এই নশ্বর পৃথিবীর কঠিন বাস্তবতায় আমরা সবাই এক একজন ক্লান্তিহীন মুসাফির। আমাদের দিন কাটে কপালে লোনা ঘাম জমিয়ে, আর রাত কাটে বালিশে আগামীর রঙিন স্বপ্ন বুনে। সমাজ আমাদের শেখায় খাটতে থাকো, নিজেকে নিংড়ে দাও, তবেই মিলবে সফলতা। আমরাও তাই করি; শরীরের শেষ রক্তবিন্দু আর মস্তিস্কের শেষ কোষটুকু বিলিয়ে দিয়ে আমরা সাফল্যের সেই অধরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার লড়াই চালিয়ে যাই। এই অমানুষিক সংগ্রামের জোরে হয়তো আমরা সাফল্যের ৯৯ শতাংশ দোরগোড়ায় পৌঁছেও যাই। কিন্তু ঠিক যখন জয়ের বিজয়তিলক কপালে ওঠার কথা, তখনই দেখা যায় সব হিসেব ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। কেন জানি সব ঠিক থাকার পরেও শেষমেশ ওই ১০০ সংখ্যাটা আর ছোঁয়া হয় না। জীবনের খাতা মেলাতে গিয়ে দেখি, সামান্য ওই ১ শতাংশের জন্য পুরো জীবনের অংকটাই অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।
আসলে ভাই, এই ১ শতাংশ কোনো মানুষের মেধা, ক্ষমতা বা টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। ওটা হলো সরাসরি আরশ থেকে নির্ধারিত আসমানি ফয়সালা যাকে আমরা এক কথায় বলি তাকদির। আমাদের একটা ধ্রুব সত্য কলিজা দিয়ে বুঝতে হবে বান্দার সাধ্যের সীমানা যেখানে এসে থমকে দাঁড়ায়, আমার রবের কুদরতের মহিমা ঠিক সেখান থেকেই পাখা মেলে। আমরা আমাদের মেহনতে ৯৯ পর্যন্ত যাওয়ার ক্ষমতা রাখি ঠিকই, কিন্তু তাতে চূড়ান্ত কামিয়াবীর সিলমোহর মারার মালিক একমাত্র তিনি।
মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে আমাদের জীবনের এই অনন্ত সংগ্রামের মূলমন্ত্র বলে দিয়েছেন, মানুষ তা-ই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে। (সুরা আন-নাজম, আয়াত: ৩৯)। এই আয়াত আমাদের অলস হয়ে বসে থাকার কোনো সুযোগ দেয়নি; বরং শিখিয়েছে যে প্রচেষ্টা আমাদের আবশ্যিক কর্তব্য। কিন্তু সেই চেষ্টার সাথে হৃদয়ে থাকতে হবে আল্লাহর ওপর এক অটল পাহাড়সম তাওয়াক্কুল। আমাদের প্রিয় নবিজি (সা.) আমাদের জীবনের এই কঠিন সমীকরণের সমাধান দিয়েছেন অতি সহজ এক চিরন্তন উদাহরণের মাধ্যমে, তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের ঠিক পাখিদের মতো রিজিক দান করতেন যারা সকালে খালি পেটে নীড় থেকে বের হয় (চেষ্টা করে) এবং সন্ধ্যায় তৃপ্ত হৃদয়ে ভরা পেটে ফিরে আসে।(তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪)
একটু মগজ খাটিয়ে ভেবে দেখুন তো, পাখি কি কেবল বাসায় বসে তসবিহ পাঠ করে? কক্ষনো না! সে ডানা ঝাপটায়, ঝড়-বৃষ্টির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দিগন্ত চষে বেড়ায়। এটাই হলো তার ৯৯ শতাংশ মেহনত। আর তার এই অবিরাম ডানার ঝাপটানির পর অদেখা আহারের ব্যবস্থা করে দেওয়াটা হলো আল্লাহর সেই ১ শতাংশ গায়েবি রহমত। পাখির সেই অগাধ বিশ্বাস আছে বলেই সে শূন্য পেটে বিশাল আকাশে উড়াল দিতে ভয় পায় না। আমাদের জীবনটাও ঠিক তেমনই এক অনন্ত আসমান।
তাই আমার ভাইদের প্রতি কলিজার আকুতি কখনো পরাজয় মেনে নিয়ে ভেঙে পড়বেন না। নিজের জানপ্রাণ উজাড় করে দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যান, মেহনতে কোনো কার্পণ্য করবেন না। কিন্তু একই সাথে মনে রাখবেন, ওই ১ শতাংশ পূর্ণতার চাবিকাঠি আপনার পকেটে নেই, ওটা আছে আরশের মালিকের কুদরতি হাতে। তাই দুনিয়াবি মেহনত করার পাশাপাশি মালিকের কাছে সেজদায় লুটিয়ে পড়তে শিখুন। যখন আপনার কপালে জমে থাকা মেহনতের নোনা ঘাম আর মহান আল্লাহর আসমানি রহমতের বারিধারা এক বিন্দুতে মিলিত হবে, তখনই জন্ম নেবে সেই আসল সফলতা যা কেবল আপনার এই পার্থিব জীবনকে নয়, আপনার পরকালীন অস্তিত্বকেও সার্থক করবে।
বিশ্বাস রাখুন, দুনিয়ার মানুষ স্বার্থপর হতে পারে, আপনার হাড়ভাঙা কষ্টের দাম তারা নাও দিতে পারে; কিন্তু আমার আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দার মেহনত বৃথা যেতে দেন না। প্রতিটি বিনিদ্র রজনী আর প্রতিটি ফোঁটা ঘামের হিসাব তাঁর সুক্ষ্ম পাল্লায় পরম যত্নে জমা আছে। আপনার চেষ্টার সাথে চোখের নোনা জল আর সবরের মিশ্রণ ঘটান। দেখবেন, যখন আল্লাহ আপনার জন্য কামিয়াবীর দ্বার খুলে দেবেন, তখন মহাবিশ্বের কোনো শক্তিই আপনাকে আর রিক্ত হাতে ফেরাতে পারবে না। ইনশাআল্লাহ, বিজয় আপনার কপালে চুমু খাবেই!
লেখক: শিক্ষার্থী, কুষ্টিয়া সরকারি সেন্ট্রাল কলেজ