সম্প্রতি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু গণমাধ্যমের সঙ্গে আলোচনায় বলেছেন, ‘যারা পিআর পদ্ধতি নিয়ে গোঁ ধরছেন, তারা সাধারণত নির্বাচন দেখে ভয় পাচ্ছেন। তাদের নির্বাচনে ভয় পাওয়ার বাস্তব কারণও আছে। অনেক ইসলামী দল আছে, যাদের প্রার্থীরা কখনো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি। এর মধ্যে অন্যতম ইসলামী আন্দোলন।’
দুদু সাহেবের কথা থেকে যদি শুরু করি তবে বলতে দেশের সচেতন নাগরিক ও সুশীল সমাজের বক্তব্য হচ্ছে আপনারা অদৃশ্য কোন কারণে পিআর পদ্ধতিকে ভয় পাচ্ছেন? আপনাদের তো ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে? দেশকে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সিন্ডিকেট বন্ধ করে মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় আপনার দল রাজি হচ্ছে না কেন? ভয়তো আপনার দল বিএনপি পাচ্ছে। যেমন ১৯৯৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবির বিষয়ে আপনার নেত্রী বলেছিলেন তিন পাগলের আবিষ্কার তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে দাবিতে বিগত ১৭ বছর আন্দোলন করেছেন। আবার ২০০১ এ ক্ষমতায় এলে ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিকে কলুষিত করে এক/এগারোর মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতির দিকে দেশকে ঠেলে দিয়েছিলেন।
আপনি বলেছেন - ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা কখনো নির্বাচিত হতে পারেনি। কেন নির্বাচিত হতে পারেনি তাও নিশ্চয়ই জনাব শামসুজ্জামান দুদু-সহ দেশের মানুষের অজানা নয়। তারপর ও আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।
প্রথম কারণ হচ্ছে - ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সকল নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা মেনে নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। যা আপনার দলসহ অন্যরা করেনি। যেমন, নির্বাচন কমিশন একজন প্রার্থী নির্বাচনে কত টাকা ব্যায় করবে তা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু অতীতে যারা সংসদে গিয়েছেন তার ৫ শতাংশ কি নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা মেনে নির্বাচনী খরচ করেছেন? আপনি বলুন।
দ্বিতীয় কারণ হলো - অতীতে যারা সংসদে গিয়েছেন তাদের ৯০-৯৫ শতাংশ সদস্য বা তার দলের লোকেরা কালো টাকা ছড়িয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। অথচ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থকরা কালো টাকার মালিক নয়। আর কালো টাকা ছড়িয়ে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। এটা প্রকৃতপক্ষে অবৈধ কর্মকাণ্ড।
তৃতীয় কারণ - আপনার দলসহ অন্য দলের যারা সংসদে গিয়েছেন তাদের সিংহভাগ সদস্য পেশিশক্তি প্রদর্শন ও ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি আদর্শিক রাজনৈতিক দল। এই দল পেশিশক্তির লালন-পালন, ব্যবহারকে সমর্থন করে না।
চতুর্থ কারণ - যারা সংসদে গিয়েছেন তাদের প্রত্যেকের পক্ষে যারা বেনিফিশিয়ারি হবেন তারা বা সংসদ সদস্য প্রার্থীর অর্থে কোন কোন ভোটারকে হাজার হাজার টাকা দিয়ে ভোট কেনার মতো উদাহরণ রয়েছে।
পঞ্চম কারণ - প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট দেওয়া ও ভোট কাটাসহ অন্যের রায় ছিনিয়ে নেওয়ার উদাহরণ রয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এসব চর্চা করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে কখনো চায়নি, ভবিষ্যতেও এমন কিছু করবে না।
ষষ্ঠ কারণ হলো - লেভেল প্লেইং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান সুযোগ না থাকা। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত সব দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ ও আচরণ থাকলেও দলীয় প্রভাব, কালো টাকার ছড়াছড়ি ও পেশিশক্তির কারণে লেভেল প্লেইং ফিল্ড থাকে না। যার কারণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও হাত পাখা মার্কার প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারেননি।
এমনকি ওয়ান-ইলেভেনের পূর্বের তফসিলে যে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল, ওই নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা তাদের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করার পর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর তৎকালীন মহাসচিব মাওলানা নুরুল হুদা ফয়েজী সাহেবের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি করার ঘটনা ঘটেছে। বগুড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য যারা মানুষকে এলাকা ছাড়া করার উদাহরণ অতীতে সৃষ্টি করেছেন তারাই তো এখনো অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা শুনে ভীত হয়ে প্রতিনিয়ত যা ইচ্ছে তাই বলে যাচ্ছেন।
সপ্তম কারণ হচ্ছে - ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কেবলমাত্র সংসদ সদস্য হওয়া, বিরোধী দল বা ক্ষমতার অংশীদারত্বের জন্য রাজনীতি করলে হয়তো অতীতে বিএনপি বা আওয়ামী লীগের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে সংসদে দলের প্রতিনিধি প্রেরণ করলে দুদু সাহেব আজকের এমন কথা বলতে পারতেন না। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঘুষ-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, পেশিশক্তি ও কালো টাকার ব্যবহার চিরতরে বন্ধ করে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। এ কারণে যেসব দলের সিংহভাগ নেতা-কর্মী আকুন্ঠ সন্ত্রাস, দুর্নীতি, সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজিসহ অপরাধে জড়িত তাদের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অতীতে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনে করে, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা প্রত্যেক ভোটারের ভোটের মূল্যায়ন ও সন্ত্রাস দুর্নীতি সিন্ডিকেট স্বজনপ্রীতি চাঁদাবাজি টেন্ডারবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য পিআর (PR) পদ্ধতির নির্বাচন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পিআর পদ্ধতির নির্বাচনে বিএনপি কেন ভীতু হয়ে বিরোধীতা করছে তার কারণ হিসেবে বিএনপির নীতিনির্ধারণী একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এই পদ্ধতির নির্বাচন হলে মাঠ পর্যায়ে বিএনপির নেতা-কর্মীরা কাজ করতে তেমন আগ্রহী হয়ে উঠবে না। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্য প্রার্থীরা তৃণমূলের নেতা-কর্মীদেরকে অর্থ ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে মাঠে তাদেরকে সক্রিয় রাখেন। পিআর পদ্ধতির নির্বাচন হলে এক্ষেত্রে একটি সমস্যার সৃষ্টি হবে বলে তাদের আশঙ্কা।
লেখক: সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কাউন্সিল