পনেরো বছরের দাম্পত্য জীবনে মকবুল সাহেব এক গ্লাস পানিও নিজে ঢেলে খেয়েছেন বলে কোনো নির্ভরযোগ্য ইতিহাস নেই। অথচ আজ ছুটির দিনের সকালে তিনি ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ নিয়ে অতি সন্তর্পণে শোবার ঘরে প্রবেশ করলেন।
বিছানায় আধশোয়া স্ত্রী রেহানা চমকে উঠলেন। চোখ কচলে ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘ঘটনা কী? সূর্য কি আজ ভুল করে পশ্চিমে উঠল নাকি?’
মকবুল সাহেব বিগলিত হাসি দিয়ে বললেন, ‘আহা, সবকিছুর মধ্যে এত প্রশ্ন কেন? ভাবলাম, সারা দিন তো সংসারের জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি করো। আজ না হয় একটু সেবা করলাম। নাও, আদা-চা, তোমার মাথাব্যথার মহৌষধ।’
রেহানা সন্দিগ্ধ চোখে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। বিছানার পাশে পড়ে থাকা খবরের কাগজের একটি শিরোনাম তার নজরে পড়ল— নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড: ১০ তারিখে উদ্বোধন।
মকবুল সাহেব এবার খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে রহস্যময় ভঙ্গিতে গলা নামিয়ে বললেন, ‘দেখো রেহানা, সরকার এবার খুব কড়া। মেম্বার-চেয়ারম্যানের কোনো হাত নেই। টাকা সরাসরি তোমার মোবাইলে আসবে। তবে একটা বিশেষ কারিগরি ব্যাপার আছে। যাদের সংসারে স্বামী-স্ত্রীর বনিবনা যত ভালো, তাদের মোবাইলের নেটওয়ার্ক নাকি টাকাটা তত দ্রুত ক্যাচ করবে।’
রেহানা হাসবেন না কাঁদবেন বুঝতে না পেরে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
দুপুরে মকবুল সাহেবের তৎপরতা আরও বাড়ল। রেহানা বটিতে লাউ কাটছেন, গরমে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। হঠাৎ দেখলেন মকবুল সাহেব পাশে এসে হাতপাখা দিয়ে পরম মমতায় বাতাস করতে শুরু করেছেন।
‘আজকের লাউটা বেশ কচি মনে হচ্ছে, তাই না রেহানা?’ মকবুল সাহেবের কণ্ঠে যেন আজ মধু ঝরছে।
রেহানা শান্ত গলায় বললেন, ‘বাতাস করছ ভালো কথা, কিন্তু মতলবটা কী বলো তো? টাকা কিন্তু আমার নামেই আসবে।’
মকবুল সাহেব জিভ কাটলেন। ‘ছি ছি! তুমি আমাকে অতটা লোভী ভাবো? আমি ভাবছিলাম টাকাটা যখন আসবে, তখন একটা ফ্যামিলি প্ল্যানিং দরকার। ধরো, আমার বাইকটা একটু মেরামত করলাম, আর বাকিটা দিয়ে একদিন সবাই মিলে চাইনিজ খেলাম।’
রেহানা বটির কোপটা এবার একটু জোরে দিয়ে বললেন, ‘টাকা আসুক আগে। আমি ঠিক করেছি, মেয়ের নামে একটা ডিপিএস খুলব।’
মকবুল সাহেবের বাতাসের গতি এক নিমেষে কমে গেল। তবুও তিনি হাল ছাড়লেন না। ডিজিটাল ফান্ডের আশা এত সহজে বিসর্জন দেওয়া যায় না।
সন্ধ্যায় লোডশেডিং শুরু হতেই অন্যদিনের মতো মেজাজ খারাপ না করে মকবুল সাহেব নিজেই মশার কয়েল জ্বালিয়ে আনলেন।
এরপর গলা খাঁকরে বললেন, ‘আচ্ছা রেহানা, ১০ তারিখ তো এসেই গেল। তোমার ওই বাটন ফোনটার তো ডিসপ্লে ছোট। কত টাকা এল, সেটা হয়তো ঠিকমতো দেখতেই পাবে না। তার চেয়ে স্মার্টফোনটায় তোমার সিমটা ভরে রাখলে ভালো হতো। ওটা ডিজিটাল ফোন তো, টাকা আসার শব্দও জোরে হবে।’
রেহানা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন, ‘দরকার নেই।’
মকবুল সাহেব এবার শেষ চাল চাললেন। ‘আচ্ছা সিম বদলাতে হবে না। কিন্তু পিন নম্বরটা মনে আছে? নাকি ভুলে গেছ? আমাকে বলে রাখো, আমি ডায়েরিতে লিখে রাখি। বিপদের সময় কাজে দেবে।’
রেহানার সোজাসাপ্টা জবাব, ‘পিন নম্বর আমার মুখস্থ আছে। ওটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি এখন খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ো, সকালে অফিস আছে।’
রাতে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মকবুল সাহেব। মনে মনে ভাবলেন, সরকার নারীর ক্ষমতায়ন করতে গিয়ে তার মতো স্বামীদের তো রীতিমতো ‘গৃহভৃত্য’ বানিয়ে ছাড়ল।
তবুও নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন—যাই হোক, মাস শেষে আড়াই হাজার টাকা তো আসবে। নগদ না হোক, একটু চা-পানি তো অন্তত কপালে জুটবে।