কোরবানি হজরত আদম (আ.)-এর যুগ থেকে চলে এলেও ইসলামি শরিয়তে এর যে পদ্ধতি নির্দেশিত হয়েছে, তার মূল সূত্র মিল্লাতে ইবরাহিমিতে বিদ্যমান ছিল। এ কারণেই কোরবানিকে ‘সুন্নতে ইবরাহিমি’ বলা হয়। হজরত ইবরাহিম (আ.) দীর্ঘদিন ধরে সন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলেন। ধীরে ধীরে সন্তান জন্মের স্বাভাবিক বয়স পার হয়ে যাচ্ছিল। জীবনসন্ধ্যায় দাঁড়িয়েও তিনি আল্লাহর কাছে নেক সন্তান প্রার্থনা করলেন–‘হে আমার রব! আমাকে নেক সন্তান দান করুন।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত: ১০০)
যত দিন যাচ্ছিল, হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর হৃদয়ে সন্তানের আকাঙ্ক্ষা ততই তীব্র হচ্ছিল। অবশেষে আল্লাহতায়ালা তার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে একজন সহনশীল পুত্রসন্তান দান করলেন—যার নাম রাখা হলো ইসমাইল। তিনি বললেন, ‘সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাকে বৃদ্ধ বয়সে ইসমাইল ও ইসহাকে দান করেছেন। নিশ্চয় আমার রব দোয়া শ্রবণকারী।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৩৯)
হজরত ইবরাহিম (আ.) শামে বসবাস করতেন। একসময় আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এল—পুত্র ইসমাইল ও তার মা হাজেরাকে মক্কায় রেখে আসতে হবে। মক্কায় তখন জনবসতি ও জীবনোপকরণ কিছুই ছিল না। তবু আল্লাহর নির্দেশে তিনি তাদের সেই শূন্য মরুভূমিতে রেখে এলেন–এটাই ছিল তার অবিচল তাওয়াক্কুলের প্রমাণ।
ইসমাইল (আ.) ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে শুরু করলেন। তিনি যত বড় হচ্ছিলেন, তার প্রতি পিতার ভালোবাসা তত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। যখন তিনি ছোটাছুটি করার বয়সে উপনীত হলেন, তখন হজরত ইবরাহিম (আ.) এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হলেন। তিনি স্বপ্নে দেখলেন–একমাত্র কলিজার টুকরো পুত্রকে জবাই করছেন। এটা যদিও স্বপ্ন ছিল, কিন্তু নবিদের স্বপ্ন ওহির মতো। তাই এই স্বপ্নের অর্থ ছিল—আল্লাহর পক্ষ থেকে একমাত্র পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে জবাই করার আদেশ। ইসমাইল (আ.) ছিলেন তার দীর্ঘদিনের দোয়ার ফল, বার্ধক্যের একমাত্র আলো—কিন্তু হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে আল্লাহর আদেশ ছিল সবকিছুর ওপরে। তিনি পুত্রকে স্বপ্নের কথা জানালেন এবং তার অভিমত জানতে চাইলেন—‘হে আমার বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি তোমাকে জবাই করছি। তুমি চিন্তা করে দেখ, তোমার অভিমত কী।’
খলিলুল্লাহর পুত্র ইসমাইল (আ.) এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে উত্তর দিলেন—‘হে আমার পিতা! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে তা করে ফেলুন। আপনি আমাকে ইনশাআল্লাহ অবশ্যই ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।’ (সুরা সাফফাত, ১০২) যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন, তখন এল আসল পর্ব। হজরত ইবরাহিম (আ.) পুত্রকে জবাই করার জন্য কাত করে শোয়ালেন। তিনি পুত্রকে চিত না শুইয়ে কাত করে শোয়ালেন—সম্ভবত এই কারণে যে, ছুরি চালানোর সময় পুত্রের চেহারা যেন নজরে না পড়ে, পাছে পুত্রবাৎসল্যে মন টলে যায়। এ থেকে বোঝা যায়, তারা আল্লাহর আদেশ পালনে কতটা আন্তরিক ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।
পিতা-পুত্র উভয়ে তাদের এখতিয়ারের সবটুকু করে ফেলেছিলেন—তাই আল্লাহতায়ালার দৃষ্টিতে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়ে গেল। তারপর আল্লাহতায়ালা তার কুদরতের এক অপূর্ব নিদর্শন দেখালেন। তিনি নিজ কুদরতে সেখানে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দিলেন। হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে পুত্রের স্থলে সেটি জবাই করলেন। ইসমাইল (আ.) জীবিত ও নিরাপদ রইলেন।
আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এই অতুলনীয় মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন–‘অতঃপর যখন তারা উভয়ে আদেশ মান্য করল এবং পিতা পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিল–আর আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইবরাহিম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা ছিল স্পষ্ট পরীক্ষা এবং আমি এক মহান কোরবানির বিনিময়ে তাকে মুক্ত করলাম।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত: ১০৩-১০৭)
লেখক: আলেম ও গৃহিণী