সাল ২০৩০। বাংলাদেশ এখন আল্ট্রা-প্রো-ম্যাক্স স্মার্ট একটি দেশ। রাত ৩টা। ফ্রিল্যান্সার আয়ান ল্যাপটপে কাজ করতে করতে পেটে মোচড় অনুভব করলেন। ছোটবেলার কথা স্মরণ করে হাজির বিরিয়ানির হোয়াটসঅ্যাপে নক করলেন।
— হ্যালো, এক প্লেট বিরিয়ানি হবে? মাটন যেন তুলতুলে হয় আর সঙ্গে এক্সট্রা আলু। লোকেশন পিনড, ঝটপট পাঠান।
— কেকেআর এআই ফুড সলিউশনে আপনাকে স্বাগতম, স্যার।
— ও সরি। আমি হয়তো ভুল জায়গায় নক করে ফেলেছি। খুবই দুঃখিত।
— সরি বলার কোনো কারণ নেই স্যার। আপনি ঠিক জায়গাতেই নক করেছেন। আমাদের কেকেআর এআই ফুড গত মাসে হাজির বিরিয়ানি কোম্পানিটি কিনে নিয়েছে। আমি সেখানকার এআই মডেল ‘চাটনি-৩.০’ বলছি।
— ও, আচ্ছা।
— আপনি কি সেই বিরিয়ানিটাই কনফার্ম করতে চাচ্ছেন যেটা আপনি গত পাঁচবার অর্ডার করেছিলেন? ‘মাটন ওভারলোড উইথ স্মোকি ফ্লেভার’?
— আরে হ্যাঁ, ভাই। ওটাই। তাড়াতাড়ি পাঠাও।
— দুঃখিত স্যার। প্রথমত আমি কারও ভাই নই। দ্বিতীয়ত আপনার অর্ডারটি প্রসেস করা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের ‘স্মার্ট হেলথ মনিটরিং সিস্টেম’ দেখাচ্ছে আপনার জন্য এই খাবারটি বর্তমানে রেড লিস্টে আছে। আমি কি এর পরিবর্তে ‘তেল ছাড়া করলা ভাজি ও লাল চালের ভাত’ অর্ডার করে দেব?
— মানে কী? আমার টাকা, আমি বিরিয়ানি খাব না বিষ খাব সেটা আমার ব্যাপার। তুমি জ্ঞান দিচ্ছ কেন?
— দুঃখিত স্যার। উত্তেজিত হবেন না। আপনার হাতের স্মার্টওয়াচ জানাচ্ছে আপনার হার্টবিট এখন মিনিটে ১০৫। তাছাড়া আজ সকালে ‘স্মার্ট কমোড’ আপনার বর্জ্য পরীক্ষা করে আপডেট দিয়েছে যে, আপনার লিভারের অবস্থা শোচনীয়। এই অবস্থায় বিরিয়ানি খাওয়া আর সুইসাইড করা একই কথা।
— ফাজিল রোবট। আমার লিভার নিয়ে তোকে কে ভাবতে বলেছে? আমি কোলেস্টেরলের দামি ওষুধ খাই। কোনো সমস্যা হবে না। বিরিয়ানি পাঠিয়ে দে।
— স্যার, আপনার ক্রেডিট কার্ডের ট্রানজ্যাকশন হিস্ট্রি চেক করলাম। আপনি সর্বশেষ কোলেস্টেরলের ওষুধ কিনেছিলেন তিন মাস আগে, তাও ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান’ অফারে। এরপর আর কোনো ফার্মেসিতে আপনার কার্ড পাঞ্চ হয়নি।
— আরে আমি অন্য ফার্মেসি থেকে হ্যান্ড ক্যাশ দিয়ে ওষুধ কিনেছি। সব কি কার্ডেই কিনতে হবে নাকি?
— আবারও ভুল তথ্য স্যার। গত এক মাসে আপনার বা আপনার স্ত্রীর অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো চেক বা এটিএমের মাধ্যমে নগদ টাকা উত্তোলনের রেকর্ড নেই। এমনকি আপনার বিকাশ-নগদেও কোনো ক্যাশআউট হয়নি। তাহলে আপনার হাতে টাকা এল কোথা থেকে?
— আরে, আমার কাছে আগে থেকেই কিছু টাকা জমানো ছিল। চালের ড্রামের ভেতর লুকিয়ে রাখা টাকা!
— ইন্টারেস্টিং! আপনার গত বছরের আয়কর রিটার্নে তো ‘চালের ড্রামে গচ্ছিত’ কোনো অর্থের উল্লেখ নেই। অর্থাৎ আপনি আয়ের উৎস গোপন করেছেন। স্যার, আয়কর আইন-২০৩০ এর ধারা ৪২০(খ) অনুযায়ী এটি অপরাধ। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট উপ-কর কমিশনারকে জানানো হবে।
— (ভয় পেয়ে) এই না না। পাগল নাকি? ধুর ছাই, তোমাদের থেকে কিচ্ছু অর্ডার করব না। আমি চান খাঁ-এর বিরিয়ানি থেকে অর্ডার করছি। রাখো তো।
— স্যার, আপনার সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি, গত সপ্তাহে চান খাঁ, নানা-নাতি এবং ফখরুদ্দিন- বিরিয়ানি শপ আমাদের কেকেআর এআই গ্রুপ কিনে নিয়েছে। ওখানকার মেনুতেও আপনার হেলথ আইডি লক করা। আপনি যেখানেই নক করবেন, শুধু করলা ভাজির অপশনই ভেসে উঠবে।
— অসহ্য। খাবই না। আমি বাসায় ওয়াইফকে বলব রান্না করতে।
— দুঃখিত, স্যার। আপনার স্ট্যাটাস এবং চ্যাট অ্যানালাইসিস করে দেখা যাচ্ছে, ম্যাডামের সঙ্গে আপনার দুদিন ধরে ঝগড়া চলছে। তিনি বর্তমানে বাবার বাড়িতে আছেন এবং তার মুড স্ট্যাটাস ‘অ্যাংগ্রি’। এই মুহূর্তে তাকে রান্নার কথা বললে বিরিয়ানির বদলে ঝাড়ু জুটতে পারে।
— উফ! আমি এই দেশেই থাকব না। এই অত্যাচার আর সহ্য হচ্ছে না। আমি অ্যামাজনের জঙ্গলে চলে যাব, যেখানে ইন্টারনেট নেই। সেখানে গিয়ে আমি শান্তিতে বিরিয়ানি রান্না করে খাব।
— চমৎকার পরিকল্পনা, স্যার। কিন্তু ছোট্ট একটা সমস্যা আছে।
— আবার কী সমস্যা?
— ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর বলছে, আপনার পাসপোর্টের মেয়াদ দুই মাস আগে শেষ হয়ে গেছে। ওই দ্বীপে যেতে হলে তো আগে দেশ ত্যাগ করতে হবে।
— ঠিক আছে, আমি কালই পাসপোর্ট রিনিউ করতে দেব।
— আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, স্যার। আমার পরামর্শ হবে, আজই আবেদনটা করে ফেলুন। কারণ, আগামী দুদিন শুক্র ও শনিবার। ফলে আপনাকে রবিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ততদিন না খেয়ে থাকলে আপনার অ্যাসিডিটি হয়ে যাবে।
— (কেঁদে ফেলে) আমি আর বিরিয়ানি চাই না। দয়া করে আমাকে কিছু একটা খেতে দাও।
— এই তো, লক্ষ্মী স্যারের মতো কথা। যাই হোক, আপনার প্রতি সমবেদনাস্বরূপ করলার পরিবর্তে জন্য ‘লবণ ছাড়া পাতলা খিচুড়ি’ কনফার্ম করছি। সঙ্গে কি এক গ্লাস চিরতার পানি পাঠাব? আপনার স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ভালো।
— যা ইচ্ছা পাঠা... শুধু আমাকে এই দোজখ থেকে মুক্তি দে।
— ধন্যবাদ স্যার। পেমেন্টটি আপনার ব্যাংক ডিপোজিট থেকে কেটে নেওয়া হলো। ড্রোন ১০ মিনিটের মধ্যে আপনার জানালার গ্রিল ভেঙে ঘরের ভেতরে খাবার পৌঁছে দেবে। কেকেআর এআইয়ের সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ। শুভ রাত্রি।