হজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এটি একটি পবিত্র ইবাদত, যা শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে হজের গুরুত্ব, উদ্দেশ্য ও বিধিবিধান সম্পর্কে বহু আয়াত নাজিল হয়েছে। নিচে হজ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু আয়াত উল্লেখ করা হলো-
১. হজের খরচ ও সদাচরণের গুরুত্ব : আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং নিজেদের হাত দিয়ে নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনো না। আর তোমরা সদাচরণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সদাচারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা, ১৯৫) এই আয়াতে হজসহ সব ইবাদতের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়কে উৎসাহিত করা হয়েছে, যা হজযাত্রার প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
২. হজের আহ্বান ও উপকারিতা : আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মানুষকে হজের জন্য আহ্বান করো, তারা তোমার কাছে হেঁটে এবং এবং দূর-দূরান্ত থেকে চঞ্চল উটের পিঠে আসবে, যাতে তারা উপকারিতা লাভ করতে পারে এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে। অতঃপর তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবগ্রস্তদের খাওয়াও।’ (সুরা হজ, ২৭-২৮) এই আয়াতে হজের আহ্বান, আল্লাহর স্মরণ এবং সামাজিক দানশীলতার বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
৩. হজ শেষে আল্লাহর স্মরণ : আল্লাহতায়ালা বলেন, যখন তোমরা হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করবে, তখন আল্লাহকে স্মরণ করো, যেমন তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করো, বরং আরও গভীরভাবে। তবে কিছু মানুষ শুধু দুনিয়ার কল্যাণ চায় ‘হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে দাও, কিন্তু তাদের জন্য পরকালে কিছুই নেই।’ (সুরা বাকারা, ২০০) এই আয়াতে হজ পালনের পর আল্লাহর স্মরণ ও দোয়ায় মশগুল থাকার কথা বলা হয়েছে। জাগতিক লাভের পাশাপাশি পরকালের কল্যাণের জন্য দোয়ার গুরুত্ব এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪. কাবাঘরের পবিত্রতা ও তাওয়াফ : আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি ইব্রাহীমকে নির্দেশ দিয়েছিলাম, আমার সঙ্গে কোনো শিরক (অংশীদার) করো না এবং আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়কারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো।’ (সুরা হজ, ২৬) এই আয়াতে হজের সূচনা ইতিহাস, কাবাঘরের পবিত্রতা এবং তাওয়াফের বিধান সম্পর্কে বলা হয়েছে।
৫. হজের নিয়ম ও প্রতিজ্ঞা পালন : আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা যেন নিজেদের অবস্থা পরিচ্ছন্ন করে, প্রতিজ্ঞাগুলো পূর্ণ করে এবং সেই প্রাচীন ঘরের চারপাশে তাওয়াফ করে।’ (সুরা হজ, ২৯) এই আয়াতে হজের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ রোকন যেমন ইহরাম ত্যাগ করা, মান্নত পূরণ করা এবং কাবার চারপাশে তাওয়াফ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৬. কোরবানি ও তা থেকে খাওয়া ও দান করা : আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি তোমাদের জন্য কিছু পশুকে আল্লাহর নিদর্শন করেছি। এতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। তোমরা যখন সেগুলো কোরবানি করবে, তখন আল্লাহর নাম স্মরণ করো। তারপর তা থেকে খাও এবং দরিদ্র ও সৎকাজে লিপ্ত মানুষকে খাওয়াও।’ (সুরা হজ, ৩৩) এই আয়াতে কোরবানির পশুর তাৎপর্য এবং আল্লাহর নামে তা উৎসর্গ করার কথা বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে কোরবানির মাংস নিজেরা খাওয়া ও অভাবীদের মধ্যে বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পবিত্র কোরআনুল কারিমের এই আয়াতগুলো হজের গুরুত্ব, নিয়মকানুন ও অন্তর্নিহিত দর্শন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেয়। হজ শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের এক অনুপম নিদর্শন। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের উচিত কোরআনের এই নির্দেশনা অনুযায়ী হজ পালনের জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক