রমজান মাসে রোজা পালনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সাহরি ও ইফতার। অনেকেই এগুলোকে শুধু রোজার আনুষ্ঠানিক অংশ মনে করেন, কিন্তু ইসলামি দৃষ্টিকোণ ও আধুনিক বিজ্ঞান—দুটোই প্রমাণ করে যে, এ দুটি সময়ের খাবারের শারীরিক ও আধ্যাত্মিক উপকারিতা রয়েছে।
প্রথমে জেনে নিই সাহরি কী? সাহরি হলো ফজরের আগে শেষ রাতে গ্রহণ করা খাবার, যার মাধ্যমে দিনের রোজা রাখা শুরু হয়। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, তোমরা খাও এবং পান করো, যতক্ষণ না সুবহে সাদিকের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে পৃথক হয়ে যায়; তারপর রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো। (সুরা বাকারা, ১৮৭) । এই আয়াতে সাহরির সময়সীমা নির্ধারণ করে ফজর উদয়ের আগ পর্যন্ত খাওয়ার বৈধতা ঘোষণা করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে। (বুখারি, ১৯২৩; মুসলিম, ১০৯৫)
সাহরি খাওয়া সুন্নত এবং এতে বিশেষ বরকত রয়েছে। সাহরি যত দেরিতে করা যায়—অর্থাৎ ফজরের একদম কাছাকাছি সময়ে সাহরি খাওয়া উত্তম। জায়দ ইবনে সাবিত (রা.) বলেন, আমরা আল্লাহর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সাহরি খাই এরপর তিনি নামাজের জন্য দাঁড়ান। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, আজান ও সাহরির মাঝে কতটুকু ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, ৫০ আয়াত (পাঠ করা) পরিমাণ। (বুখারি, ১৯২১)
ইফতার কাকে বলে? ইফতার হলো সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে রোজা ভঙ্গ করার জন্য খাবার বা পানীয় গ্রহণ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ ততক্ষণ কল্যাণের ওপর থাকবে, যতক্ষণ তারা ইফতার তাড়াতাড়ি করবে। (বুখারি, ১৯৫৭; মুসলিম, ১০৯৮)। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা সুন্নাহ। বিলম্ব করা উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাধারণত খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। খেজুর না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করতেন। (আবু দাউদ, ২৩৫৬)
বৈজ্ঞানিক উপকারিতা—সাহরি ও ইফতার করা রোজার বিধান এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত। তার প্রতিটি সুন্নত, প্রতিটি আমল ও আদর্শে বৈজ্ঞানিক উপকারিতা রয়েছে। রমজানের রোজার সাহরি ইফতারও এর ব্যতিক্রম নয়।
দীর্ঘ সময় উপবাসের ফলে পরিপাকতন্ত্র বিশ্রাম পায়। এতে গ্যাস্ট্রিক সমস্যা কমতে পারে। সময়মতো ও পরিমিত সাহরি ও ইফতার গ্রহণ করলে তা হজমে সহায়তা করে।
খেজুরে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, ফাইবার ও পটাশিয়াম। Journal of Agricultural and Food Chemistry-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, খেজুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ এবং দ্রুত শক্তি সরবরাহ করে। এটি দীর্ঘ উপবাসের পর রক্তে শর্করা ধীরে ও নিরাপদভাবে বাড়াতে সহায়তা করে।
সাহরিতে জটিল কার্বোহাইড্রেট (ওটস, লাল চাল, গম), প্রোটিন (ডিম, ডাল, দই) এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি গ্রহণ করলে শক্তি ধীরে ধীরে মুক্ত হয়। Harvard Medical School-এর পুষ্টি গবেষণায় বলা হয়েছে, low glycemic index খাবার দীর্ঘ সময় রক্তে শর্করার স্থিতি বজায় রাখে এবং হঠাৎ দুর্বলতা কমায়।
সাহরিতে পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীরের জলীয় ভারসাম্য বজায় থাকে। Mayo Clinic জানায়, সঠিক হাইড্রেশন রক্তচাপ, কিডনি কার্যক্রম এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ঠিক রাখে।
নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া শরীরের জৈবঘড়ি (circadian rhythm) ঠিক রাখে। National Institutes of Health-এর গবেষণায় দেখা যায়, সময়-নির্ধারিত খাদ্যাভ্যাস বিপাকীয় স্বাস্থ্য উন্নত করে এবং ইনসুলিন কার্যকারিতা বাড়ায়।
খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার শুরু করলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ হয়। এতে একবারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়। এটি হজমের জন্য উপকারী।
সাহরি ও ইফতার ইসলামের সুন্নাহভিত্তিক দুটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। কোরআন ও হাদিসে এদের ফজিলত ও সময় নির্ধারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। আধুনিক বিজ্ঞানও প্রমাণ করছে, সঠিক সময়ে সুষম খাবার গ্রহণ শক্তি, বিপাকীয় ভারসাম্য, হৃদস্বাস্থ্য ও হজমশক্তির জন্য অত্যন্ত উপকারী। সুতরাং সাহরি দেরিতে করা এবং সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা—এ দুটিই সুন্নাহ এবং বৈজ্ঞানিকভাবেও স্বাস্থ্যসম্মত। সুন্নাহ অনুসরণ করলে ইবাদত পূর্ণতা পায়, আর সচেতন খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে শরীরও থাকে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ।
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক