আরবি বর্ষপঞ্জিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্মানিত একটি মাসের নাম রজব। আরবি বর্ষপরিক্রমার সপ্তম মাস এটি। রজব শব্দের অর্থ সম্মান করা। ইবনু ফারিস (রহ.)-এ মাসকে রজব নামে নামকরণের কারণ উল্লেখ করে বলেন, কারণ আরবের লোকরা এ মাসকে অনেক বেশি সম্মান করত, অবশ্য পরবর্তী সময়ে শরিয়তেও সে সম্মান বহাল রাখা হয়। (মাকাইসুল লুগাহ, পৃ. ২৪৯৫) এ মাসকে মুজার গোত্রের দিকে সম্পৃক্ত করে রজাবু মুজার নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। কারণ মুজার গোত্র অন্যান্য সম্মানিত মাসের চেয়েও এ মাসকে বেশি সম্মান করত। (ফাতহুল বারী ১/১৩২)
রজব মাস সম্মানিত চার মাসের অন্তর্ভুক্ত: পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকেই সময়ের হিসাব ঠিক রাখার জন্য আল্লাহতায়ালা ১২টি মাস নির্ধারণ করে রেখেছেন। তন্মধ্যে চারটি মাসকে হারাম বা সম্মানিত মাস হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে আল্লাহর কিতাবে তথা লাওহে মাহফুজে মাসের সংখ্যা ১২টি। সেই দিন থেকে, যে দিন আল্লাহতায়ালা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। এর মধ্যে চারটি মাস মর্যাদাপূর্ণ। এটাই সহজ-সরল দ্বীন এর দাবি। সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোর ব্যাপারে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না এবং তোমরা সবাই মিলে মুশরিকদের সঙ্গে লড়াই করো, যেমন তারা সবাই মিলে তোমাদের সঙ্গে লড়াই করে। বিশ্বাস রেখো নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের সঙ্গে আছেন। (সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৬)
নবিজি (সা.) সম্মানিত চার মাস নির্ণয় করে বলেন, আল্লাহ যে দিন আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, সে দিন হতে সময় যেভাবে আবর্তিত হচ্ছিল আজও তা সেভাবে আবর্তিত হচ্ছে। ১২ মাসে এক বছর। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। জুল-কাদাহ, জুল-হিজ্জাহ ও মুহাররাম। তিনটি মাস পরস্পর রয়েছে। আর একটি মাস হলো রজব-ই-মুজারা, যা জুমাদা ও শাবান মাসের মাঝে অবস্থিত। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩১৯৭)
মাসগুলো সম্মানিত হওয়ার কারণ ও হেকমত: ইমাম আবুবকর জাসসাস (রহ.) বলেন, এই চারটি মাসকে সম্মানিত ঘোষণা করার দুটি কারণ রয়েছে। ১. এ মাসে যুদ্ধবিগ্রহ হারাম, যা আরবের মুশরিকরাও মেনে চলত। আল্লাহতায়ালা বলেন, লোকে আপনাকে মর্যাদাপূর্ণ মাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তাতে যুদ্ধ করা কেমন? আপনি বলে দিন, তাতে যুদ্ধ করা মহাপাপ। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৭) ২. অন্য মাসের তুলনায় এ মাসে গুনাহর পরিণতি অতি ভয়াবহ আর ইবাদতের প্রতিদান বড়। (আহকামুল কুরআন, পৃ. ৩/১৪৩)
আল্লামা ইবনে কাছির (রহ.) নির্দিষ্ট এই চার মাসকে সম্মানিত ঘোষণা করার হেকমত হিসেবে উল্লেখ করেছেন, জুল-কাদাহ, জুল-হিজ্জাহ ও মুহাররাম এই তিন মাসকে হজ পালনের সুবিধার্থে হারাম করা হয়েছে। যেন হজের মাসের আগে ও পরে সবাই নিরাপত্তার সঙ্গে মক্কা নগরীতে আগমন এবং সেখান থেকে প্রস্থান করতে পারে। আর রজব মাসকে হারাম করা হয়েছে উমরা পালনের সুবিধার্থে। (তাফসিরে ইবনে কাছির, পৃ. ৪/১৪৮)
রজব মাসের ইবাদত ও সালাফের গুরুত্বারোপ: সম্মানিত চার মাসের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় রজব মাসের ফজিলত প্রমাণিত। তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে এ মাসে স্বতন্ত্র কোনো ইবাদত নেই। বরং অন্যান্য মাসের মতো ইবাদত বন্দেগিতে লিপ্ত থাকবে। গুরুত্বের সঙ্গে ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল ইবাদতগুলো আদায় করবে। জিকির, তাসবিহ, তাহলিল ও কোরআন তেলাওয়াতে সময় অতিবাহিত করবে। রজব মাসের অভ্যাস রমজান মাসে আমলের উন্নতির জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখবে, ইনশাআল্লাহ।
রজব মাসে যদিও সুনির্দিষ্ট ইবাদত প্রমাণিত নেই তথাপি সময়টা আমাদের জন্য বরকতময়। তাই গুরুত্বের সঙ্গে আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। রজব মাসের ব্যাপারে সালাফের আমল ও উক্তিগুলো সামনে থাকলে আমাদের জন্য তা অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।
ক. ইবাদতের বীজ বপনের মাস: রজব মাস হলো ইবাদতের বীজ বপনের মাস। ইমাম ইবনে রজব (রহ.) বলেন, এ মাস বরকত ও কল্যাণময় মাসগুলোর মূল ও চাবিকাঠি। ইমাম আবুবকর বলখি (রহ.) বলেন, রজব হলো বীজ বপনের মাস। শাবান হলো পানি সিঞ্চনের (পরিচর্যার) মাস। আর রমজান হলো ফসল কেটে ঘরে তোলার মাস। (লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃ. ১২১)
খ. এ মাসের ইবাদত অন্যান্য মাসের সহযোগী: সম্মানিত মাসগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এ সময় ইবাদতে মশগুল থাকলে অন্য মাসে ইবাদতে কাটানো সহজ হয়। আবার এ সময়গুলোয় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকলে অন্য মাসে গুনাহ থেকে বাঁচা সহজ হয়। (মাআরিফুল কুরআন, পৃ. ৪/৩৭২)
গ. রমজান মাসের প্রস্তুতি: রজব মাসের এক মাস পর রমজান মাস। তাই বিশেষভাবে এ মাস থেকেই রমজানের প্রস্তুতি শুরু করা। যেন রমজান আসলে বিভিন্ন ব্যস্ততা চেপে না বসে। একইভাবে ইবাদত বন্দেগির সঙ্গে নিজেকে অভ্যস্ত করে তোলা, যেন রমজানে ইবাদতে লিপ্ত হতে অলসতা তৈরি না হয়। (লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃ. ১২১)
রজব মাসের করণীয় কিছু আমলও রয়েছে, যদিও রজব মাসের সুনির্দিষ্ট কোনো ইবাদত নেই, তবুও এ মাসের মাহাত্ম্য ও মর্যাদা অনেক। তাই অন্যান্য মাসের ইবাদতগুলোই আরও বেশি গুরুত্বের সঙ্গে সম্পাদন করার চেষ্টা করা। নিচে উল্লেখযোগ্য কিছু আমলের কথা তুলে ধরা হলো-
নেক আমলের প্রতি মনোযোগী হওয়া: রজব মাসসহ অন্যান্য হারাম মাসে ইবাদত ও নেক আমলের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা এ সময় প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব বৃদ্ধি পায়। ইমাম ইবনে কাছির (রহ.) বলেন, আল্লাহতায়ালা হারাম মাসে গুনাহকে বড় করে দেখেন। আবার নেক আমলের সওয়াব ও প্রতিদানও বেশি করে দেন। (তাফসিরে ইবনে কাছির, পৃ. ৪/১৩০)
গুনাহ করে নিজের ওপর জুলুম না করা: গুনাহ করা সব সময়ই হারাম ও নিষিদ্ধ। তবে সম্মানিত মাসগুলোয় তা আরও কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহতায়ালা বলেন, সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোর ব্যাপারে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না। (সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৬)
আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে জারির তাবারি (রহ.) লেখেন, তোমরা নিজেদের ওপর জুলুম করো না এ কথার অর্থ হলো, তোমরা এ সময় আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ো না। আল্লাহর নিষিদ্ধ কোনো কাজকে হালাল করো না। অন্যথায় তোমরা আল্লাহর ক্রোধ ও শাস্তির সম্মুখীন হবে। (তাফসিরে তাবারি, পৃ. ১৪/২৩৭)
রমজান লাভের জন্য দোয়া জারি রাখা: রজব মাস পর্যন্ত মহান আল্লাহ যেহেতু আমাদের হায়াত দান করেছেন তাই এখন বেশি বেশি দোয়া করা, যেন আল্লাহ আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দেন। রমজানের খায়ের, বরকত ও কল্যাণ দিয়ে আমাদের সিক্ত করেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রজব মাস এলে নবিজি (সা.) বলতেন, আল্লাহুম্মা বারিক-লা-না ফি রাজাবা ওয়া শাবান, ওয়া বাললিগ না রামাদান। অর্থ- হে আল্লাহ! রজব ও শাবানে আমাদের বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজানে পৌঁছে দিন। (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ)
বেশি বেশি রোজা রাখা: রজব মাসে দিন তারিখ নির্ধারণ করা ব্যতীত বেশি বেশি নফল রোজা রাখা। নবিজি (সা.) রজব মাসে অনেক সময় রোজা রাখতেন।
উমরা পালন করা: হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-সহ অনেক সাহাবায়ে কেরাম এ মাসে উমরা পালন করতেন। তাই সম্ভব হলে এই আমলটি করা।
আল্লাহতায়ালা আমাদের রজব মাসের মাহাত্ম্য ও মর্যাদা ধারণ করে সময়গুলো কাজে লাগানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া ইসলামিয়া মেহেরপুর