গাছ পৃথিবীর ফুসফুস–এই উপমাটি কেবল কাব্যিক নয়, বৈজ্ঞানিকভাবেও সত্য। একটি পরিণত গাছ প্রতিদিন গড়ে ১০০ গ্যালন পানি বাষ্পীভূত করে পরিবেশকে শীতল রাখে এবং বার্ষিক প্রায় ৪৮ পাউন্ড কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যানুযায়ী, বন ও বৃক্ষরাজি বায়ুমণ্ডলের প্রায় ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রতি বছর শোষণ করে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে অপরিসীম ভূমিকা রাখছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, গাছ মাটির ক্ষয় রোধ করে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধার করে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গাছ লাগানো আরও জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন ইতোমধ্যে সংকুচিত হচ্ছে, উপকূলীয় এলাকা ডুবে যাচ্ছে। বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, টেকসই বনায়নে প্রতি বছর অন্তত ১ কোটি গাছ লাগানো প্রয়োজন।
ইসলাম শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের ধর্ম নয়, এটি জীবনের প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণ করে—পরিবেশ রক্ষাও তার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহতায়ালা কোরআনে বারবার প্রকৃতি ও সবুজ ভূমির কথা তুলে ধরেছেন। এরশাদ হয়েছে, আমি আকাশ থেকে পবিত্র পানি বর্ষণ করি, তা দিয়ে বাগান ও শস্যক্ষেত্র সৃষ্টি করি। (সুরা কাফ: ৯)
আরেকটি আয়াতে আল্লাহ পৃথিবীকে সবুজ রাখার প্রতি মানুষের দায়িত্বের ইঙ্গিত দিয়ে এরশাদ হয়েছে, তিনিই তোমাদের ভূমি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের সেখানে আবাদকারী করেছেন। (সুরা হুদ: ৬১)। এই আয়াতে ‘আবাদকারী’ শব্দটি ইঙ্গিত করে যে, মানুষের দায়িত্ব হলো পৃথিবীকে সবুজ ও সজীব রাখা, ধ্বংস করা নয়। সুরা আনআমের ৯৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এরশাদ করেছেন, তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, তারপর আমি তা দিয়ে সব ধরনের উদ্ভিদ উৎপন্ন করি। এই আয়াতগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, সবুজ প্রকৃতি আল্লাহর নেয়ামত এবং এই নেয়ামত রক্ষা করা মুমিনের কর্তব্য।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবেশ সুরক্ষায় গাছ লাগানোকে শুধু ভালো কাজ হিসেবে নয়, বরং সদকায়ে জারিয়া তথা চলমান পুণ্যের কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও তোমাদের কারও হাতে একটি চারাগাছ থাকে এবং সে যদি তা লাগানোর সুযোগ পায়, তাহলে সে যেন তা লাগিয়ে দেয়। (মুসনাদে আহমাদ: ১২৯০২) এই হাদিসটি পরিবেশ সচেতনতার চূড়ান্ত উদাহরণ। কিয়ামতের মতো ভয়াবহ মুহূর্তেও গাছ লাগানো ছেড়ে না দেওয়ার এই নির্দেশ প্রমাণ করে, ইসলামে বৃক্ষরোপণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
আরেকটি বিখ্যাত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে মুসলমান একটি গাছ লাগায় বা ফসল বোনে এবং তা থেকে পাখি, মানুষ বা পশু কিছু খায়, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়। (বুখারি: ২৩২০; মুসলিম: ১৫৫৩)। এই হাদিসে পাখির কথা উল্লেখ করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ইঙ্গিত করে যে, ইসলাম শুধু মানুষের কল্যাণ নয়, পশু-পাখিসহ সমগ্র জীবজগতের কল্যাণ চায়।
আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানও বলছে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা না করলে পরিবেশ টিকবে না–ইসলাম এই সত্য ১৪০০ বছর আগেই প্রতিষ্ঠা করে গেছে। ইসলাম কেবল গাছ লাগাতে বলেনি, গাছ কাটা ও পরিবেশ নষ্ট করাকে নিষিদ্ধও করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধের সময়েও গাছ কাটা নিষিদ্ধ করে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ফলদার গাছ কেটো না, ঘরবাড়ি ধ্বংস করো না। (আবু দাউদ: ২৬১৩)
এই নির্দেশ থেকে স্পষ্ট যে, ইসলামি রাষ্ট্রনীতিতেও পরিবেশ রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আল্লাহতায়ালা কোরআনে পরিবেশ ধ্বংসকারীদের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, ‘যখন সে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, তখন সে পৃথিবীতে অনাচার করতে এবং ফসল ও জীবজন্তু ধ্বংস করতে সচেষ্ট হয়। আর আল্লাহ অনাচার পছন্দ করেন না।’ (সুরা বাকারা: ২০৫)। এই আয়াত বনভূমি ধ্বংস, নদী দূষণ ও পরিবেশ বিপর্যয়কারী সব কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ইসলামের স্পষ্ট অবস্থান।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘হিমা’ নামক একটি পরিবেশ সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, যেখানে নির্দিষ্ট এলাকার গাছ কাটা ও শিকার করা নিষিদ্ধ ছিল। মদিনার কাছে ‘নাকি’ নামক এলাকাকে তিনি সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণা করেন। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম প্রাচীন সংরক্ষিত বনের উদাহরণ। আধুনিক জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বনের ধারণার সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ–ইসলাম যা বলেছিল আজকের বিজ্ঞান তাই সমর্থন করছে।
বিজ্ঞান ও ইসলাম উভয়ই একটি কথা বলছে–গাছ লাগাও, পৃথিবী বাঁচাও। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে এই দুটি শক্তিশালী কারণকে সামনে রেখে আমাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া উচিত। প্রতিটি পরিবার যদি বছরে একটি করেও গাছ লাগায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর কোটির বেশি গাছ হবে। মসজিদের সামনে, বিদ্যালয়ের মাঠে, রাস্তার ধারে, বাড়ির আঙিনায়–প্রতিটি ফাঁকা জায়গা হতে পারে সবুজের আশ্রয়। বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের প্রতি বছর মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী সুস্থ না থাকলে আমরাও টিকব না।
বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে গাছ কার্বন শোষণ করে, বায়ু শুদ্ধ রাখে, বৃষ্টি নামায়, মাটি ধরে রাখে। আর ইসলাম বলেছে, গাছ লাগানো সদকা, পরিবেশ রক্ষা ইবাদত এবং প্রকৃতি ধ্বংস করা মহাপাপ। তাই এই দিনে কেবল সেমিনার ও বক্তৃতায় নয়, একটি চারাগাছ হাতে নিয়ে মাটিতে পুঁতে দেওয়াই হোক আমাদের শ্রেষ্ঠ প্রতিশ্রুতি। কারণ, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামত সামনে থাকলেও গাছ লাগানো ছাড়া যাবে না—তাহলে এই পৃথিবীকে বাঁচাতে আমরা কেন পিছিয়ে থাকব?
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক