কোরবানির দিনগুলোতে যে ব্যক্তি মুসাফির থাকবেন–অর্থাৎ ৭৮ কিলোমিটার বা তার বেশি দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছেন–তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। (ফাতাওয়া কাজিখান: ৩/৩৪৪; বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৯৫; আদ্দুররুল মুখতার: ৬/৩১৫)। তবে কোরবানির সময়ের শুরুতে মুসাফির থাকার পর তৃতীয় দিন সময় শেষ হওয়ার আগে মুকিম হয়ে গেলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে প্রথমে মুকিম ছিলেন, পরে তৃতীয় দিনে মুসাফির হয়ে গেলে–সে ক্ষেত্রে কোরবানি না করলে গোনাহ হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৯৬; ফাতাওয়া খানিয়া: ৩/৩৪৬; আদ্দুররুল মুখতার: ৬/৩১৯)
কোরবানির সময়সীমা: জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত মোট তিন দিন কোরবানির সময়। সবচেয়ে উত্তম হলো প্রথম দিন কোরবানি করা। এর পর দ্বিতীয় দিন, তার পর তৃতীয় দিন। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৯৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/২৯৫)
হজরত বারা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন– إِنَّ أَوَّلَ مَا نَبْدَأُ بِهِ فِي يَوْمِنَا هَذَا أَنْ نُصَلِّيَ ثُمَّ نَرْجِعَ فَنَنْحَرَ، فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ فَقَدْ أَصَابَ سُنَّتَنَا، وَمَنْ ذَبَحَ قَبْلَ فَإِنَّمَا هُوَ لَحْمٌ قَدَّمَهُ لِأَهْلِهِ لَيْسَ مِنَ النُّسُكِ فِي شَيْءٍ
আমাদের এই দিনে প্রথম কাজ হলো নামাজ আদায় করা, এর পর কোরবানি করা। যে এভাবে করবে তার কাজ আমাদের তরিকা অনুযায়ী হবে। আর যে ব্যক্তি নামাজের আগেই জবাই করে নিল, তা তো তার জন্য এমন গোশত হলো–যা সে তার পরিবারের জন্য তাড়াতাড়ি প্রস্তুত করে নিল; কোরবানির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।’ (বুখারি, হাদিস: ৯৬৮; মুসলিম, হাদিস: ১৯৬১; সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৯০৭)
আরা পড়ুন: ৩ দিনের মধ্যে কুরবানি করতে না পারলে কী করবেন?
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও এরশাদ করেছেন–مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ الصَّلَاةِ فَإِنَّمَا يَذْبَحُ لِنَفْسِهِ، وَمَنْ ذَبَحَ بَعْدَ الصَّلَاةِ فَقَدْ تَمَّ نُسُكُهُ وَأَصَابَ سُنَّةَ الْمُسْلِمِينَ
‘যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে পশু জবাই করবে সেটা তার নিজের জন্য সাধারণ জবাই হবে। আর যে নামাজ ও খুতবার পর জবাই করবে–তার কোরবানি পূর্ণ হবে এবং সে মুসলমানদের রীতি অনুসরণ করেছে।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৫৪৬; মুসলিম, হাদিস: ১৯৬২)
এই হাদিস দুটি থেকে স্পষ্ট–ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করলে তা কোরবানি হিসেবে গণ্য হবে না। তাই যারা ঈদের নামাজের আগেই তাড়াহুড়ো করে পশু জবাই করেন–তাদের জন্য এই হাদিসটি গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। যেসব এলাকার মানুষের ওপর জুমা ও ঈদের নামাজ ওয়াজিব, তাদের জন্য ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করা জায়েজ নয়। তবে বৃষ্টি বা অন্য কোনো ওজরে প্রথম দিন ঈদের নামাজ না হলে–ঈদের নামাজ আদায়ের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেও কোরবানি করা জায়েজ। (বুখারি: ২/৮৩২; কাজিখান: ৩/৩৪৪; আদ্দুররুল মুখতার: ৬/৩১৮)
রাতে কোরবানির বিধান: ১০ ও ১১ জিলহজ দিবাগত রাতেও কোরবানি করা জায়েজ। তবে দিনে কোরবানি করাই উত্তম। (মাজমাউয যাওয়াইদ: ৪/২২; আদ্দুররুল মুখতার: ৬/৩২০)
আরো পড়ুন: হাজিদের জন্য যে ভুলগুলো হতে পারে মারাত্মক
সময়মতো কোরবানি দিতে না পারলে করণীয়: কেউ যদি কোরবানির তিন দিনের মধ্যে ওয়াজিব কোরবানি দিতে না পারেন–পশু কেনা না থাকলে–ন্যূনতম কোরবানির উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। পশু কেনা ছিল কিন্তু কোনো কারণে কোরবানি দেওয়া হয়নি–তা হলে সেই পশু জীবিত সদকা করে দিতে হবে। যদি সময়ের পরে জবাই করে ফেলেন–তা হলে পুরো গোশত সদকা করে দিতে হবে। আর গোশতের মূল্য যদি জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায়, তা হলে যে পরিমাণ মূল্য কমল– তা-ও সদকা করতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০২-২০৪; আদ্দুররুল মুখতার: ৬/৩২০-৩২১)
কোরবানির প্রতিটি বিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। এই বিধানগুলো মেনে, সঠিক নিয়মে, খাঁটি নিয়তে কোরবানি করাই একজন মুমিনের কর্তব্য। কারণ আল্লাহর কাছে গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না–পৌঁছায় কেবল তাকওয়া।
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক