বিচারকার্য পরিচালনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। জটিল কাজও বটে। চিন্তা-ভাবনা ও প্রজ্ঞার সঠিক বাস্তবায়নই সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এজন্য একজন বিচারককে সর্বদা অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হয়। অনেক বেশি জ্ঞান, বুদ্ধি ও সুচিন্তিত মন-মানসিকতার অধিকারী হতে হয়। হতে হয় নিরপেক্ষ। পক্ষপাতমুক্ত। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন। পূর্ণ স্বাধীন, অমুখাপেক্ষী ও আমানতদার। একজন বিচারকের জন্য কখনোই পক্ষপাতিত্ব করা উচিত নয়।
প্রাচীনকাল থেকেই যাবতীয় অন্যায়-অনাচার ও অপরাধ দমনের জন্য বিচারব্যবস্থার প্রথা প্রচলিত হয়ে আসছে। বিশেষত মুসলিম শাসকদের যুগে বহু মুজতাহিদ, গবেষক, ফকিহ, ইলমে ফিকহে পারদর্শী ব্যক্তি বিচারকের আসন অলংকৃত করেছেন। এর মধ্যে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর বিশেষ শিষ্য ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) দ্বিতীয় হিজরিতে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। ইমাম আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইবরাহিম (রহ.) খলিফা হারুনুর রশিদের রাজত্বকালে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। (তারিখে ফিকহে ইসলামি)
সময়ের পরিবর্তনে বিভিন্ন পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে এই বিচারকার্য পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয় এখন অনেক বেশি বিকশিত হয়েছে। প্রয়োজনীয় আধুনিক নানা বিষয় যুক্ত হয়েছে। তবে ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা রক্ষাই হলো বিচারের মূল উদ্দেশ্য। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আর যখন তোমরা লোকদের মধ্যে বিচার মীমাংসা করো, তখন ন্যায়বিচার করো। অবশ্যই আল্লাহতায়ালা তোমাদের উত্তম উপদেশ দান করছেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮)
উল্লিখিত আয়াতটি যারা বিচারকার্য পরিচালনা করেন, তাদের সঠিকভাবে বিচার করতে উদ্বুদ্ধ করে। আর এ হচ্ছে, কোরআনের ভাষায় উত্তম উপদেশ। তাই ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ। আমাদের সমাজে যারা পারিবারিক ও বিভিন্ন ছোটখাটো বিষয়েরও বিচারক হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় বিচারকের ভূমিকা পালন করেন, তাদেরও এখান থেকে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করা কর্তব্য।
ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা উচিত। কখনো কোনো পক্ষের প্রতি ঝুঁকে পড়া উচিত নয়। আর অন্যায় পক্ষপাতিত্ব করার তো সুযোগই নেই। মনে রাখা জরুরি, অন্যায় পক্ষ অবলম্বন করা পরিষ্কার জুলুম ও অন্যায়। দুই ব্যক্তির মধ্যে ইনসাফ করাও সদকা। আর ন্যায় বিচারক এবং ইনসাফকারীদের সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো বিচারক যতক্ষণ পর্যন্ত জুলুম করেন না, (কারও ওপর অন্যায় জোর-জবরস্তিমূলক কোনো রায় বা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন না) ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহতায়ালা তার সঙ্গে থাকেন। অতঃপর সে যখন জুলুম শুরু করে দেয়, তখন আল্লাহতায়ালা তাকে তার নিজের ওপর ছেড়ে দেন।’ (ইবনে মাজাহ)। আরেক হাদিসে এসেছে, ‘সুবিচারক আল্লাহতায়ালার কাছে তার ডান হাতের দিকে নুরের মিম্বরের ওপর উপবিষ্ট থাকবে। যারা তাদের বিচারকার্যে, পরিবারে ও দায়িত্বভুক্ত বিষয়ে ইনসাফ রক্ষা করে বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে।’ (নাসায়ি)
আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে যারাই বিচারকার্য পরিচালনা করেন, তাদের সবার জন্য আবশ্যক হলো, অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গে; পরিপূর্ণ বিশ্বস্ততা পালন করে এ জাতীয় কাজ সম্পন্ন করা। আল্লাহতায়ালা আমাদের শাসক ও বিচারকদের আল্লাহর ভয় ও পরকালীন জবাবদিহি সামনে রেখে যাবতীয় বিচারকার্য পরিচালনা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার তৌফিক দান করুন।
লেখক: খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর