মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া অসিয়ত এবং ওয়াকফ (জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য উৎসর্গীকৃত সম্পদ) যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে অনেক সময় এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা দেখা যায়। বিশেষ করে যখন অসিয়ত বা ওয়াকফ মৌখিক হয় অথবা রেজিস্ট্রি দলিল করা থাকে না, তখন ওয়ারিশদের মধ্যে গড়িমসি বা অনীহা দেখা যায়। এ ধরনের গড়িমসি কেবল অন্যায়ই নয়, বরং মারাত্মক অপরাধ।
কেন এই গড়িমসি অন্যায়?
মৃত ব্যক্তি তার জীবদ্দশায় নিজের ইচ্ছানুযায়ী কিছু সম্পদ জনকল্যাণে উৎসর্গ করে যান (ওয়াকফ) অথবা নির্দিষ্ট কাউকে কিছু দেওয়ার কথা বলে যান (অসিয়ত)। এই কাজগুলো মূলত সওয়াবের নিয়তে এবং সমাজের উপকারের জন্য করা হয়। যখন ওয়ারিশরা এই অসিয়ত বা ওয়াকফ বাস্তবায়নে গড়িমসি করেন, তখন তারা একদিকে যেমন মৃত ব্যক্তির হক নষ্ট করেন, তেমনি অন্যদিকে আল্লাহর নির্দেশকেও অমান্য করেন। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির অসিয়ত (যা মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি হতে পারবে না এবং ওয়ারিশ ব্যতীত অন্য কাউকে হতে হবে) এবং ওয়াকফ বাস্তবায়ন করা ওয়ারিশদের জন্য আবশ্যক। এমনকি যদি মৌখিকভাবেও তা চূড়ান্ত করা হয়, সৎ ও বিশ্বাসী ওয়ারিশদের দায়িত্ব হলো তা বাস্তবায়ন করা এবং প্রয়োজনে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া। এই গড়িমসি মৃত ব্যক্তির আত্মাকে কষ্ট দেয় এবং আখেরাতে ওয়ারিশদের জন্য জবাবদিহিতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অন্তিম অসুস্থতায় রাখা নগদ অর্থ ও পাওনাদারের হক
ইসলামি আইনে, মৃত্যুশয্যায় (অন্তিম অসুস্থতা) করা লেনদেন বা নির্দেশনা কিছুটা ভিন্নভাবে দেখা হয়। যদি কোনো ব্যক্তি অন্তিম অসুস্থতার সময় কোনো ওয়ারিশের জন্য কারও কাছে কিছু নগদ অর্থ রেখে যায় এবং পরবর্তী সময়ে সেই মৃত ব্যক্তির কোনো পাওনাদার (যাকে সে ঋণ বা অন্য কোনো কারণে অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য ছিল) বের হয়ে আসে, তা হলে সেই নগদ অর্থ দিয়ে প্রথমেই পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে।
এর কারণ অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, মৃতের সম্পদে ওয়ারিশের চেয়ে পাওনাদারের হক আগে। ইসলামি শরিয়ত ঋণ পরিশোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের খরচ মেটানোর পর, প্রথমেই তার সমস্ত ঋণ ও পাওনা পরিশোধ করতে হবে। এর পর যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে, তবেই অসিয়ত কার্যকর হবে এবং অবশিষ্ট সম্পদ ওয়ারিশদের মাঝে বণ্টিত হবে।
অতএব, গচ্ছিত রাখা অর্থ যদি পাওনাদারের হক পূরণের জন্য প্রয়োজন হয়, তবে তা ওয়ারিশকে না দিয়ে পাওনাদারকে বুঝিয়ে দিতে হবে। এটি মৃত ব্যক্তির বোঝা হালকা করার এবং তার হক আদায় করার জন্য অপরিহার্য। ওয়াকফ এবং অসিয়তের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সঠিক পন্থায় বাস্তবায়ন করা আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজের জন্যই ক্ষতিকর।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক