সবেমাত্র পৃথিবীর আলো দেখেছে এক নিষ্পাপ, ফুটফুটে শিশু, যিনি একদিন হয়ে উঠবেন গোটা মানবজাতির শান্তির পথপ্রদর্শক- মুহাম্মদ (সা.)। জন্মের আগেই বাবাকে হারানোর বেদনা ছুঁয়ে গিয়েছিল তাঁর ছোট্ট হৃদয়কে। কিন্তু বিধাতা যেন শূন্যতা পূরণের জন্যই পাঠিয়েছিলেন এক স্নেহময় অভিভাবককে— দাদা আব্দুল মুত্তালিব।
নাতির জন্মের খবরে আব্দুল মুত্তালিবের অন্তর আনন্দে ভরে উঠল। নবজাতককে কোলে নিয়ে ছুটে গেলেন পবিত্র কাবা শরিফে। সেখানে সমবেত সবার মাঝে নিজের আনন্দের প্রকাশ ঘটালেন এবং পরম যত্নে নাতিকে আল্লাহর আশ্রয়ে সমর্পণ করার ঘোষণা দিলেন। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন, ‘সমস্ত প্রশংসা সেই মহান সত্তার, যিনি আমাকে এই পবিত্র শিশু দান করেছেন। আমি তাকে এই পবিত্র ঘরের আশ্রয়ে রাখছি। সকল হিংসা ও শত্রুর অনিষ্ট থেকে যেন তিনি রক্ষা করেন।’ (ইবনে হিশাম, পৃ: ১৫৮)
এর পর ছোট্ট মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে নেমে আসে আরও এক বিষাদের ছায়া। মমতাময়ী মা আমেনা বিনতে ওয়াহহাবের ইন্তেকালের পর শিশু মুহাম্মদ (সা.) যেন আরও একা হয়ে পড়েন। তখন উম্মে আয়মান তাঁকে মক্কায় নিয়ে আসেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তে মা-বাবাহীন ছোট্ট এক শিশুকে কোলে তুলে নিলেন বৃদ্ধ দাদা, যাঁর চোখে মুখে শুধু ভালোবাসার দীপ্তি। তিনি তাঁর আদরের নাতির দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। ৫৭৭ সাল থেকে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়— দাদার গভীর স্নেহ আর ভালোবাসায় বড় হতে থাকেন মুহাম্মদ (সা.)।
মক্কার প্রভাবশালী সর্দার আব্দুল মুত্তালিব তাঁর এই নাতিকে চোখে চোখে রাখতেন। যেখানেই যেতেন, ছোট্ট মুহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। সর্বদা আগলে রাখতেন, একমুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতেন না। বাবা-মায়ের অভাব যেন শিশু মুহাম্মদ (সা.) অনুভব করতে না পারে, সে বিষয়ে তিনি ছিলেন সদাসচেষ্ট। ভালোবাসার কোনো কমতি রাখেননি তাঁর আদরের নাতির জন্য। একবার কিনদির ইবনে সাইদ তাঁর পিতার বরাতে বর্ণনা করেন এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনার কথা। তিনি বলেন, জাহেলি যুগে হজ পালনের সময় মক্কায় এক ব্যক্তিকে ব্যাকুলভাবে এই দোয়া করতে দেখেন, ‘হে আল্লাহ! আমার সওয়ার মুহাম্মদকে ফিরিয়ে দিন এবং আমার ওপর আপনি রহম করুন।’
লোকজন জানায়, এই ব্যাকুল ব্যক্তি আর কেউ নন, মক্কার সর্দার আব্দুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম। তাঁর প্রিয় প্রপৌত্র হারিয়ে যাওয়া উট আনতে গিয়ে দেরি করায় তিনি অস্থির হয়ে পড়েছেন। কারণ, তিনি জানতেন মুহাম্মদ (সা.) যে কাজেই যান না কেন, সফল হয়েই ফিরে আসেন। কিছুক্ষণ পরই দেখা গেল, ছোট্ট মুহাম্মদ (সা.) ফিরে এসেছেন। আব্দুল মুত্তালিব পরম মমতায় তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘হে বৎস! আমি তোমার জন্য খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। তোমাকে চোখের আড়াল করে আমি স্থির থাকতে পারি না। আজ থেকে আর তোমাকে চোখের আড়াল করব না, একমুহূর্তের জন্যও তোমাকে আমার থেকে দূরে যেতে দেব না। (সীরাতুল মুস্তাফা, পৃ: ৮৩)
আব্দুল মুত্তালিব ছিলেন মক্কার সর্দার। কাবার ছায়ায় তাঁর জন্য পাতা থাকত বিশেষ এক মসনদ, যেখানে অন্য কারও বসার সাহস হতো না। কিন্তু সেই মর্যাদাপূর্ণ আসনে বসতেন তাঁর আদরের নাতি মুহাম্মদ (সা.)। যখন আব্দুল মুত্তালিব কাবায় যেতেন, ছোট্ট মুহাম্মদকে সঙ্গে নিতেন এবং নিজের পাশে বসাতেন। চাচারা যখন ভাবতেন এই বয়সে বিশেষ আসনে বসা বেয়াদবি, তারা মুহাম্মদকে সরাতে উদ্যত হতেন। কিন্তু আব্দুল মুত্তালিব তাদের বাধা দিতেন এবং স্নেহের আলিঙ্গনে নাতিকে আরও কাছে টেনে নিতেন। তিনি বলতেন, ‘আমার এই সন্তানকে ছেড়ে দাও, এখানেই বসতে দাও। আমি ওর মাঝে এক ভিন্ন জ্যোতি দেখতে পাই।’ আব্দুল মুত্তালিব অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন তাঁর নাতির দিকে, আর তাঁর নিষ্পাপ মুখাবয়ব দেখলে তাঁর হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে উঠত। (সীরাতুল মুস্তাফা, পৃ: ৮২)
শুধু তাই নয়, জন্মের সপ্তম দিনে আব্দুল মুত্তালিব নাতির আকিকা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন এবং কুরাইশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দাওয়াত করেন। সেই অনুষ্ঠানে তিনি সবার সামনে তাঁর নাতির জন্য সুন্দর একটি নাম নির্বাচন করেন— মুহাম্মদ। উপস্থিত কুরাইশরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আবুল হারিস! (আব্দুল মুত্তালিবের উপনাম), এই নামটি তো আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কারও ছিল না। আপনি কেন এই নাম রাখলেন? উত্তরে আব্দুল মুত্তালিব বলেন, ‘আমি আমার নাতির নাম মুহাম্মদ রেখেছি, যাতে সকল সৃষ্টিজীব তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়।’(সীরাতুল মুস্তাফা, পৃ: ৬২)
আব্দুল মুত্তালিব তাঁর প্রিয় নাতির জন্মের পূর্বে এক স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নই তাঁকে এই নামটি বেছে নিতে অনুপ্রাণিত করেছিল। স্বপ্নে তিনি দেখেছিলেন, তাঁর পিঠ থেকে একটি শেকল বের হয়ে আকাশ ও পৃথিবী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। শেকলটি ধীরে ধীরে এক আলোকময় বৃক্ষে পরিণত হয়, যার প্রতিটি পাতা সূর্যের আলোর চেয়েও ৭০ গুণ বেশি উজ্জ্বল। পূর্ব ও পশ্চিমের মানুষেরা সেই বৃক্ষের ডালে আবদ্ধ ছিল, এমনকি কুরাইশের কিছু লোকও সেই ডাল ধরেছিল। কিন্তু কিছু লোক সেই বৃক্ষটি কাটতে উদ্যত হলে এক সুদর্শন যুবক এসে তাদের সরিয়ে দেয়।
স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারগণ এই স্বপ্নের তাৎপর্য বর্ণনা করে বলেন, আপনার বংশে এমন একজন জন্মগ্রহণ করবেন, পূর্ব-পশ্চিমের লোকেরা তাঁর অনুসরণ করবে এবং আসমান ও জমিনের অধিবাসীরা তাঁর প্রশংসা ও স্তুতি জ্ঞাপন করবে। এই ব্যাখ্যা জানার পর আব্দুল মুত্তালিবের হৃদয়ে নাতির নাম মুহাম্মদ রাখার ইচ্ছা জাগে। আর তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন— এই শিশুর মাঝে লুকায়িত রয়েছে এক অসাধারণ আলো, এক মহান দায়িত্বের পূর্বাভাস। মক্কার এই মহান সর্দার যত দিন বেঁচে ছিলেন, তত দিন তাঁর প্রিয় প্রপৌত্র মুহাম্মদকে (সা.) এমনই গভীর ভালোবাসা আর মমতায় আগলে রেখেছিলেন। দাদার সেই স্নেহময় আলিঙ্গনই যেন ভবিষ্যতের নবিকে কঠিন পথ পাড়ি দিতে সাহস জুগিয়েছিল।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক