। অনেকেই এখন খবরের জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে। কারণ, খবর তাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫০টি দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ স্বীকার করেছে, তারা মাঝেমধ্যে বা নিয়মিত খবর এড়িয়ে চলে। ২০১৭ সালের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ২৯ শতাংশ। ইউরোপে রাজনৈতিক মনোভাবের ক্ষেত্রে তীব্র নেতিবাচকতা স্পষ্ট। ফ্রান্সে ৯০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, দেশ ভুল পথে যাচ্ছে। ব্রিটেনে এই হার ৭৯ শতাংশ, জার্মানিতে ৭৭ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ শতাংশ। বৈশ্বিক চিত্র নিয়েও ইউরোপীয়দের হতাশা প্রবল। এর বিপরীতে চীন, সৌদি আরব বা নাইজেরিয়ার মানুষ তুলনামূলক আশাবাদী। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনকে অনেক দেশই সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক হুমকি হিসেবে দেখে। 

তবে চিত্রটা সবখানেই এক নয়। তুরস্কে ইসরায়েলকে প্রধান হুমকি মনে করা হয় আর গ্রিসে তুরস্ককে। কানাডার মতো কিছু দেশে আবার যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে প্রধান মিত্র ও প্রধান হুমকি হিসেবে দেখা হয়। গণতন্ত্র নিয়ে হতাশা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ এখন পশ্চিমা সমাজে সর্বব্যাপী। বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে। ব্রিটেনের নেতা কিয়ার স্টারমারের জনপ্রিয়তা মাত্র ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর অবস্থা আরও দুর্বল। তাদের জনপ্রিয়তা যথাক্রমে ১৯ ও ১৮ শতাংশ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন এখন প্রায় ৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ৫৪ শতাংশ সমর্থন পাচ্ছেন। রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘদিনের উচ্চ জনপ্রিয়তাও এখন ধাক্কা খেয়েছে। চীনে শি জিনপিং সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন। তবে ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এখনো অধিকাংশ মানুষ সমর্থন করে। এই অন্ধকার পরিস্থিতি বদলাবে কীভাবে? তার জন্য প্রয়োজন ইতিবাচক উদাহরণ। আশার কথা হলো, রাশিয়া, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র–এই তিন দেশে কিছু পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। পুতিন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প–এই তিন নেতার প্রভাব কমে গেলে বৈশ্বিক পরিবেশেও পরিবর্তন আসতে পারে।

রাশিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করার পর পুতিনের অবস্থান এখন সবচেয়ে দুর্বল। তিনি দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিলেন, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। অনুমান করা হয়, অন্তত সাড়ে ৩ লাখ রুশ সেনা নিহত হয়েছেন। অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। দ্রব্যমূল্য ও কর বেড়েছে, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করে সমালোচনা ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। এদিকে ইউক্রেন ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। রেড স্কয়ারের বিজয় দিবসের প্যারেডও নিরাপত্তা শঙ্কায় ছোট করে আয়োজন করতে হয়েছে। 

পুতিনের প্রকাশ্য উপস্থিতি কমেছে, ক্ষমতার অভ্যন্তরে দ্বন্দ্বের খবরও শোনা যাচ্ছে। এমনকি অভ্যুত্থান বা হত্যার আশঙ্কাও আলোচনায় এসেছে। সত্য-মিথ্যা যা-ই হোক, সম্প্রতি পুতিনের বক্তব্য–যুদ্ধ শেষের পথে–এই চাপেরই প্রতিফলন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও কঠিন সময়ের মুখে। অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে এবং সেটি মূলত তার ওপর গণভোটে পরিণত হতে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা, গাজায় হামাসকে ধ্বংসের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা, বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করার অভিযোগ এবং দুর্নীতির মামলা–সব মিলিয়ে তার অবস্থান নড়বড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে ব্যর্থতা, হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা এবং লেবাননে সংঘাত। এসবই ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলছে। ফলে নির্বাচনে টিকে থাকা তার জন্য কঠিন হতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি। তার নীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাণিজ্যযুদ্ধ, জলবায়ুসংকট অস্বীকার, ইউরোপ ও ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে বিরোধ, সামরিক হুমকি–সব মিলিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে হতাশা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিই নির্ধারক। অর্থনীতি যদি খারাপ থাকে, তবে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত হবে, এমনকি অভিশংসনের পথও খুলতে পারে। যেকোনো দেশের মানুষ তার পছন্দ অনুযায়ীই চলবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব দেশ-জাতির চিন্তাচেতনা-পছন্দ-আকাঙ্ক্ষার মানের উন্নয়ন ও বিকাশ ঘটানো। তাদের দায়িত্ব সেভাবেই সেখানে শাসন কাঠামো ও পদ্ধতির পরিবেশ তৈরি করা। একটি অগ্রসর রাজনৈতিক ধারা বা সংস্কৃতির বিস্তার ও সমাজের গুণগত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা। 

কিন্তু নীতিহীন, দুর্নীতিবাজ শাসকদের পাল্লায় পড়ে দেশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পিছিয়ে যায়, সংকটপূর্ণ হয়। যদি পুতিন ক্ষমতাচ্যুত হন, নেতানিয়াহু পরাজিত হন এবং ট্রাম্পের ক্ষমতা কমে যায়, তাহলে বিশ্ব পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। অবশ্য রাশিয়ায় নতুন নেতৃত্ব এলেও একই ধরনের শাসনব্যবস্থা থাকতে পারে। তবু নতুন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ শেষ করার চেষ্টা করবেন বলেই ধারণা। ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর বিদায়ে নিরাপত্তা ইস্যু থাকবে, তবে চরম ডানপন্থি দলগুলো সরকারে না এলে ফিলিস্তিনিদের ওপর দমনপীড়ন কমতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনেরও সুযোগ তৈরি হবে। ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তিনি অপসারিত হতে পারেন, আবার ক্ষমতায় থেকেও প্রভাব হারাতে পারেন। ইতিহাসে যেমন অনেক ক্ষমতাবান নেতাই শেষ পর্যন্ত পেছনে পড়ে গেছেন, তেমনটাই ঘটতে পারে তাঁর ক্ষেত্রেও। একটি বিষয় নিশ্চিত–ট্রাম্পের প্রভাব কমলে বিশ্বরাজনীতি কিছুটা স্বস্তি পাবে। পুতিন ও নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার যে জোটসুলভ অবস্থান, তা ভেঙে গেলে পশ্চিমা বিশ্বের হতাশ মানুষ নতুন করে আশার আলো দেখতে পারে। একইভাবে ট্রাম্পও এমন এক সামাজিক ব্যবস্থা ভেঙে দিতে চান, যা তাকে ও তার বিশ্বদৃষ্টিকে অবজ্ঞার চোখে দেখে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও তার কর্মকর্তারা স্বৈরশাসক ও রাজাদের কাছ থেকে সম্মান পান; কিন্তু তারা জানেন, বহু গণতান্ত্রিক দেশের নেতাই তাদের তাচ্ছিল্যের চোখে দেখেন। বিদ্যমান সম্মানের শ্রেণিবিন্যাস ভেঙে এখন যুক্তরাষ্ট্র এমন এক বিশ্ব গড়তে চায়, যেখানে ট্রাম্প নিঃশর্ত আনুগত্য পাবেন। আইনের শাসন ও বহুপক্ষীয়তার ওপর জোর দেওয়া ইউরোপই হলো সেই অবশিষ্ট অংশের সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ–একটি সম্পূর্ণ মর্যাদা ও মূল্যবোধের ব্যবস্থা, যা ট্রাম্প প্রশাসন ধ্বংস করতে চায়। কিন্তু এর শেষ পরিণতি কী হবে তা সময়ই বলে দেবে।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে 
[email protected]

কন্যাশিশু নির্যাতন: আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংকট

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম
কন্যাশিশু নির্যাতন: আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংকট
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

ধর্ষণ একটি জঘন্যতম মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সামাজিক ব্যাধি, যা ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক অস্তিত্বকে ধ্বংস করার পাশাপাশি সমাজে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পুরুষ কীভাবে আচরণ করতে পারবেন এবং নারী কীভাবে আচরণ করবেন–এই দ্বিমুখী শিক্ষার মধ্যেই ধর্ষণের বীজ লুকিয়ে থাকে। শুধু আইন প্রয়োগ বা অপরাধীদের শাস্তির মধ্যে এ সমস্যার সমাধান নেই, কারণ এ সহিংসতা মূলত সমাজের গভীরে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যদিয়েই পুনরুৎপাদিত হয়। সুতরাং, এ সংকট নিরসনে আমাদের সামাজিকীকরণ, ধর্ম-সংস্কৃতি, আইনি কাঠামো, মিডিয়া, অর্থনীতি এবং শিক্ষা প্রতিটি স্তরে বৈপ্লবিক পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায় যে, পরিবার ভুক্তভোগীর জন্য প্রথম সুরক্ষা বলয় হওয়া উচিত, সেই পরিবারই অনেক সময় সামাজিক মর্যাদা, সম্মান রক্ষার দোহাই দিয়ে অপরাধীর পক্ষ নেয়, যা নারীর ওপর সহিংসতার ক্ষেত্রে একটি নীরব সহযোগিতামূলক কাঠামো তৈরি করে। এখানে শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়, একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয় কাজ করে, যেখানে সম্মান ধারণাটি নারীর যৌন পরিচ্ছদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। ফলে, ভুক্তভোগী নারীকে অপরাধের শিকার হওয়ার পরও সমাজ ও পরিবার উভয়ের কাছে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আবার বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোয় যৌন হয়রানি নিয়ে শিক্ষা দেওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত থেকে গেছে। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট জ্ঞানের ঘাটতি নয়, বরং একটি কাঠামোগত উপেক্ষা, যা অপরাধীদের সহায়ক এবং ভুক্তভোগীদের নিঃস্ব করে তোলে।

শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ, ব্যক্তিগত সীমারেখা এবং সম্মতির ধারণা দেওয়া না হলে তারা জানতেই পারে না কখন, কোথায় এবং কীভাবে নিজের নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। শুধু তাই নয়, এ অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা নির্যাতন চালাতে আরও সাহস পায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশে অনেক দিন থেকেই সমাজপতিদের প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায় ধর্ষকের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কিশোরী-নারীকে ধরে-বেঁধে বিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ চলে আসছে। সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার কারবারে এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের ভরসাস্থল হিসেবে যারা কাজ করছেন, তারাও এমন দীক্ষা নিচ্ছেন, চর্চা করছেন। ঠিক করে দিচ্ছেন, কখন কোথায় কীভাবে কত টাকা দেনমোহরে এসব অসহ্য ‘বিয়ে’ হবে। সাম্প্রতিককালে নানারকম আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যদিয়ে আমাদের সমাজও যে চরম অবক্ষয়ে পতিত হয়েছে, সে বিষয়ে আর সন্দেহ পোষণ করার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।

সমাজে কেবল নারী ও শিশুর ওপর বহুমাত্রিক নির্যাতনের বিষয়টি বিবেচনা করলেও এ বিষয়ে কারও দ্বিধা থাকার কথা নয়। দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের সাম্প্রতিক যেকোনো পরিসংখ্যানই আঁতকে ওঠার মতো। তবে, পরিসংখ্যান বিবেচনায় না এনে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের প্রবণতাগুলো দিয়েও বিষয়টি অনুধাবন করার চেষ্টা করা যেতে পারে। যেকোনো সমাজেই শিশুসন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা মা-বাবার কাছে। কিন্তু খোদ বাবাই যখন সন্তানের ধর্ষক হয়ে ওঠে তখন সন্তান-বাৎসল্যের চিরায়ত ধারণাটিই ভেঙে খানখান হয়ে যায়। ‘বাবার হাতে মেয়ে ধর্ষিত’ এখন আর নতুন কোনো সংবাদ শিরোনাম নয়। এ সমাজে ‘মায়ের সহযোগিতায় বাবার বিরুদ্ধে মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ’-এর মতো শিরোনামও হয়েছে। যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের পরিসংখ্যানের মতোই তাই সমাজের মানবিকসংকটের দিকটাও বিশ্লেষণ করা জরুরি। ধর্ষণ রোধ করতে না পারা নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিককালের ভয়াবহতম এক সামাজিকসংকট। শহর-গ্রাম-মফস্বল, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-হাসপাতাল-বিপণিবিতান থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট-স্টেশন-টার্মিনাল-গণপরিবহন কোথায় ধর্ষণ হচ্ছে না। মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়া এ জঘন্য অপরাধ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে না পারার কারণে নারীর অগ্রগতি ও সামাজিক প্রগতি দুটোই মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে। ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্কের একটি প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে। বহু স্তরে বিভক্ত সমাজে ক্ষমতা-সম্পর্কের ভারসাম্যহীন বিন্যাসের সঙ্গে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি এ ক্ষেত্রে এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সামাজিক কাঠামোয় প্রকৃত অর্থেই নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য বিলোপ একটি অন্যতম পূর্বশর্ত। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক-রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া তা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে নারী ও শিশু সংগঠন এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকেও এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, সম্প্রতি ধর্ষণের প্রতিবাদে সমাজে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ আগের চেয়ে বেড়েছে। ছাত্রছাত্রী তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে নাগরিক সমাজকেও এ বিষয়ে আরও সোচ্চার হতে হবে। না হলে সমাজে মহামারি আকারে ধর্ষণ ছড়িয়ে পড়ার এ মানবিকসংকটের দায় পুরো সমাজকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের জটিল বিচারিক প্রক্রিয়া দূর করে এ-সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতাগুলো দূর করতে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে আমাদের সবাইকে।

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটছে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ১৭৯ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর ২৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া এসব ঘটনায় আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন নারী। দেশে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি এর মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ঘরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্রই এর ভয়াবহ শিকার হচ্ছেন কন্যাশিশুসহ সব বয়সী নারী। নৃশংসতার মাত্রা ও সংখ্যা বিবেচনায় সারা দেশে নারীর প্রতি সহিংসতায় দেশবাসী আতঙ্কগ্রস্ত সময় অতিবাহিত করছে। এ পরিস্থিতি অগ্রহণযোগ্য। নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না পাওয়া, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা প্রভৃতি কারণে সামাজিক জীবনে নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হচ্ছে; যা সমতাভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার অন্তরায়। নারীর প্রতি এ ধরনের আচরণ দূর করতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সুপরিকল্পিত কার্যক্রম গ্রহণ জরুরি। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী, যাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন অসম্ভব। পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নির্মম হত্যা, ঠাকুরগাঁওয়ে চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, নাটোরে ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণসহ সম্প্রতি দেশজুড়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ধারাবাহিক যৌন সহিংসতা ও হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও শোক প্রকাশ করছে সেন্টার ফর চাইল্ড রাইটস। উদ্বেগজনকভাবে, শুধু চলতি মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই ৩০টি শিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর দুটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, শিশুদের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপরিসর, কোনোটিই যথেষ্ট নিরাপদ নয়।

পত্রিকা কিংবা অনলাইন পোর্টাল–গণমাধ্যমে চোখ রাখতে গেলেই কোথাও কিশোরী ধর্ষণ, কোথাও নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, কোথাও শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার খবর। ঘটনাগুলোও এত ঘন ঘন ঘটছে যে বেশির ভাগ সময় এসব খবর আর আমাদের চমকে দেয় না। অথচ এই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া ভয়াবহতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সংকেত। বাংলাদেশে ধর্ষণ আর কেবল অপরাধ নয়, ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকসংকটে পরিণত হচ্ছে। সম্প্রতি সংবাদ প্রতিবেদনগুলো সে উদ্বেগকেই স্পষ্ট করেছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই সংবাদমাধ্যমে ৪৮১টি ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে, যা আগের পুরো বছরের সংখ্যার প্রায় কাছাকাছি। এই পরিসংখ্যানের আরও ভয়াবহ দিক হলো, ভুক্তভোগীদের বড় অংশই শিশু। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই তিন শতাধিক শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে সহিংসতা শুধু বাড়ছে না, ক্রমশ শিশুদের আরও বেশি গ্রাস করছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো দেখলে বোঝা যায়, এ ঘটনাগুলো দেশের প্রায় সব প্রান্তেই ঘটছে–গ্রাম থেকে শহর, স্কুল থেকে কর্মক্ষেত্র। এমনকি পরিচিত মানুষের মাধ্যমেই ঘটে এসব অপরাধ। একটি সমাজের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। যদি নারীরা রাতে নিরাপদে বাসায় ফিরতে না পারেন, যদি শিশুরা স্কুলে যাওয়ার পথে নিরাপদ না থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ধর্ষণের প্রতিটি ঘটনা সমাজের একেকটি ব্যর্থতার গল্প। একই সঙ্গে এটি একটি সতর্কবার্তাও–সমস্যাটি স্বীকার করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সময়।

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় কেঁপে উঠেছে দেশবাসী। ক্ষোভ, শোক আর বিক্ষোভে আগুন ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ধরণী দ্বিধা হও! কোনো ঘরে আর কন্যাসন্তান জন্ম না নিক। কন্যা-জায়া-জননী কোনো মায়াভরা শব্দের মানুষ আর না থাকুক...!’। আট বছরের মেয়েও যাদের কাছে নিরাপদ না, মানুষ নয়–তারা নরপিশাচ। এসব নৃশংসতার মাত্রা কমিয়ে আনার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ঘটনার পর থেকেই ফেসবুক, টুইটার ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রামিসা হত্যার প্রতিবাদে ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী ও অভিভাবকরা সবাই ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। এ ধরনের অপরাধে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যাদের নিজের সন্তান আছে, তাদের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভ আরও বেশি কাজ করে।

গত মাসে রাজধাণীর পল্লবীতে ছোট্ট শিশু রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলে সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করে এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেয়। ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট–এটি কেবল অপরাধের সমস্যা নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ও সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা ভুক্তভোগীকে ভয় দেখিয়ে, সামাজিক অপমানের আশঙ্কা তৈরি করে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার কিংবা মামলা না করার জন্য চাপ তৈরি করে। ধর্ষণ কেবল শারীরিক সহিংসতা নয়, মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। বাংলাদেশে ধর্ষণের জন্য আইনগত শাস্তি যথেষ্ট কঠোর।

২০২০ সালে আইনে সংশোধন এনে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। শিশু–যাদের হাসিতে ভরে ওঠার কথা প্রতিটি ঘর, যাদের হাতে থাকার কথা রঙিন খাতা, খেলনা আর স্বপ্নের ভবিষ্যৎ। সেই শিশুরাই এখন একের পর এক সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া একাধিক মর্মান্তিক ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছ বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব, সামাজিক অবক্ষয় এবং নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি–এসব কারণেই এমন ভয়াবহ অপরাধ ক্রমশ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ায় অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়ছে। শিশু সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, পরিবার ও সমাজে নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা এবং সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। কারণ প্রতিটি সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়–এর পেছনে আছে একটি শিশুর অসমাপ্ত জীবন, একটি পরিবারের ভাঙা স্বপ্ন এবং এক মায়ের বুকভরা কান্না। ধর্ষণ গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে যেভাবেই ঘটুক না কেন, তা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ-জাতীয় পশুসুলভ নরপিশাচরা সর্বৈব পরিত্যাজ্য। বিরাজমান পরিস্থিতি যেন এক অঘোষিত সামাজিকসংকটে রূপ নিয়েছে। তাই এ সংকট নিরসনে প্রবলভাবে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সমাজ ও সভ্যতার মর্যাদা রক্ষার দায় সবারই। এ সংকট উত্তরণে দলমতনির্বিশেষে সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতে হবে।

লেখক: কলাম লেখক ও সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি