বছরে একবার আসে এই দিন। লক্ষ-কোটি মুসলমান একই সময়ে একই নিয়তে আল্লাহর সামনে মাথা নত করেন—হাতে ছুরি, বুকে ইখলাস। এই দৃশ্য পৃথিবীর ইতিহাসে অতুলনীয়। কোরবানি শুধু একটি পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এই ইবাদতের ফজিলত অসীম। প্রতিটি পশমে নেকি, প্রতিটি রক্তের ফোঁটায় গুনাহ মাফ, কিয়ামতে পুলসিরাতের বাহন–এই পুরস্কারগুলো কেবল কোরবানিদাতার জন্য আল্লাহর বিশেষ দান। কিন্তু এই ফজিলত কেবল তাদের জন্য–যারা সঠিক নিয়তে, সঠিক নিয়মে কোরবানি করেন।
এটি হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত: হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) বলেন, সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন—‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! এই কোরবানি কী?’ তিনি বললেন, ‘এটি তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত।’ (ইবনে মাজাহ, ৩১২৭)
প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি: একই হাদিসে সাহাবায়ে কেরাম আরও জিজ্ঞেস করলেন–এতে আমাদের জন্য কী সওয়াব আছে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন–‘কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে।’ সাহাবায়ে কেরাম আবার জিজ্ঞেস করলেন, পশমওয়ালা পশুর ক্ষেত্রে কী হবে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘পশমওয়ালা পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি করে নেকি।’ (ইবনে মাজাহ, ৩১২৭)
রক্তের প্রথম ফোঁটা পড়ার আগেই গুনাহ মাফ: হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত ফাতেমা (রা.)-কে বললেন–‘হে ফাতেমা! তুমি তোমার কোরবানির পশুর কাছে যাও। কেননা রক্তের প্রথম ফোঁটা মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমার যাবতীয় গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।’ হজরত ফাতেমা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! এটা কি কেবল আহলে বায়তের জন্য, নাকি সব মুসলমানের জন্য?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) দুইবার বললেন, ‘বরং এটা আমাদের জন্য এবং সব মুসলমানের জন্য।’ (মুসতাদরাকে হাকিম, ৭৫২৪)
প্রতিটি রক্তের ফোঁটার জন্য একটি নেকি: হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি রক্তের ফোঁটার জন্য একটি নেকি দেওয়া হয়।’ (বায়হাকি, ১৭৪৯৫)
পুলসিরাতের বাহন হবে কোরবানির পশু: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা মোটাতাজা পশু কোরবানি করো। কেননা এই পশু পুলসিরাতে তোমাদের বাহন হবে।’ (কানযুল উম্মাল, ১২১৭৭)
কোরবানি জাহান্নামের ঢাল হবে: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হাসিমুখে সওয়াবের আশায় কোরবানি করবে, তার জন্য সেই কোরবানি জাহান্নাম থেকে রক্ষার দেয়াল হয়ে যাবে।’ (তাবরানি, ২৭৩৬)
কোরবানির পশুর শিং, পশম ও ক্ষুর কিয়ামতে উপস্থিত হবে: উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘কোরবানির দিনের আমলগুলোর মধ্যে পশু কোরবানি করার চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় কোনো আমল নেই। কিয়ামতের দিন এই কোরবানিকে তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে। আর কোরবানির রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহতায়ালার কাছে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কোরবানি করো।’ (তিরমিজি, ১৪৯৩)
সামর্থ্য থাকলে কোরবানি না করা মহাঅপরাধ: হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘যার কোরবানির সামর্থ্য আছে, তবু সে কোরবানি করল না—সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (মুসনাদে আহমাদ, ৮২৭৩; ইবনে মাজাহ, ৩১২৩)
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক