ঢাকা ১ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ক্যারিয়ার গড়ুন সীমান্ত ব্যাংকে অবশেষে মায়ামিতে উরুগুয়ে দল খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে সরকার: কৃষিমন্ত্রী ভারতের ভিসা আবেদনের অ্যাপয়েন্টমেন্টে নতুন নির্দেশনা মহাখালী বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত, আলোচনায় সায়েদাবাদ-ফুলবাড়িয়া ব্রাজিলে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা গেল গায়ক অ্যামচেমের নতুন সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, সহসভাপতি আলা উদ্দিন নওগাঁয় বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উদযাপন সরকার ২ হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে: কৃষিমন্ত্রী মাদারীপুরে সংঘর্ষে আহত ১০, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ডিএমপির ২১৬৭ মামলা কিয়ামতের আদালতে সবচেয়ে ভয়ংকর সাক্ষী কে জানেন? ট্রাফিক মামলা নিষ্পত্তি করলেই ২৫ শতাংশ ছাড় বাজেটে ইতিবাচক উদ্যোগের পাশাপাশি উদ্বেগ জানিয়েছে রিহ্যাব জনবল নেবে ব্র্যাক ব্যাংক ম্যাচ শেষেই নির্বাসন, যুক্তরাষ্ট্রের কড়া বিধিনিষেধে ক্ষুব্ধ ইরানের কোচ ধর্ষণচেষ্টায় যুবদল নেতা গ্রেপ্তার, দল থেকে বহিষ্কার ব্যাপন, অভিস্রবণ ও প্রস্বেদন অধ্যায়ের ৪টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ২য় পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান নীল, সাদা রঙে রাঙা রংপুর, আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উচ্ছ্বাস তারপরও টুর্নামেন্ট উপভোগের বার্তা কুরাসাও কোচের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উদ্ভাবনী সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে চান মোশাহিদ বিশ্বকাপের পুরো পারিশ্রমিকই পাচ্ছেন সোমালির রেফারি আরতান দেশে ফিরলেন ৫৬ হাজার ৮৬৮ হাজি, মারা গেছেন কতজন? রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অবাস্তব: জিএম কাদের মার্কিন-ইরান যুদ্ধের আবহে ফিফা বিশ্বকাপ কম আনন্দময়: ইরান অধিনায়ক ধোবাউড়ায় ৫ বছরের শিশুর মরদেহ উদ্ধার, শরীরে ধর্ষণের আলামত রবীন্দ্র সরোবরে উদীচীর বর্ষা উৎসব রাঙামাটিতে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসে মানববন্ধন ঢাকা-ময়সনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ তামাক ও নিকোটিনের প্রলোভন থেকে প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
Nagad desktop

স্বাস্থ্য ও ঔষধ নীতির জন্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবদান অনন্য, অবিস্মরণীয়

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম
স্বাস্থ্য ও ঔষধ নীতির জন্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবদান অনন্য, অবিস্মরণীয়
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী

জাতির বিবেকের বাতিঘর, আমৃত্যু সৎ সাহসী, সত্যবাদী, নিবেদিত দেশপ্রেমিক, মজলুমের প্রাণপুরুষ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবদান স্বাস্থ্য ও ঔষুধ নীতির জন্য অনন্য অথবা অবিস্মরণীয়। তার ৩য় মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি, শোকাহত স্বজন ও গুণগ্রাহীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

স্বার্থপরতা, মিথ্যাচার, উশৃঙ্খলতা পরিহার করে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা, মুক্ত গণতন্ত্র চর্চা, ন‍্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা, স্বাধীন রাজনৈতিক মতপ্রকাশের লড়াই করার দৃষ্টান্ত চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে সুশাসন, নৈতিক, মানবিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তার দর্শন চিন্তায় জনমনে প্রভাব ফেলেছিলেন। 

সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন গরিবের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে একটা শার্ট-প্যান্ট পরেছেন। আর পায়ে দিতেন ২০০ টাকার প্লাস্টিকের স্যান্ডেল।

তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘দেশের মানুষ পেট ভরে খেতে পায় না, সবাই জামা-কাপড় পরতে পারে না। আমরা তো মুক্তিযুদ্ধ করেছি মানুষের খাওয়া-পরার সমস্যা না থাকার জন্য। এখানে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। তাই আমাকে বিলাসিতা মানায় না।’

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজানের কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী কোয়েপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হুমায়ুন মোর্শেদ চৌধুরী ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। মা হাছিনা বেগম চৌধুরী ছিলেন গৃহিণী। তার বাবার শিক্ষক ছিলেন বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন। বাবা-মায়ের ১০ সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। তিনি পুরান ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশন থেকে মেট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তিনি ১৯৬২-৬৩ সালে ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।

এরপর এফআরসিএস ডিগ্রি অর্জনের জন্য তিনি লন্ডনে যান। ১৯৬৭ সালে বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে এফআরসিএস প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা শেষে যখন চুড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেবেন, ঠিক তখনই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। পরীক্ষায় অবতীর্ণ না হয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কারণে তার উচ্চশিক্ষার ইতি ঘটে।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন একজন বিরল ধরনের; এক অর্থে অদ্ভূত মানুষ। ঢিলেঢালা শার্ট-প্যান্ট। পুরোনা বাসায়, আসবাবপত্র পুরনো। গাড়িটাও পুরনো। আমৃত্যু নিজের জন্য কিছু চাননি। দেশ ও জাতির জন্য তার অবদান বলে শেষ করা যাবে না।

জাফরুল্লাহ ভাইকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেকে বিদেশে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বরাবরই বলেছেন, ‘আমি দেশের মানুষের জন্য গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছি। সেই আমি বিদেশে চিকিৎসা নেবো! তা কী করে সম্ভব! আমি এই দেশে চিকিৎসা নিয়ে মরতে চাই।’

সমাজসেবার স্বীকৃতি হিসাবে জীবনে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন এই গুণী ব্যক্তি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে ফিলিপাইন থেকে রমেন ম‍্যাগসাইসাই পুরস্কার, ১৯৯২ সালে সুইডেন থেকে বিকল্প নোবেল হিসাবে পরিচিত রাইট লাভলিহুড পুরস্কার, ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ইন্টারন্যাশনাল হেলথ হিরো’ এবং মানবতার সেবার জন্য কানাডা থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন। ২০২১ সালে আহমদ শরীফ স্মারক পুরস্কার পান।

১৯৭১ সালে বিলেতে তার জীবনযাপনের ধরণ ছিল বিলাসবহুল। প্রাইভেট জেট চালানোর ও পানির নিচে সাঁতারের প্রশিক্ষকের লাইসেন্সও ছিলো তার। ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে বিলাসবহুল গাড়ি কেনার বাতিক। সেই সময়েই তিনি বিলাসবহুল বিশেষ মডেলের মার্সিডিজ বেঞ্জ ব্যবহার করতেন। তাও আবার বিশেষ টায়ারের অ্যারো ডায়নামিক সিটের প্রথম গাড়ি। প্রিন্স চার্লস যে দর্জি থেকে স্যুট বানাতেন, তিনিও একই দর্জি দিয়ে নিজের স্যুট বানাতেন।

২৪ মার্চ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিদেশি সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই সাক্ষাৎকার আইটিএন নিউজের মাধ্যমে বিলেতে বসেই দেখলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে এক বিদেশি সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা কি ভয় পাচ্ছ না যে পাকিস্তানিরা তোমাদের হত্যা করতে পারে?’। জবাবে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘৭৭ মিলিয়ন বাংলাদেশিকে হত্যার জন্য কি তাদের কাছে যথেষ্ট বুলেট আছে?’

বঙ্গবন্ধুর মুখে পূর্ব পাকিস্তানের বদলে বাংলাদেশি শুনতে পেয়ে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিলাসবহুল জীবনযাপন ত‍্যাগ করে প্রিয় মাতৃভূমির টানে ব্রিটেনে কর্মরত সব পরিচিত বাঙালি চিকিৎসকদের টেলিফোন করে বললেন, ‘এটি এখন প্রমাণিত যে পাকিস্তান দেশ এখন মৃত। আমরা এখন সবাই বাংলাদেশি।’ এরপরই বাঙালি চিকিৎসকদের নিয়ে তিনি গঠন করলেন ‘বাংলাদেশে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ইউকে’। বলে রাখা ভালো, এই সংগঠনটি ছিল ‘বাংলাদেশ’ নাম দিয়ে গঠিত প্রথম সংগঠন।

বাংলাদেশে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ইউকে’র কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সভাপতি ও সহসভাপতি ছিলেন যথাক্রমে ডা. আবু হেনা সাইদুর রহমান ও ডা. হাকিম। কমিটিতে আরও ছিলেন ডা. আলতাফুর রহমান খান এবং স্কটল্যান্ডে জেনারেল ও কার্ডিয়াক সার্জারিতে এফআরসিএস দ্বিতীয় পর্বে প্রশিক্ষণরত ডা. এম এ মবিন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র কার্ডিয়াক সার্জন ছিলেন ডা. মবিন।

ব্রিটেনে তখন সাড়ে চার শ বাংলাদেশি চিকিৎসক ছিলেন। সিদ্ধান্ত হলো প্রত্যেক সদস্য বাংলাদেশে সহায়তার জন্য প্রতি মাসে ১০ পাউন্ড করে চাঁদা দেবেন। কিন্তু ব্রিটেনে তখন বাংলাদেশিদের মধ্যে নানান মতপার্থক্য থাকায় জাফরুল্লাহ চৌধুরী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর শরণাপন্ন হয়ে তাকে নেতৃত্বদানের অনুরোধ জানান।

মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই ব্রিটেনের বিভিন্ন স্থানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। এপ্রিলে লন্ডনের হাইড পার্কে তেমনই এক পাকিস্তানবিরোধী প্রতিবাদ সমাবেশে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. এম এ মবিন প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের সামনে নিজেদের পাকিস্তানি পাসপোর্ট পুড়িয়ে ফেলে বললেন, ‘আমরা নিজেদের আর পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে মনে করি না।’ এরপরই তারা দুজনেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তখন জাফরুল্লাহ চৌধুরী মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে পরামর্শ করে মুজিবনগর সরকারের জন্য তহবিল সংগ্রহ এবং মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাদানে গঠিত বিভিন্ন অ্যাকশন কমিটির প্রতি লন্ডনের জনগণ ও ব্রিটিশ আইন প্রণেতাদের সমর্থন-সহানুভূতি লাভে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭১ সালের মে মাসের শুরুতে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. মবিন উড়োজাহাজে করে দিল্লি হয়ে কলকাতা যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। যখন তারা ভারতীয় দূতাবাসে ভিসার আবেদন করলেন, তখন তাদের পাসপোর্ট চাওয়া হয়। জাফরুল্লাহ চৌধুরী বললেন, ‘আমরা তো আমাদের পাসপোর্ট পুড়িয়ে ফেলেছি।’ 

তখন ভারতীয় দূতাবাস তাদের বিকল্প জোগাড়ের পরামর্শ দেয়। জাফরুল্লাহ চৌধুরী বললেন, ‘আমরা এখন রাষ্ট্রহীন নাগরিক।’ তখন তাদের স্টেটলেস সনদ বের করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই সনদ জমা দিলে তবেই দিল্লির ভিসা পান তারা। এরপর দামেস্ক হয়ে দিল্লি যাওয়ার জন্য সিরিয়া এয়ারলাইনসের ফ্লাইটের টিকিট কাটলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ভারতীয় দূতাবাস জানাল, তাদের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়ে গেছে। পাকিস্তানি গোয়েন্দারা ইতোমধ্যেই তাদের বিষয়ে সমস্ত খবরাখবর সংগ্রহ করেছে।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সামরিক ও বেসামরিক নেতাদের যাচাই-বাছাই করছিল ভারতীয় গোয়েন্দারা। বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া স্বাভাবিক হলেও তারা  ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি ব্রিটেন থেকে দুজন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক স্বাধীনতাযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য ভারতে আসতে পারেন।

যাত্রাপথে সিরিয়ান এয়ারলাইনসের লন্ডন থেকে দিল্লিগামী ফ্লাইটটি সিরিয়ার দামেস্কে জ্বালানি নেওয়ার জন্য যাত্রাবিরতি নিয়েছিল। জ্বালানি নেওয়ার সময় সব যাত্রীকেই যেহেতু উড়োজাহাজ থেকে নামতে হয়, সেহেতু সিরিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে সিরিয়ায় পাকিস্তানি দূতাবাস ও গোয়েন্দারা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. মবিনকে আটক করার জন্য প্রস্তুত ছিল। বিষয়টি টের পেয়ে উড়োজাহাজ থেকেই নামেননি তারা দুজন।

সেসময় পাকিস্তানি দূতাবাসে কর্মরত কর্নেল পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা পাইলটকে তাদের দুজনকে নামানোর জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। কিন্তু পাইলট ছিলেন অটল। পাকিস্তানিদের যুক্তি, এরা দুজন পলাতক পাকিস্তানি, সুতরাং আমরা তাদের আটক করতে পারি। অন্যদিকে পাইলটের যুক্তি, যেহেতু বিমান এখন রানওয়েতে, সুতরাং তাদের জন্য কোনো দেশের আইনই প্রযোজ্য হবে না। দুইপক্ষের মধ্যে টানা ৫ ঘণ্টা কথা-কাটাকাটির পরও পাইলটের দৃঢ় মনোবলের কারণে দামেস্ক বিমানবন্দর শেষপর্যন্ত বিমানটিকে ছাড়পত্র দেয়।

পরদিন ভোরে দিল্লি পৌঁছানোর পর তাদের স্বাগত জানালেন অল ইন্ডিয়া রিলিফ কমিটির চেয়ারপারসন পদ্মজা নাইড়ু। তিনি জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে বললেন, ‘প্রচুর শরণার্থী এখন ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে। তাদের আশ্রয়, চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে। আপনাদের দুজনের এখন উচিত শরণার্থীদের জন্য খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসাসামগ্রী জোগাড়ে আত্মনিয়োগ করা।’

এর পরপরই এক অদৃশ্য কারণে ভারত সরকার জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে জানিয়ে দিলো, সন্ধ্যার ফ্লাইটেই তাদের লন্ডন ফিরে যেতে হবে।

বিষয়টি জানতে পেরে সেদিন দুপুরেই তারা দুজন ভারতীয় গোয়েন্দাদের চোখ এড়িয়ে হোটেল থেকে পালিয়ে গোপনে দিল্লি থেকে বিকেলের ফ্লাইটে কলকাতা যান।

কলকাতায় সাংবাদিক সাদেক খানসহ বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে দেখা হলো জাফরুল্লাহ চৌধুরীর। তারা তাকে আগরতলা চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সাদেক খান নিজে দুই নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ বরাবর একটি চিঠি লিখলেন। সেই চিঠি নিয়ে আগরতলায় যান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. মবিন। আগরতলার মেলাঘরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন ডা. জাফরুল্লাহ। 

আগরতলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ক্যাপ্টেন ডা. আখতার আহমেদের সঙ্গে দেখা হয় জাফরুল্লাহ চৌধুরীদের। ডা. আখতার ও ডা. নাজিমুদ্দিন ততদিনে মেলাঘরের দারোগা বাগিচায় অস্থায়ীভাবে বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে তুলেছেন। এরপর ডা. জাফরুল্লাহ ডা. এম এ মবিনের সঙ্গে মিলে সেখানেই ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট “বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল” প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। তিনি সেই স্বল্প সময়ের মধ্যে অনেক নারীকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যজ্ঞান দান করেন যা দিয়ে তারা রোগীদের সেবা করতেন এবং তার এই অভূতপূর্ব সেবাপদ্ধতি পরে বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল পেপার ‘ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত হয়। 

ডা. জাফরুল্লাহরা যখন মেলাঘরে এসেছিলেন, তখন যুদ্ধে হতাহতদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকায় ফিল্ড হাসপাতালের সম্প্রসারণের পরিকল্পনা চলছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী ডা. আখতার ও ডা. নাজিম পাঁচ হাজার টাকার একটি বাজেট মেজর খালেদ মোশারফের কাছে উপস্থাপন করলেন। তখন বাংলাদেশ হাসপাতালের সঙ্গে পুরোদমে যুক্ত হয়ে পড়লেন ডা. জাফরুল্লাহ ও ডা. মবিন। 

ডা. জাফরুল্লাহ হাসপাতাল নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ইউকে শাখাকেও সংযুক্ত করলেন। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দেখলেন পাঁচ হাজার টাকায় তেমন কিছু করা সম্ভব হবে না। তাই তিনি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ও জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে দেখা করে ৫০ হাজার টাকার বাজেট পাস করাতে সক্ষম হলেন।

তখন বহু খোঁজাখুঁজির পর বিশ্রামগঞ্জে হাবুল ব্যানার্জির লিচু বাগানকে লিচুগাছ না কাটার শর্তে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য নির্বাচিত করা হয়।

এই হাসপাতালে দুটি ওয়ার্ড রাখা হয়েছিল- সার্জিকেল ও মেডিকেল। এছাড়া ছিল ক্যাজুয়ালটি, ইমার্জেন্সি, প্যাথলজি, অপারেশন থিয়েটার, পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড, রিক্রিয়েশন এরিয়া, ইনফেকশাস ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন কক্ষ।

২৬ আগস্ট মেলাঘরের দারোগা বাগিচা থেকে বিশ্রামগঞ্জে স্থানান্তরিত হয় বাংলাদেশ হাসপাতাল। এরপরই শুরু হয় বাংলাদেশ হাসপাতালের সবচেয়ে সফলতম অধ্যায়।

যখনই হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও কোনো জিনিসের প্রয়োজন হতো, তখনই জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন সদা প্রস্তুত। তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ইউকেতে চিঠি পাঠাতেন। কেবল তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি নিজে একাধিকবার ব্রিটেনে গিয়ে হাসপাতালের জন্য চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও ঔষধের ব্যবস্থা করেছিলেন।

বাংলাদেশ হাসপাতালের সঙ্গে সর্বক্ষণ জড়িত থাকলেও সেখানে বেশিদিন থাকতে পারেননি জাফরুল্লাহ চৌধুরী। কারণ পুরো যুদ্ধকালীন তাকে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের মাধ্যমে অর্থ, ত্রাণ ও মেডিকেল সরঞ্জামাদি  জোগাড়, পরিকল্পনা ও তথ্য প্রদানের কাজে নিয়োজিত থাকতে হয়েছিল। যে কারণে তাকে নিয়মিতই কলকাতা এবং ব্রিটেনে ছুটতে হতো। এছাড়া তাজউদ্দীন আহমেদ ও জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে প্রায়ই বৈঠক করতে হতো।

জুলাইয়ে একবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু তথ্য সংগ্রহের জন্য আগরতলা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। কাজের ফাঁকে এক পরিচিত জাহাজ মালিকের কাছে তেলের ট্যাংকারের যাতায়াতের বিষয়ে খোঁজ নেন। পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই একটি তেলের ট্যাংকার ডুবিয়ে দিয়েছিল মুক্তিবাহিনী।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন মেজর খালেদ মোশাররফ। ডা. জাফরুল্লাহ ব্রিটেনে গিয়ে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করে অস্ত্র সহায়তা চান। জবাবে তারা এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দেয়, যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তবে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র তৈরির প্রশিক্ষণ দেবে।

মুক্তিযুদ্ধে সব চিকিৎসক, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবকেরা বাংলাদেশ সরকার থেকে বেতন নিলেও ব্যতিক্রম ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং ডা. মবিন। তারা স্বেচ্ছায় কোনো ধরনের বেতন গ্রহণ না করে বরং নিজেদের অর্থেই ব্যয় মিটিয়েছেন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরীও। সেই সময়ে তিনি সাক্ষ্য হয়েছেন এক অনন্য ঘটনার।

১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্সে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মহান মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে গভীর ষড়যন্ত্র করে আসতে বাধা দেওয়া হয়। নশ্বর পৃথিবীর এই চক্রান্তের কষ্টে জেনারেল ওসমানী বাবা-মায়ের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে একটি ছোট এমএইট উড়োজাহাজে করে সিলেটের উদ্দেশে রওনা দিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন এডিসি শেখ কামাল, সেকেন্ড-ইন-কমান্ড কর্নেল আবদুর রব, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্তা ও একজন সাংবাদিক।

যাত্রার আগে ব্রিগেডিয়ার গুপ্তা বললেন, আকাশপথ সম্পূর্ণ মুক্ত। পথিমধ্যে উড্ডয়ন অবস্থাতেই একটি ভারতীয় প্লেন থেকে তাদের উড়োজাহাজে গুলিবর্ষণ করা হয়। গুলিতে তেলের ট্যাংকার ফুটো হয়ে যায়। তখন ভারতীয় পাইলট ব্রিগেডিয়ার গুপ্তার উদ্দেশে বললেন, ‘স্যার আমার হাতে মাত্র ১০ মিনিট সময় বাকি আছে। আমি কোথায় অবতরণ করব।’ বিষয়টি বুঝতে পেরে জেনারেল ওসমানী ও জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিজেদের জ্যাকেট খুলে হেলিকপ্টারের তেলের ট্যাংকারের চারপাশ মুড়িয়ে দিলেন যেনো গুলি না লাগে। এমন সময়েই একটি গুলি এসে লাগলো কর্নেল রবের পায়ে। ভীষণ রক্তপাত হচ্ছিল।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী দ্রুত কর্নেল রবকে শুইয়ে দিয়ে মাউথ টু মাউথ ব্রিদিং ও কার্ডিয়াক ম্যাসেজ দিতে লাগলেন। সেই সময় শেখ কামালের হাতেও গুলি লাগে। যদিও শেষ পর্যন্ত পাইলট উড়োজাহাজটিকে বিচক্ষণতার সঙ্গে অবতরণ করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তারা উড়োজাহাজ থেকে লাফ দিয়ে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি পুরোপুরি পুড়ে যায়।

১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হলেও শেষ হয়নি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর চিকিৎসাযুদ্ধ। কারণ কেবল মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই থেমে যাননি জাফরুল্লাহ চৌধুরী। বরং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তিনি শামিল হয়েছেন নতুন এক মহান চিকিৎসাযুদ্ধে। যে যুদ্ধে তিনি গড়ে তুলেছিলেন গণমানুষের চিকিৎসার চিরকালীন স্বাস্থ্য ঠিকানা ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মহান ব্রত নিয়ে ঢাকার অদূরে সাভারে জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রতিষ্ঠা করেন ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’। সরকার কতৃক অধিগ্রহণ করা ২৩ একর জমি ও জোহরা বেগম, এম এ রব, ডাঃ লুৎফর রহমানদের পারিবারিক সম্পত্তি থেকে দান করা পাঁচ একর জমিসহ মোট ২৮ একর জমিতে ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

সেদিনের সেই ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বর্তমানে সারাদেশে ৪০টি মেডিকেল সেন্টার রয়েছে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অধীনে আছে সাতটি হাসপাতাল, ডেন্টাল কলেজ, গণবিশ্ববিদ্যালয়, প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, মাসিক গণস্বাস্থ্য ম্যাগাজিন, বেসিক কেমিক্যাল কারখানা (দেশের সবচেয়ে বড় প্যারাসিটামল কাঁচামাল উৎপাদক প্রতিষ্ঠান), গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস ও অ্যান্টিবায়োটিকের কাঁচামালের ফ্যাক্টরি।

দেশের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার কথা চিন্তা করে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে গড়ে তোলা হয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার। সেখানে দরিদ্র মানুষেরাও সবচেয়ে কম খরচে কিডনির চিকিৎসা করাতে পারেন।

সামরিক শাসকদের সময়েই স্বাস্থ্যনীতি, ওষুধনীতি ও নারীশিক্ষা, এমনকি সে সময়ে সহজে দেশের মানুষের জন্য পাসপোর্টের ব্যবস্থা করতে সরকারকে রাজি করানো এবং প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণে সরকারকে প্রভাবিত করতে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য।

স্বাস্থ্যখাতে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অন্যতম বড় ভূমিকা ছিল আশির দশকে জাতীয় ঔষধ নীতি প্রবর্তন। এ নীতির আগে দেশের ঔষধ উৎপাদন খাত ছিলো পুরোপুরি বিদেশিদের হাতে। জাফরুল্লাহ চৌধুরীর হাত ধরে ঔষধ নীতির মাধ্যমে দেশের ঔষধশিল্পের এক বিপ্লব ঘটে। যেখানে আগে দেশের ঔষধ খাত প্রায় পুরোপুরিই বিদেশিদের হাতেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে এখন দেশীয় উৎপাদকেরাই দেশের ৯৫ শতাংশ ঔষধ উৎপাদন করেন। বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত ঔষধ শতাধিক দেশে রপ্তানিও করেন দেশীয় উৎপাদকেরা।

সদ্যস্বাধীন দেশের অজস্র প্রতিকূলতাকে সামলে নিয়ে জাফরুল্লাহ চৌধুরী যেভাবে দেশের স্বাস্থ্যখাত বিনির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তা অবিস্মরণীয়। চিকিৎসাসেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার এই মূল কারিগর ও দেশের মজলুম জনগণের প্রকৃত বন্ধু তিন বছর আগে স্ত্রী শিরিন হক, ছেলে বারিশ হাসান চৌধুরী, মেয়ে বৃষ্টি চৌধুরীকে রেখে ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল (মঙ্গলবার) রাতে ৮১ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ক্যাম্পাসে তাকে সমাহিত করা হয়।

শারীরিকভাবে তিনি চলে গেলেও রেখে গেছেন ন‍্যায় ও সত‍্য কথা বলার অবিস্মরণীয় ইতিহাস। নৈতিক-মানবিক চিকিৎসা কর্মযজ্ঞের ক্ষেত্র, যা তাকে বাঁচিয়ে রাখবে অনন্তকাল।

ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম
ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বিশ শতকের শেষভাগে উত্তর-উপনিবেশবাদী তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যখন প্রশ্ন তুলেছিলেন–‘সাবঅল্টার্ন কি কথা বলতে পারে?’ তখন অনুন্নত বা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রান্তিক মানুষের ‘প্রতিনিধিত্ব’ বা রিপ্রেজেন্টেশনের সংকটটি বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। দীর্ঘকাল ধরে দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষত বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ, জলবায়ু শরণার্থী কিংবা শ্রমজীবীশ্রেণি পশ্চিমা আলোকচিত্রী বা নৃবিজ্ঞানীদের ক্যামেরায় কেবলই ‘দুর্দশার উপাত্ত’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশের চারুকলার জগতে এই ঔপনিবেশিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে। নৃবিজ্ঞানের মাঠপর্যায়ের পদ্ধতি ‘ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি’ (Visual Ethnography) এবং বাস্তবতার দলিল ‘ডকুমেন্টারি চর্চা’ (Documentary Practice)–এ দুইয়ের সীমানা ভেঙে দিয়ে সমকালীন বাংলাদেশি শিল্পীরা ক্যানভাস, ভিডিও আর্ট ও স্থাপনাশিল্পকে (Installation) করে তুলেছেন ঔপনিবেশিক বয়ান প্রতিরোধের এক একটি অ্যাকাডেমিক ও নান্দনিক হাতিয়ার।

একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যদিয়ে যদি আমরা এ রূপান্তরকে ব্যবচ্ছেদ করি, তবে এর তাত্ত্বিক গভীরতা অনুধাবন করা সহজ হবে:

নৃবিজ্ঞানগত ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফির চিরাচরিত উদ্দেশ্য হলো কোনো নির্দিষ্ট সমাজ বা আদিবাসী গোষ্ঠীর আচার-অনুষ্ঠান, ভাষা ও জীবনযাত্রাকে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণের স্বার্থে ‘পদ্ধতিগত নথিকরণ’ বা ট্যাক্সোনমিক ডকুমেন্টেশন করা। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ওপর প্রথাগত নৃবিজ্ঞানীরা যে ভিজ্যুয়াল কাজ করেন, তার মূল লক্ষ্য থাকে সাংস্কৃতিক অবলুপ্তি ঠেকানো বা অ্যাকাডেমিক জ্ঞান উৎপাদন করা।

কিন্তু যখন ই এথনোগ্রাফি চারুকলার প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডিতে প্রবেশ করে, তখন তার উদ্দেশ্য আর কেবল তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধ থাকে না। হ্যাল ফস্টার (Hal Foster) তার বিখ্যাত ‘দ্য আর্টিস্ট এজ এথনোগ্রাফার’ (১৯৯৫) প্রবন্ধে দেখিয়েছিলেন কীভাবে সমকালীন শিল্পীরা নিজেরা নৃবিজ্ঞানী হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের শিল্পীরা–যেমন কামরুজ্জামান স্বাধীন বা জিহান করিম–মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে স্রেফ তুলে ধরেন না; বরং তারা সেই বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে ‘ধারণাগত সমালোচনা’ (Conceptual Critique) তৈরি করেন। জলবায়ু পরিবর্তন বা পুঁজিবাদের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি কীভাবে ধ্বংস হচ্ছে, চারুকলার ডকুমেন্টারি চর্চায় তার এক একটি ‘কাঠামোগত ব্যবচ্ছেদ’ ঘটে। এখানে নথিকরণ রূপান্তরিত হয় রাজনৈতিক ও নান্দনিক প্রতিবাদে।

পদ্ধতিগত নৃবিজ্ঞানে তথ্যের ‘নৈর্ব্যক্তিকতা’ বা অবজেকটিভিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে উপস্থাপনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় টেক্সট-ভিত্তিক নৃবিজ্ঞানধর্মী চলচ্চিত্র বা অপরিবর্তিত মূল আর্কাইভ (Raw Archive)। সেখানে দৃশ্যের নান্দনিক কাটছাঁটের চেয়ে তথ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা বেশি জরুরি।

অথচ, চারুকলার প্রেক্ষাপটে এই মাধ্যমগুলো এক একটি জাদুকরী ও রূপক রূপ ধারণ করে। শিল্পীরা মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত অডিও রেকর্ডিং, পুরোনো চিঠি, বা আলোকচিত্রকে সরাসরি প্রদর্শন না করে সেগুলোকে ‘পরিমার্জিত আর্কাইভ’ হিসেবে ব্যবহার করেন। যেমন–বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলায় ব্রেট আর্টস ট্রাস্ট বা ঢাকা আর্ট সামিটের প্রদর্শনীগুলোতে দেখা যায়, যমুনার ভাঙনে ঘরহারা মানুষের জীবনের প্রামাণ্যচিত্রটি কেবল স্ক্রিনে আটকে নেই; তা রূপান্তরিত হয়েছে মাল্টিমিডিয়া ইনস্টলেশন, ভিডিও আর্ট কিংবা স্থানীয় মাটি ও পোড়াকাঠ দিয়ে তৈরি মিশ্র-মাধ্যমের ভাস্কর্যে (Mixed-media sculpture)। লুইজি মারিন (Louis Marin) আর্ট থিওরিতে যাকে ‘স্পেশাল প্র্যাকটিস’ বা স্থানিক চর্চা বলেছেন–শিল্পী এখানে দর্শককে কেবল ছবি দেখান না, বরং গ্যালারির ত্রিমাত্রিক পরিমণ্ডলে সে যন্ত্রণার একটি বাস্তব ও স্থানিক অনুভূতি তৈরি করেন।

সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ও নৈতিক রূপান্তরটি ঘটে কাজের ‘বিষয়’ (Subject) বা মানুষের অবস্থানের ক্ষেত্রে। চিরাচরিত ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফিতে প্রান্তিক মানুষটি কেবলই একজন ‘ইনফরম্যান্ট’ বা তথ্যদাতা। গবেষক ক্যামেরা হাতে তার সামনে দাঁড়ান, তিনি অবজেক্ট বা লক্ষ্যবস্তু মাত্র।

কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান চারুকলা আন্দোলনের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিল্পীরা এই ক্ষমতার ভারসাম্যকে বদলে দিয়েছেন। এখানে বিষয়ের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্কটি সহভাগিতার। উদাহরণস্বরূপ, তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) নারী শ্রমিকদের জীবন নিয়ে যখন কোনো সমকালীন ভিজ্যুয়াল প্রজেক্ট তৈরি হয়, তখন সেই নারী শ্রমিকরা কেবল ক্যামেরার সামনে পোজ দেন না; অনেক সময় তাদের নিজেদের হাতে ক্যামেরা তুলে দেওয়া হয় কিংবা তাদের ব্যবহৃত কাপড়ের টুকরো দিয়েই তৈরি হয় স্থাপনাশিল্প। ফলে, তথাকথিত ‘সাবঅল্টার্ন’ বা প্রান্তিক মানুষটি এখানে স্রেফ গবেষণার উপাদান থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন শিল্পের একজন ‘সহ-স্রষ্টা’ (Co-creator)।
আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে এই অ্যাকাডেমিক আলোচনার বাস্তব প্রতিফলন আমরা রাজপথে ও গ্যালারিতে দেখতে পাই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকার দেয়ালগুলোতে যে গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্রের বিপ্লব ঘটে গেল, তা কিন্তু এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত ‘স্ট্রিট এথনোগ্রাফি’। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, আকাঙ্ক্ষা এবং ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিলগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সাদা গ্যালারি থেকে বেরিয়ে এসে রাজপথের ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে।

তবে এ মেলবন্ধনের উল্টো পিঠে কিছু সংকটও রয়েছে, যা সংবাদপত্রের পাতায় আলোচনা হওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর অর্থায়নে যখন অনেক ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি বা ডকুমেন্টারি প্রজেক্ট তৈরি হয়, তখন অনেক সময় ‘এনজিও নান্দনিকতা’র (NGO Aesthetics) চাপে পড়ে শিল্পের নিজস্ব স্বাধীনতা বা স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয়। পশ্চিমা ফান্ডিং এজেন্সির মনঃপূত করার জন্য বাংলাদেশের দারিদ্র্য বা দুর্যোগকে এক ধরনের ‘শৈল্পিক পণ্য’ হিসেবে বিক্রির প্রবণতাও সমকালীন শিল্পসমালোচকদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে চারুকলার ভেতরে ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি এবং ডকুমেন্টারি চর্চার এই অনুপ্রবেশ কেবল দুটি মাধ্যমের মিলন নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। জয়নুল আবেদিনের ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের স্কেচ থেকে শুরু করে আজকের তরুণ ভিডিও শিল্পীদের কাজ–এই দীর্ঘ যাত্রায় স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের শিল্পকলা সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো বিনোদন নয়। সমাজ ও সংস্কৃতির বাস্তব উপাত্তকে নান্দনিকতার ছাঁচে ফেলে যেভাবে এ দেশের শিল্পীরা ইতিহাস বিকৃতি ও প্রান্তিককরণের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন, তা চারুকলার সীমানাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। ক্যানভাস এখানে কেবল রঙের খেলা নয়, ক্যানভাস এখানে সমাজ ও ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

লেখক: চারুকলা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ-ইউওডা, ঢাকা
[email protected]

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োজন প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োজন প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য বিমোচন, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য। বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত আধুনিক প্রযুক্তির খোঁজ করে চলেছেন। তাদের নিত্যনতুন আবিষ্কারে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে আমাদের জগৎ। প্রযুক্তির উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে বিশ্ব, বদলে যাচ্ছে গতানুগতিকতা, বিবর্তন ঘটছে মানুষের জীবনধারায়। মানুষের জীবন সহজ, আরামদায়ক ও নিরাপদ করতে প্রযুক্তি অবদান রাখছে বড় মাত্রায়। জীবনের মুখ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি। প্রযুক্তি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। এটি উৎপাদনশীলতা বহু গুণ বাড়িয়ে, নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যকে সহজতর করে জাতীয় সীমানা পেরিয়ে পুঁজি ও ধারণার নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করে। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আগামীতে স্মার্ট শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক উন্নয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভূমিকা রাখবে। 

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। আধুনিক যুগে নতুন শিল্প সৃষ্টি, উৎপাদন খরচ হ্রাস এবং বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রযুক্তি ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। ইন্টারনেট, গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির কল্যাণে ভৌগোলিক দূরত্ব এখন আর কোনো বাধা নয়। যে কোনো দেশের ছোট ও মাঝারি উদ্যোগও এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রি করতে পারছে। প্রযুক্তিনির্ভর নতুন অর্থনীতির কারণে সফটওয়্যার, ডিজিটাল মার্কেটিং, ডেটা অ্যানালাইসিস এবং ই-কমার্সেরমতো বিশাল কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একে অপরের পরিপূরক। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন শিল্প সৃষ্টি এবং ব্যবসার খরচ কমিয়ে অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থায় অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হওয়ায় উৎপাদনশীলতা বহু গুণ বেড়েছে। এটি মানুষের শারীরিক শ্রমের পাশাপাশি সময় ও খরচ কমিয়ে গুণগত মান উন্নত করেছে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তি সবচেয়ে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট এবং অটোমেশন উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে। প্রতিটি দেশের টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অপরিহার্য। 

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তি সবচেয়ে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট এবং অটোমেশন উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে। প্রতিটি দেশের টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অপরিহার্য। বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তি মাধ্যমে অনেক কাজ একসঙ্গে সম্পাদন করা সম্ভব হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে বিশ্বের অগ্রগামী জাতিসমূহ। তারা সর্বদাই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই। এজন্যই পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ জনবল তৈরি, দূরদর্শী নেতৃত্ব, তরুণদের অংশগ্রহণ ও দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তিগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। 

বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিবেচনায় প্রাধান্যের ভিত্তিতে তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে যেসব মানুষ পারদর্শী ও পেশাদার, তাদের কদর পৃথিবীব্যাপী বেড়েই চলেছে। তাই পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের সমন্বয়ে স্মার্ট ইকোনমির ধারণা বর্তমানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে তথ্যপ্রযুক্তি এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানবসম্পদ ছাড়া কোনো দেশই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নতি করতে পারে না। সমৃদ্ধশালী ও উন্নত অর্থনীতি গড়তে প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করার কোনো বিকল্প নেই। 

লেখক: নেটওয়ার্ক টেকনিশিয়ান (আইসিটি সেল), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
[email protected]

বড় বাজেটের বড় প্রশ্ন

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম
বড় বাজেটের বড় প্রশ্ন
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

কয়েক সপ্তাহ ধরে সামাজিকমাধ্যমে একটা কথা বেশ ঘুরছে। কেউ কেউ বলছেন, এবারের বাজেট ‘উচ্চাভিলাষী’। কেউ আবার বলছেন, ‘একই বাজেট, নতুন মোড়ক।’ এই দুই মেরুর মাঝখানে বসে আমি যখন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের মূল কাঠামোটা পড়লাম, মনে হলো আলোচনাটা আসলে অনেক গভীরে যাওয়া দরকার।

সরকার এবারের বাজেটে ১৩টি খাতকে অগ্রাধিকারে রেখেছে। তালিকায় আছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, সৃজনশীল অর্থনীতিসহ আরও কিছু। লক্ষ্যও বড়। ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, এই অগ্রাধিকার তালিকাটা কি আসলে কার্যকর পরিকল্পনা, নাকি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি?

সরাসরি বলছি, ১৩টি খাত একসঙ্গে অগ্রাধিকার পেলে কোনটি আসলে কার্যকর মনোযোগ পাবে, সেটা নিয়েই আমার মূল সংশয়। বাংলাদেশের বাজেটের ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই বড় বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক থেকে যায়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বছরের পর বছর ধরে অব্যয়িত অর্থের অভিযোগ নতুন নয়। 

এবারের বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। এই বড় বাজেটের পেছনে যুক্তি আছে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণ, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা, আর নতুন বেতন কাঠামোর বোঝা সামলানো। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের চিত্র যদি আগের বছরগুলোর মতো হয়, তাহলে ঘাটতির চাপটা কোথায় গিয়ে পড়বে?

আমার মতে, বাজেটের আকারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবায়নের সক্ষমতা। বড় সংখ্যা মানুষকে আশাবাদী করে, কিন্তু মাঠে পৌঁছানোটাই আসল কাজ।

এবারের অগ্রাধিকারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সবার আগে রাখা হয়েছে। এটা সময়োচিত। গত দুই বছর ধরে সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপে আছে। বাজারে গেলে এ বাস্তবতা বোঝা যায়। মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত, সবার জন্যই বাজার করার হিসাবটা এখন আগের চেয়ে কঠিন। সরকার বলছে, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা আছে। লক্ষ্যটা বাস্তবসম্মত, কিন্তু পথটা কঠিন। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই মূল্যস্ফীতি কমে না। এর জন্য সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক করতে হয়, বাজার তদারকি জোরদার করতে হয়, আর আমদানি নীতিতে নমনীয়তা আনতে হয়। সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নামানোর চেষ্টা চলছে। এটি একটি পরিচিত পদ্ধতি। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো বেসরকারি বিনিয়োগ ধাক্কা খায়। ঋণের সুদ বাড়লে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে পিছিয়ে আসেন। এই দুই লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখাটাই আসল চ্যালেঞ্জ।

কর্মসংস্থানের বিষয়টাও আলাদাভাবে ভাবার আছে। দেশে প্রতি বছর বিশাল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে আসছে। শুধু ভর্তুকি দিয়ে বা সরকারি চাকরির সুযোগ বাড়িয়ে এই চাহিদা মেটানো সম্ভব না। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আর তার জন্য ব্যবসার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে হবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, সুদের হার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, এগুলো যতক্ষণ না কমবে, বিনিয়োগকারীরা উৎসাহ পাবেন না। বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়নে মনোযোগের কথা বলা হয়েছে। তবে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ছাড়া এটা কাগুজে থেকে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এবারও বরাদ্দ বেড়েছে। এটা ইতিবাচক। দেশে বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, বিধবা অনেকেই আছেন যারা রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়া টিকতে পারেন না। কিন্তু এই খাতের দীর্ঘদিনের একটা সমস্যা হলো উপকারভোগীদের তালিকার নির্ভরযোগ্যতা। প্রকৃত অভাবীরা তালিকায় নেই, অথচ সচ্ছল পরিবারের সদস্যরা সুবিধা পাচ্ছেন, এই অভিযোগ পুরোনো। ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাচাইয়ের কথা বলা হচ্ছে বছরের পর বছর। বাস্তবায়নের গতি এখনো যথেষ্ট দ্রুত নয়।

স্বাস্থ্য আর শিক্ষা, দুটো খাত নিয়ে আলাদাভাবে একটু বলতে চাই। স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বেড়েছে, ভালো কথা। কিন্তু মোট বাজেটের অনুপাতে এটা এখনো যথেষ্ট নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হলো, জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যে ব্যয় করা উচিত। আমরা এখনো সেখানে নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে বোঝা যায় বাস্তবতা। অনেক জায়গায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই। ওষুধ নেই। যন্ত্রপাতি থাকলেও চালানোর লোক নেই। টাকা বরাদ্দ হলেই সব ঠিক হয় না। ব্যবস্থাপনার উন্নতি না হলে বরাদ্দের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছায় না।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা, সর্বত্র কিছু না কিছু সমস্যা আছে। শিক্ষকের মান, পাঠ্যক্রমের মান, মূল্যায়ন পদ্ধতি, এগুলো নিয়ে গত কয়েক বছরে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে পরিবর্তনটা এখনো দৃশ্যমান নয় সব জায়গায়।

আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর কথা বলা হয়েছে। এটা সবচেয়ে দরকারি পদক্ষেপ, আমার মতে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বিপুল। এই টাকাগুলো আটকে থাকার কারণে নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পান না। ব্যাংকের সুদের হার কমে না। বিনিয়োগের পরিবেশ সংকুচিত থাকে। এই সমস্যাটার সমাধান না হলে অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক হবে না।
এবারের বাজেটে আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। দেখার বিষয় হলো, এটা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়।

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কি সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব। তবে সেটার জন্য শুধু বাজেটের আকার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার, শাসনব্যবস্থার উন্নতি, আর দুর্নীতি কমানো না হলে লক্ষ্যমাত্রা কাগজেই থাকবে। এবারের বাজেটের সুযোগ হলো, নতুন সরকারের প্রতি মানুষের একটা প্রত্যাশা আছে। সেই প্রত্যাশা পূরণের জানালা বেশি দিন খোলা থাকে না।

বাজেটের পরিকল্পনা ভালো হলেই সব হয় না। মাঠপর্যায়ে যারা বাস্তবায়ন করবেন, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। আগামী অর্থবছরের শেষে যদি এই ১৩টি খাতের অর্ধেকেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়, সেটাই হবে বড় অর্জন।

লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ: এনবিআরের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:০৩ পিএম
রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ: এনবিআরের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের নানা হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে। সরকার যেহেতু ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে, তাই প্রথমে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন; পরে সে অনুযায়ী আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে ব্যয়ের দিক থেকে সরকার চেষ্টা করে কতটা সংকোচন করা যায়, অর্থাৎ ব্যয় কতটা কমানো সম্ভব। অপরদিকে, আয়ের ক্ষেত্রে সরকার চেষ্টা করে কীভাবে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা যায়। আয়ের খাত যত বৃদ্ধি পাবে, সরকার তত বেশি আর্থিকভাবে নিশ্চয়তা লাভ করবে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর বছরে ন্যূনতম ১ হাজার টাকা ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন খাতে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধির পরিকল্পনাও করছে এনবিআর। অর্থাৎ, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর অন্যতম কৌশল হিসেবে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান সরকার অগ্রিম কর বৃদ্ধির পরিকল্পনাও করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকার কেন ভ্যাট ও আয়কর বৃদ্ধির এই পরিকল্পনা গ্রহণ করছে? একই সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–এ উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং আদৌ কতটা সফল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে?

সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বাজেট বৃদ্ধি করছে। ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারকে আয় বৃদ্ধি করতে হবে, অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি ঘটাতে হবে। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সুতরাং, শুধু বর্তমান অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলেও আগামী অর্থবছরে ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে হবে। এ কারণেই যাদের মোট বার্ষিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকা, তাদের কাছ থেকে বছরে ১ হাজার টাকা ভ্যাট আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককেই বহন করতে হবে। 

বর্তমান সরকার আগামী অর্থবছরেই ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ লাখ থেকে ২০ লাখে উন্নীত করতে চায়। অথচ বর্তমানে নিবন্ধিত ৮ লাখ প্রতিষ্ঠানের সবাই নিয়মিত ভ্যাট প্রদান করে না। এর মধ্যে মাত্র সাড়ে ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট দেয়। আবার যারা ভ্যাট প্রদান করে, তারা সবাই সঠিকভাবে ভ্যাট দেয় কি না, সে বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অন্যদিকে অবশিষ্ট আড়াই লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ভ্যাট প্রদান করে না এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি।

সুতরাং প্রশ্ন থেকেই যায়, এ সংখ্যা ৮ লাখ থেকে ২০ লাখে উন্নীত করা কতটা সম্ভব হবে? আর যদি তা সম্ভবও হয়, তাহলে সবাই কি সঠিকভাবে ভ্যাট প্রদান করবে? আমাদের দেশে যারা ভ্যাট বা আয়কর প্রদান করেন, তাদের শনাক্ত করা এবং অডিট করার জন্য পর্যাপ্ত কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু যারা ভ্যাট বা আয়কর দেন না, অথচ যাদের তা দেওয়ার সামর্থ্য ও যোগ্যতা উভয়ই রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করার জন্য রাষ্ট্র কিংবা এনবিআরের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা খুব একটা দেখা যায় না। ফলে যারা নিয়মিত ভ্যাট প্রদান করেন, তাদের অনেকের মধ্যেই এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে ভ্যাট দেওয়ার চেয়ে না দেওয়াই যেন সুবিধাজনক। অন্যদিকে, যারা আয়কর বা ভ্যাট প্রদান করেন, তারাও সব সময় যে সঠিক ও পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাবের ভিত্তিতে তা দেন, এমনটিও নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভুল বা শুদ্ধ–যেভাবেই হোক, তারা অন্তত কর ও ভ্যাট প্রদান করছেন। তাহলে যারা একেবারেই ভ্যাট বা আয়কর দেন না, তাদের কেন আমরা কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারছি না?

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দেশের কল্যাণে কতটুকু নিবেদিত? রাষ্ট্রের স্বার্থে তাদের আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীলভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক নাগরিকেরও নিজের অধিকার ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, দৈনিক কালবেলা পত্রিকায় ৪ জুন ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘রয়্যালটি কমিয়ে ২০০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজারের মহেশখালীতে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে নির্মাণাধীন ‘মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড’ প্রকল্পে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন এবং শতকোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্র রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য যতই চেষ্টা করুক না কেন, বাস্তবতা অনেকটা সর্ষের মধ্যে ভূতের মতো। একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সে প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অপরদিকে, অনেক করদাতাও ভ্যাট বা আয়কর পরিশোধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যাদের মোট বার্ষিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকা, তাদের জন্য বছরে ১ হাজার টাকা ভ্যাট প্রদান করার কথা কোনো বড় বিষয় হওয়ার কথা নয়। তার পরও অনেকে বিভিন্ন উপায়ে কীভাবে কর ফাঁকি দেওয়া যায়, সেই পথ খোঁজেন। দেখা যায়, এনবিআরে নিবন্ধিত হিসাবে যে ব্যাংক হিসাবের তথ্য দেওয়া আছে, অনেকেই বাস্তবে সেই হিসাবে লেনদেন করেন না। আবার যারা রাষ্ট্রের হয়ে দায়িত্ব পালন করেন, তাদের মধ্যেও অনেকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে দেশের যে পরিমাণ উন্নয়ন হওয়ার কথা, তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। আরও একটি উদাহরণ হলো–গত মে ৫, ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ হিমাগার মালিক সমিতিকে চিঠি দেয় এনবিআর। প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনটির সভাপতি বলেন, যারা সংগঠনের সদস্য নন তাদের তথ্য আমরা দিতে পারব না। আর সদস্যরা বলবেন, ‘সদস্য হয়ে আমরা বিপদে পড়েছি।’ এতে সমিতি দুর্বল হবে, ব্যবসায়ীদের আস্থা কমবে। এ ধরনের চিন্তা অবিবেচনাপ্রসূত এবং দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা। ঠিক যেন রাষ্ট্রের চেয়ে সংগঠন বড়, সংগঠনের চেয়ে ব্যক্তি।

অপরদিকে, সরকার যদি আয়কর বৃদ্ধির তুলনায় ভ্যাট বৃদ্ধি করাকে সহজতর মনে করে, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতিও এক ধরনের পরোক্ষ কর, যার প্রভাব থেকে একজন দিনমজুরও রেহাই পান না। আবার ভ্যাট বৃদ্ধি করা হলে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা সরকারের সাফল্য অর্জনের পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি বছরে যে আয় করেন, তার করযোগ্য আয়ের অংশ ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি হলেই তিনি আয়কর প্রদান করবেন। অর্থাৎ তার আয়কর দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে বলেই তিনি আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী সরকার তথা এনবিআরকে আয়কর প্রদান করবেন। কিন্তু সরকার যদি কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করে, তবে তা আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও এর প্রভাব হবে ব্যাপক। কারণ এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা একজন দিনমজুরও এড়াতে পারবেন না। অথচ আয়কর আদায় বৃদ্ধি পেলে মূলত যারা আয়কর দেওয়ার যোগ্য, তারাই এর প্রত্যক্ষ প্রভাব বহন করবেন। নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠী এ ধরনের করের প্রভাব থেকে অনেকাংশে মুক্ত থাকবে। তাই রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। আমাদের দেশে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো প্রায়ই এমন কৌশল খোঁজে, যার মাধ্যমে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে কর-সুবিধা কিংবা আয়কর মওকুফের সুযোগ নেওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে সরকারও ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাদের সেই সুবিধা দিতে বাধ্য হয়। এর ফলে গত কয়েক দশকে বিত্তবান শ্রেণি আরও বেশি সম্পদশালী হয়েছে, অথচ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ তাদের আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারেনি।

সরকারের বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার কারণে রাষ্ট্রের এই কঠিন সময়ে সফল হওয়ার অন্যতম প্রধান উপায় হলো সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। তবেই হয়তো আমাদের দেশেও মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আয়কর ও ভ্যাট প্রদান করতে উৎসাহিত হবে। যখন নাগরিকরা দেখবেন যে তাদের প্রদত্ত কর সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে, তখন কর প্রদানের প্রতি তাদের আস্থা ও আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে এবং উন্নয়নের সুফল পৌঁছে যাবে প্রতিটি মানুষের কাছে। সর্বোপরি, রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন তখনই সম্ভব হবে, যখন সরকার ও নাগরিক উভয়েই নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশীদার হবে দেশের প্রতিটি মানুষ ও প্রতিটি নাগরিক।

লেখক: ব্যাংকার ও লেখক
[email protected]

ভূমিকম্পে ক্ষতির বড় কারণ শুধু কম্পন নয়, বরং খারাপ মানের ডিজাইন ও নির্মাণ

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:০১ পিএম
ভূমিকম্পে ক্ষতির বড় কারণ শুধু কম্পন নয়, বরং খারাপ মানের ডিজাইন ও নির্মাণ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি করতে পারে। তবে প্রকৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো–ভূমিকম্পে মানুষ সাধারণত কম্পনের কারণে মারা যায় না; বরং ভবন, সেতু ও অন্যান্য কাঠামো ধসে পড়ার কারণেই অধিকাংশ প্রাণহানি ঘটে।

একই মাত্রার ভূমিকম্পে কোনো কোনো ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়ে, আবার কোনো ভবন সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই পার্থক্যের মূল কারণ ডিজাইনের মান, নির্মাণের গুণগত মান এবং প্রকৌশলগত নিয়ম মেনে কাজ করা হয়েছে কি না। তাই বলা যায়–ভূমিকম্প নয়, দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ ভবনই মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু।

কেন ডিজাইন এত গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকম্পের সময় মাটির কম্পনের কারণে ভবনের ওপর বিভিন্ন ধরনের বল কাজ করে। ভবনের নিজস্ব ওজনের পাশাপাশি অতিরিক্ত গতিশীল বল (Dynamic Force) সৃষ্টি হয়।
প্রধানত দুই ধরনের বল গুরুত্বপূর্ণ: অনুভূমিক বল (Lateral Force)। ভূমিকম্পে মাটি ডানে-বামে কাঁপে। ফলে ভবনের ওপর অনুভূমিক বল কাজ করে। সাধারণত ভবনগুলো উল্লম্ব লোড (নিজস্ব ওজন) বহনের জন্য বেশি প্রস্তুত থাকে, কিন্তু ভূমিকম্পের অনুভূমিক লোড ভবনের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। গতিশীল বল (Dynamic Load)। ভূমিকম্প একটি গতিশীল ঘটনা। কম্পনের ফলে ভবনের বিভিন্ন অংশে ত্বরণ (Acceleration) সৃষ্টি হয়, যা অতিরিক্ত বল তৈরি করে। ভবনের ওজন যত বেশি, তত বেশি ভূমিকম্পীয় বল সৃষ্টি হয়।

খারাপ ডিজাইনের প্রধান সমস্যাসমূহ
Soft Storey (দুর্বল নিচতলা): বাংলাদেশে অনেক ভবনের নিচতলা গ্যারেজ, দোকান বা খোলা জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে নিচতলায় দেয়াল কম থাকে এবং কাঠামোগত দৃঢ়তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ভূমিকম্পের সময় ওপরের তলাগুলো তুলনামূলক শক্ত থাকলেও নিচতলা অতিরিক্ত বিকৃত হয়।
একে বলা হয়: Soft Storey Failure। এর ফলে পুরো ভবন একসঙ্গে নিচের দিকে ধসে পড়তে পারে। অনেক ভূমিকম্পে দেখা গেছে যে, পার্কিং ফ্লোরযুক্ত ভবনগুলো প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। Irregular Shape (অসামঞ্জস্যপূর্ণ আকৃতি): স্থাপত্যগত সৌন্দর্যের জন্য অনেক সময় L-Shape, U-Shape বা অন্যান্য জটিল আকৃতির ভবন নির্মাণ করা হয়।

সমস্যা কোথায়
ভূমিকম্পের সময় ভবনের সব অংশ সমানভাবে নড়াচড়া করে না। ফলে ভবনের ওপর Torsion (মোচড়) Uneven Stress Distribution Concentrated Damage সৃষ্টি হয়। ফলে একটি অংশে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে কাঠামোগত ব্যর্থতা ঘটতে পারে। নিম্নমানের উপকরণ ও নির্মাণকাজ: ডিজাইন যত ভালোই হোক, নিম্নমানের নির্মাণকাজ পুরো প্রকল্পকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। নিম্নমানের সিমেন্ট ব্যবহার, অপর্যাপ্ত রড, অপর্যাপ্ত কংক্রিট কভার, ভুল রড বাঁধাই, পর্যাপ্ত curing না করা। এর ফলে কংক্রিটের শক্তি কমে যায় এবং ভূমিকম্পের সময় কাঠামো ভেঙে পড়ে। সঠিক Load Path না থাকা। Roof→Beam→Column→Foundation. যদি Load Path সঠিক না হয় তাহলে স্থানীয়ভাবে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। কিছু অংশ হঠাৎ ব্যর্থ হয় অর্থাৎ Progressive Collapse শুরু হতে পারে। ফলে পুরো ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দুর্বল কলাম–শক্তিশালী বিম সমস্যা।

ভূমিকম্পপ্রতিরোধী ডিজাইনের একটি মৌলিক নীতি হলো: Strong Column–Weak Beam
অর্থাৎ কলাম হবে শক্তিশালী এবং বিম তুলনামূলক দুর্বল। ভূমিকম্পের সময় বিম ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবন সাধারণত দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু কলাম ব্যর্থ হলে পুরো ভবন ধসে পড়তে পারে। তাই আধুনিক ভূমিকম্প প্রতিরোধী ডিজাইনে কলামকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কীভাবে ভালো ডিজাইন জীবন বাঁচায়? Ductility (নমনীয়তা): ভূমিকম্পের সময় একটি ভালো ভবন সম্পূর্ণ শক্ত ও অনমনীয় হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ভবন এমনভাবে ডিজাইন করা উচিত যাতে এটি: শক্তি শোষণ করতে পারে। কিছুটা বাঁকতে পারে। হঠাৎ ভেঙে না পড়ে: এটাই Ductility। Redundancy (বিকল্প লোড বহন ব্যবস্থা): ভালো ডিজাইনে একাধিক Structural System থাকে। একটি উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য অংশগুলো লোড বহন করতে পারে। ফলে সম্পূর্ণ ধসের সম্ভাবনা কমে যায়।

Regularity (সুষম বিন্যাস): সুষম আকৃতির ভবনে Stress Distribution ভালো হয়। Torsion কম হয়। ভূমিকম্পের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকে। Code Compliance (কোড অনুসরণ): ভূমিকম্প প্রতিরোধী ডিজাইনের জন্য অবশ্যই প্রযোজ্য বিল্ডিং কোড অনুসরণ করতে হবে।
বাংলাদেশে: BNBC (Bangladesh National Building Code)। আন্তর্জাতিকভাবে: ACI, ASCE, ,IBC. Eurocode-এর নীতিমালা অনুসরণ করা হয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতা: বিশেষ করে ঢাকা শহর একটি ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। বর্তমানে অনেক প্রধান সমস্যাগুলো অনুমোদিত ডিজাইন অনুসরণ না করা। প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানের অভাব। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী। অতিরিক্ত তলা নির্মাণ। পুরোনো ভবনের কাঠামোগত মূল্যায়ন না করা। সঠিক Soil Investigation না করা। এসব কারণে ভূমিকম্পের সময় ক্ষতির ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়।

নেপাল ভূমিকম্প ২০১৫–একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ। ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছিল। তদন্তে দেখা যায় দুর্বল নকশা, অপর্যাপ্ত রড, নিম্নমানের কংক্রিট, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ, ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম কারণ ছিল। অন্যদিকে সঠিক প্রকৌশল নীতিতে নির্মিত অনেক ভবন উল্লেখযোগ্যভাবে টিকে ছিল। এটি প্রমাণ করে ভালো ডিজাইন জীবন বাঁচায়। প্রকৌশলীদের করণীয়: Structural Analysis নিশ্চিত করা, Static Analysis, Dynamic, Analysis, Response Spectrum Analysis, প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হবে। Seismic Load বিবেচনা করা: ডিজাইনের শুরু থেকেই ভূমিকম্পীয় লোড অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। Proper Detailing নিশ্চিত করা, Beam-Column Joint, Stirrup Spacing, Anchorage Length, Lap Splice সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। Construction Supervision জোরদার করা। ডিজাইন অনুযায়ী নির্মাণ হচ্ছে কি না তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

ভূমিকম্প থামানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, প্রকৌশল নকশা, মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী এবং দক্ষ তদারকির মাধ্যমে ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
একটি নিরাপদ ভবন কেবল ইট, বালি, সিমেন্ট ও রডের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রতীক।

লেখক: প্রকৌশলী বিভাগীয় প্রধান, প্রকৌশল বিভাগ, স্টুডিও ডিএনএ, প্রতিষ্ঠাতা, হেলদি কংক্রিট ও হেলদি এডুকেশন