হারানোর বেদনা কত কঠিন, তা কেবল সেই বোঝেন যিনি হারিয়েছেন। বেদনা অনেক প্রকারের হয়। তবে মা-বাবা হারানোর বেদনার চেয়ে কঠিন বেদনা পৃথিবীতে সম্ভবত আর নেই। তাঁদের স্মৃতি মনের অজান্তে চোখ ভিজিয়ে তোলে। প্রতিটি সন্তানেরই চাওয়া থাকে মা-বাবা যেন আমৃত্যু তাদের পাশে থাকেন, তাঁদের মায়ার আঁচলে জীবন কাটাতে পারেন। কিন্তু সবার জীবনে এই আশা পূরণ হয় না।
তেমনি শিশু মুহাম্মদ (সা.) পৃথিবীতে আসার আগেই তাঁর বাবা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে হারান। তাঁর মায়ের নাম আমিনা বিনতে ওহাব। আব্দুল্লাহর সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিল তেরো বছর বয়সে এবং চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রসব করেন। মাত্র বিশ বছর বয়সে তিনিও ইন্তেকাল করেন। ছয় বছর বয়সে শিশু মুহাম্মদকে একা, অনিশ্চিত পৃথিবীর কোলে রেখে যান। ৫৭৬ সালের সেই সময়টি ছিল বেদনায় গাথা।
শিশু মুহাম্মদ (সা.)-এর সিনা চাকের ঘটনাটি দেখে দুধমা হালিমা (রা.) ভীষণ ভীত হয়ে পড়েন। তিনি নানা দুশ্চিন্তায় ভুগতে থাকেন, একদিকে আশার আলো, অন্যদিকে ভয়ের অন্ধকার। ফলে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি শিশুটিকে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেন। পরবর্তী সময়টা (ছয় বছর বয়স পর্যন্ত) তিনি মায়ের স্নেহ-মমতার ছায়ায় কাটান। (তালকিহুল ফুহুম, পৃষ্ঠা: ৭; ইবনে হিশাম ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৮)
মা আমেনার ইচ্ছা হলো, তিনি তাঁর পিতৃহীন পুত্রকে নিয়ে স্বামীর কবর জিয়ারত করবেন। তাই পুত্র মুহাম্মদ (সা.), দাসী উম্মে আয়মন ও শ্বশুর আবদুল মুত্তালিবকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় পাঁচ শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মদিনায় পৌঁছলেন। এক মাস সেখানে অবস্থানের পর মক্কার পথে রওনা হলেন।
মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি আবওয়া নামক স্থানে বিবি আমেনা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ক্রমশ তাঁর অসুস্থতা বাড়তে থাকে এবং কোনোভাবেই তাঁর সুস্থতা আর ফিরে আসেনি। অবশেষে তিনি শিশু মুহাম্মদকে মরুর বুকে একা রেখেই আবওয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম: ১ /১৬৮; তালকিছুল তুহুম, পৃ: ৭; ফেকহুছ সিরাত, গাজালি (রহ.), পৃ: ৫০)। আল-আবওয়া সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূলে রাবিঘ এলাকার অন্তর্গত মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী একটি হেজাজি গ্রাম। এই জায়গার একটি পাহাড়ের পাদদেশে তাঁকে দাফন করা হয়।
শিশু মুহাম্মদের বয়স তখন মাত্র ছয় বছর। জন্মের আগেই বাবা না ফেরার দেশে চলে যান, আর এত অল্প বয়সে হারালেন মাকেও। তাও এক অচেনা মরুভূমির বুকে, পাহাড়ের পাদদেশে। ‘আবওয়া’ নামের নির্জন সেই মরু প্রান্তর শিশু মুহাম্মদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল, হয়তো মরুর বালিকণাও কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। উম্মে আয়মন শিশুর হাত ধরে মক্কার দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু শিশু মুহাম্মদ (সা.) বারবার ফিরে তাকাচ্ছিলেন মায়ের কবরের দিকে, ছুটে যেতে চাইছিলেন তাঁর শেষ আশ্রয়ের দিকে।
মৃত্যুর ঠিক আগে আমিনা তাঁর দাসী উম্মে আয়মান (বারাকাহ)-কে কাছে ডাকলেন। কণ্ঠে কান্না আর বেদনাভেজা শব্দে বললেন— ‘বারাকাহ! আমি খুব শিগগিরই এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবো। আমার কলিজার টুকরো শিশুটিকে তোমার হাতে দিয়ে যাচ্ছি। গর্ভে থাকাকালেই সে তার বাবাকে হারিয়েছে। আজ সে তার মায়ের মৃত্যুও নিজের চোখে দেখছে। এখন থেকে তুমিই ওর মা। ওকে কখনো একা ফেলে যেয়ো না।’
মা আমিনা শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে আমানত হিসেবে তুলে দিলেন বারাকাহর হাতে। বারাকাহ বলেন, ‘আমিনার কথা শুনে আমার হৃদয় ভেঙে গেল। আমি কান্না শুরু করলাম। তখন শিশুটিও হতবিহ্বল হয়ে কান্না শুরু করে দিল। শিশু মুহাম্মদ (সা.)ও মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে অশ্রু ঝরাতে থাকল। আমিনাও শিশুটির সঙ্গে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। আর তারপর চিরতরে নীরব হয়ে যান।
শিশু মুহাম্মদ (সা.) মা আমিনার নিথর দেহের পাশে বসে ছিলেন। আশপাশে তখন আর কেউ ছিল না। আমিনার দেহ নীরব, নিস্তব্ধ। বারাকাহ (রা.) ও শিশুটির কণ্ঠে কেবল কান্না। বারাকাহ নিজ হাতে মরুর বালি সরিয়ে মায়ের জন্য কবর তৈরি করেন, সযত্নে আমিনাকে সেখানে শায়িত করেন। এর পর শিশুটিকে নিয়ে বারাকাহ ফিরে চললেন মক্কার পথে হৃদয়ে নিয়ে গ্লানির পাহাড়, আর হাতে ধরে এক মহান পাথেয়। (সিরাত ইবনে হিশাম: ১/ ১৬৭)
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক