ইসলামে এমন কিছু পাপ আছে যা আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও আল্লাহর কাছে তা অত্যন্ত ঘৃণ্য। এর মধ্যে অন্যতম হলো পরনিন্দা ও চোগলখোরি— একজনের কথা আরেকজনের কাছে এমনভাবে বলা, যাতে তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরে বা তাদের মাঝে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। এই জঘন্য অভ্যাসটি সমাজে বিভেদ ও অশান্তি তৈরি করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এটি আজ আমাদের সমাজের একটি সাধারণ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সা.) এই আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
কোরআন ও হাদিসের কঠোর হুঁশিয়ারি: চোগলখোরি কতটা নিন্দনীয়, তা কোরআনুল কারিমে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, আর আপনি আনুগত্য করবেন না প্রত্যেক এমন ব্যক্তির, যে অধিক শপথকারী, লাঞ্ছিত, পশ্চাতে নিন্দাকারী ও চোগলখোর। (সুরা কলাম, ১০-১১)
হাদিসে এই পাপের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে আরও কঠোরভাবে বলা হয়েছে। হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহিহ মুসলিম)
অন্য হাদিসে চোগলখোরদের আল্লাহর নিকৃষ্টতম বান্দা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর সবচেয়ে উত্তম বান্দা হলো তারা, যাদের দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়। আর আল্লাহর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বান্দা হলো চোগলখোর, প্রিয়জনদের মাঝে ফাটল সৃষ্টিকারী ও নির্দোষ ব্যক্তিদের প্রতি অপবাদ আরোপকারী। (মুসনাদে আহমাদ)
মিথ্যাচার ও অতিরঞ্জন চোগলখোরির আসল রূপ: চোগলখোররা সাধারণত যা শোনে, তা হুবহু বলে না। নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তারা শোনা কথায় রং মাখায়, অতিরঞ্জন করে, অথবা মনগড়া কথা জুড়ে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য থাকে কেবলই সম্পর্ক নষ্ট করা এবং অন্যের ক্ষতিসাধন করা। এই প্রবণতাকে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে একটি কবিতায়:
ভালো কথা শুনলে তারা গোপন করে রাখে মন্দ কিছু শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে। মনের মতো কিছু শুনতে নাহি পেলে নিজে থেকে রং মিশিয়ে বানিয়ে যে ফেলে।
এই অভ্যাস এতটাই ঘৃণ্য যে, দ্বিতীয় খলিফা উমার ইবনু আব্দুল আযিয (রহ.)-এর কাছে যখন এক ব্যক্তি কারও নিন্দা করল, তখন তিনি তাকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তুমি যদি মিথ্যা বলে থাকো, তা হলে তুমি এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত- ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও, যাতে অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করতে না পারো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে না হয়। (সুরা হুজুরাত, ৬)
ইসলামে সম্পর্কের গুরুত্ব: তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে কথা গোপন করার বা ভালো কথা যোগ করার অনুমতি আছে, যা সম্পর্কের ভাঙন রোধ করে। দুটি পক্ষের মধ্যে মীমাংসা করার সময় যদি কোনো অপ্রীতিকর কথা শোনা যায়, তা হলে তা গোপন রাখা জায়েজ। এমনকি সম্পর্ক জোড়া লাগানোর জন্য ভালো কথা জুড়ে দেওয়াও অনুমোদিত। উম্মু কুলসুম বিনতে উকবা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, সে ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয়, যে মানুষের মাঝে মীমাংসা করতে গিয়ে ভালো কথা পৌঁছায় অথবা ভালো কথা বলে। (সহিহুল বুখারি, ২৬৯২)
চোগলখোরি একটি আত্মঘাতী পাপ- যা কেবল নিজের আমলই নষ্ট করে না, বরং সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতাও বিনষ্ট করে। আসুন, আমরা এই জঘন্য পাপ থেকে নিজেদের বিরত রাখি এবং অন্যের ব্যাপারে কোনো মন্দ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তা প্রচার না করে যাচাই করি। কারণ, ইসলামের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো শান্তি, সৌহার্দ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠা করা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক