লুত (আ.) আল্লাহর একজন প্রিয় নবি। তিনি ইবরাহিম (আ.)-এর ভাতিজা। জন্ম ইরাকের বাবেল এলাকায়। মাতৃভূমি থেকে হিজরত করে ওরদুন, বর্তমান জর্ডানের মৃতসাগর এলাকায় ইসলাম প্রচারের জন্য আদিষ্ট হন। সেখানকার লোকেরা ন্যক্কারজনক সব অপরাধে জড়িত ছিল। অত্যাচার, অনাচার আর পাপাচারের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় যেসব জাতিকে খোদায়ি শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাদের মধ্যে আল্লাহর নবি হজরত লুত (আ.)-এর জাতি অন্যতম। মিথ্যা, ধোঁকা, প্রতারণা ও ব্যভিচারসহ এমন কোনো অপরাধ নাই যা তারা করেনি। সবশেষ নতুন যে পাপটি তারা আবিষ্কার করে সেটি হলো সমকামিতা। এটি করে প্রকাশ্যে আনন্দ-উল্লাস করত তারা। তাদের আগে কোনো জাতি এ কাজে লিপ্ত হয়নি। যার প্রতিফলস্বরূপ আসমানি কঠিন আজাবে তারা ধ্বংস হয়।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর লুতকে আমি প্রজ্ঞা ও জ্ঞানদান করেছিলাম। আমি তাকে এমন এক জনপদ থেকে উদ্ধার করেছিলাম, যার অধিবাসীরা অশ্লীল কাজে লিপ্ত ছিল। তারা ছিল এক মন্দ ও পাপাচারী কওম। আর আমি তাকে আমার রহমতের মধ্যে শামিল করে নিয়েছিলাম। সে ছিল সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা আম্বিয়া, ৭৪-৭৫)। পবিত্র কোরআনে লুত নবির জাতির ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে এভাবে, ‘স্মরণ করো লুতের কথা, তিনি তার জাতিকে বলেছিলেন, তোমরা কেন অশ্লীল কাজ করছ? অথচ এর পরিণতির কথা তোমরা অবগত আছ! তোমরা কি কামতৃপ্তির জন্য নারীদের ছেড়ে পুরুষে উপগত হবে? তোমরা তো এক বর্বর সম্প্রদায়। উত্তরে তার কওম শুধু এ কথাটিই বলল, লুত পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক যারা শুধু পাকপবিত্র সাজতে চায়। অতঃপর তাকে ও তার পরিবারবর্গকে উদ্ধার করলাম তার স্ত্রী ছাড়া। কেননা তার জন্য ধ্বংসপ্রাপ্তদের ভাগ্যই নির্ধারিত করেছিলাম। আর তাদের ওপর বর্ষিয়ে ছিলাম এক ভয়ংকর বৃষ্টি। ভীতি প্রদর্শিতদের ওপর কতই না মারাত্মক ছিল সে বৃষ্টি।’ (সুরা নামল : ৫৪-৫৮) দমুফাসসিরগণ বলেন- সমকামিতার মহাঅপরাধে লুত (আ.)-এর জাতির ওপর সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মহাপ্রলয় নেমে আসে। এক শক্তিশালী ভূমিকম্প পুরো নগরটি সম্পূর্ণ উল্টে দেয়। ঘুমন্ত মানুষের ওপর তাদের ঘরবাড়ি আছড়ে পড়ে। পাশাপাশি আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো কঙ্কর নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। ওই মহাপ্রলয়ের হাত থেকে কেউ রেহাই পায়নি।
আল্লাহতায়ালা অতীতের অবাধ্য, পাপিষ্ঠ জাতিগুলো সমূলে ধ্বংস করে পরে তাদের শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ দিয়েছেন, যাতে সেসব জাতি পাপ ও অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি না ঘটায় পৃথিবীতে। পবিত্র কোরআনে কওমে আদ, কওমে সামুদ, কওমে লুত, ফেরাউন, কারুণের করুণ পরিণতির কথা বারবার আলোচিত হয়েছে। তা থেকে শিক্ষাগ্রহণের উপদেশ দেওয়া হয়েছে। আজও পৃথিবীতে তাদের ধ্বংসাবশেষের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। জর্ডানে অবস্থিত মৃত সাগর অভিশপ্ত সমকামী কওমে লুতের ধ্বংসলীলার জীবন্ত সাক্ষী। ঐতিহাসিকদের মতে, এককালে এ স্থানটি শুষ্ক জনপদ ছিল। সামুদ ও আমুরা সম্প্রদায় বাস করত সেখানে। জিবরাঈল (আ.) সম্পূর্ণ এলাকাটিকে উপরে উঠিয়ে তা ছেড়ে দেন। ফলে মাটির অতি গভীরে চলে যায় এবং নিচের পানি উপরে উঠে আসে। এভাবে জনপদটি সমুদ্রের রূপ পরিগ্রহ করে।
প্রাচীন যুগে এটিকে বাহরে লুত বা লুত সাগর বলা হতো। এর পানি অত্যধিক লবণাক্ত বিধায় তাতে মাছ বা অন্য কোনো জীবিত প্রাণী থাকতে পারে না। সমকামিতার অভিশাপ হয়ে সাগরটি আজও পৃথিবীতে বহমান। যাতে পৃথিবীবাসী কওমে লুতের এ ভয়াবহ শাস্তি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং সমকামিতার মতো নিকৃষ্ট অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার সাহস না পায়। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে যে, আজ পৃথিবীজুড়ে সেই অভিশপ্ত সমকামিতার আওয়াজ উচ্চকিত হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বে এর সামাজিক বৈধতার জন্য আন্দোলন হচ্ছে এবং কোনো কোনো আইন বৈধতাও লাভ করেছে। সেসব দেশে সমকামী বিয়ের ঘটনা অহরহ ঘটছে, আল্লাহতে বিশ্বাসী মানুষ যাতে বিচলিত না হয়ে পারেন না। নতুন কোনো আজাবের আশঙ্কায় আমরা আতঙ্কিত ও চিন্তিত।
লেখক: খতিব, মেইন বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদ, কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহ