মহান আল্লাহর কালাম পবিত্র কোরআন, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এ ব্যাপারে আল্লাহতায়ালা নিজেই চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা যদি এ (কোরআন) সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহে থাকো, যা আমি আমার বান্দার ওপর অবতীর্ণ করেছি, তা হলে এর মতো একটা সুরা রচনা করে নিয়ে এসো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৩) অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে নবি আপনি বলুন, এই কোরআনের অনুরূপ তৈরি করতে যদি সব মানুষ ও জিন একত্র হয় এবং তারা পরস্পর সাহায্যকারী হয়, তবুও তারা কখনো এর অনুরূপ রচনা করে আনতে পারবে না।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৮৮) কোরআন যেহেতু আল্লাহর কালাম, তাই তা খুবই সম্মানিত। এ জন্য কোরআন তিলাওয়াতের সময় তার আদবের প্রতি লক্ষ্য রাখা অত্যাবশ্যক। এমন কিছু আদব নিম্নরূপ:
খালেস নিয়ত: নিয়তকে খালেস করার অর্থ হলো একনিষ্ঠভাবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তিলাওয়াত করা। এটা ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত। একনিষ্ঠতা ব্যতীত আল্লাহতায়ালা কোনো ইবাদত কবুল করেন না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তাদের কেবল একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে আদেশ করা হয়েছে।’ (সুরা বাইয়্যিনা, আয়াত: ০৫) হজরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কোরআন তিলাওয়াত করো এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করো ওই সম্প্রদায়ের আগমনের পূর্বে, যারা কোরআন তীরের মতো সোজা করে (দ্রুত) পড়বে এবং এর দ্বারা দুনিয়ার প্রতিদান প্রত্যাশা করবে, আখিরাতের প্রতিদান প্রত্যাশা করবে না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৮৩০)
অজুসহ তিলাওয়াত: অপবিত্র অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত করা নাজায়েজ। আর অজুহীন অবস্থায় তিলাওয়াত করা জায়েজ হলেও অজুসহ তিলাওয়াত করা আদবের অন্তর্ভুক্ত। তাই যথাসম্ভব অজুসহ তিলাওয়াত করা উচিত।
উপস্থিত মন: তিলাওয়াত করার সময় পরিপূর্ণ মনোযোগ কোরআনের প্রতি নিবদ্ধ রাখবে। যা পড়বে তা নিয়ে তা নিয়ে গভীর অনুসন্ধান করবে। সম্ভব হলে আয়াতের অর্থ বোঝার চেষ্টা করবে। মনোযোগ নষ্ট হয় কিংবা মনোযোগ অন্যদিকে নিবদ্ধ হয়- এমন জনসমাগমে বসে কোরআন পাঠ করবে না। এমনভাবে নাপাক দুর্গন্ধযুক্ত জায়গা তথা প্রস্রাব-পায়খানার আশপাশ, যেখানে দুর্গন্ধ আসে, সেখানে বসে তিলাওয়াত করবে না।
আউজুবিল্লাহ পড়া: তিলাওয়াত শুরু করার পূর্বে আউজুবিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজিম পড়ে নেওয়া আবশ্যক। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যখন তুমি কোরআন পাঠ করবে, তখন (আউজুবিল্লাহর মাধ্যমে) বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইবে।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৯৮)
সুন্দর কণ্ঠ: যথাসম্ভব সুন্দর কণ্ঠে তিলাওয়াত করা উত্তম। হজরত জুবায়ের ইবনে মুতইম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)কে মাগরিব নামাজে সুরা তুর পড়তে শুনেছি, এত সুন্দর কণ্ঠ ও কিরাত আমি আর কারও থেকে শুনিনি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৬৫)
ধীরস্থিরভাবে: প্রতিটি আয়াত আলাদা আলাদা করে ধীরস্থিরভাবে তিলাওয়াত করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তুমি কোরআনকে ধীরস্থিরভাবে (তারতিলের সঙ্গে) তিলাওয়াত করো।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ০৪)। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.)কে মহানবির কোরআন তিলাওয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি বললেন, ‘তার কেরাত ছিল দীর্ঘ আকারের। তিনি টেনে টেনে পড়তেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৪৬) । অন্য হাদিসে এসেছে, হজরত উম্মে সালমা (রা.)-কে রাসুলের কোরআন পাঠ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, ‘তিনি একটি একটি আয়াত করে আলাদাভাবে পড়তেন।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৯২৭)
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ