বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ। তিনি বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক অধ্যাপক। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন খবরের কাগজ-কে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সিনিয়র সহসম্পাদক সানজিদ সকাল।
৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে? কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কার আনা সম্ভব বলে মনে করেন?
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়, তাদের পেছনের দিকে খেয়াল করলে দেখা যায়, তারা অত্যন্ত মেধাবী। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা পড়তে আসে। অথচ, তাদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা খুবই শোচনীয়। সব কিছুই এখন নতুনভাবে চিন্তা করা হচ্ছে। সব শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা এখন মেধার ভিত্তিতে হবে। ছাত্রছাত্রীরা গাদাগাদি করে হলের কক্ষে থাকবে, আর সেই ছাত্রদের ছাত্রনেতারা রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করবে, তা হবে না। এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মেধার ভিত্তিতে যাতে সঠিকভাবে আবাসনের ব্যবস্থা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। যারা আবাসিক হলে সিট পাচ্ছে না, তাদের ব্যাপারে কী করা যায়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ তারা দেশের দূর-দূরান্ত থেকে পড়তে আসে। তাদের থাকার মতো তেমন জায়গা নেই। তারা যদি সুযোগসুবিধা না পায়, তাহলে তারা কীভাবে লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করবে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সুবিধা খুবই সীমিত। এসব খাতে সংস্কার করা দরকার বলে কি আপনি মনে করেন?
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসেবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বেশির ভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো স্বাস্থ্যসেবা নেই। সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। ক্লাসরুম ও লাইব্রেরিতে সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য এসব ব্যবস্থা করতে পারলে আশা করি শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। শিক্ষাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, এখন যারা শিক্ষা গ্রহণ করছে, এরাই একসময় দেশ চালাবে।
শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে সম্পর্কের যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে তা কীভাবে পূরণ করা যায় বলে আপনি মনে করেন?
শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে সম্পর্কের যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে তা অচিরেই কেটে যাবে। ভবিষ্যতে এগুলো থাকবে না বলে আমি বিশ্বাস করি। ছাত্রদের সন্তানের মতো করে দেখেই আমাদের কাজ করতে হবে। ‘we can consider them as a serious scholar. The students are very meritorious. In this particular day, we have to see them as younger scholar’। শিক্ষক এবং ছাত্রদের এক বেঞ্চে বসতে হবে। এতে তাদের মধ্যে এক ধরনের যোগাযোগ স্থাপন হবে। এর সঙ্গে সমাজের সমস্যাগুলো দূর করার চেষ্টা করতে হবে। জ্ঞান সষ্টির লক্ষ্যে আমাদের একসঙ্গে বসে কাজ করতে হবে।
বিগত সরকার পতনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা এক এক করে পদত্যাগ করায় প্রশাসনব্যবস্থা একদম ভেঙে পড়েছে। কেমন শিক্ষক উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়া উচিত বলে মনে করেন? শিক্ষায় সংস্কার কীভাবে সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার অবশ্যই করতে হবে। তার মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যলয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারকে অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। উপাচার্যরা তাদের লবি ব্যবহার করছেন। তারা তাদের মোহকে কাজে লাগিয়ে যাচ্ছেন, এমন শিক্ষকরা কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হতে পারেন না। যে শিক্ষকের আত্মসম্মান আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মান রয়েছে, তার চেয়ারের প্রতি সম্মান আছে এমন ব্যক্তিকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যায়। বিশ্বায়নের এই যুগে আমাদের পেছনে পড়ে থাকার সুযোগ নেই। শিক্ষায় সিলেবাসে পিছিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের শিক্ষার সিলেবাস একদম আপ টু ডেট। আমাদের ছাত্ররা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পড়াশোনা করতে যাচ্ছে, বিধায় আমাদের সিলেবাসে পিছিয়ে পড়ার কোনো সুযোগ নেই এবং আধুনিকায়ন করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণায় অনেক পিছিয়ে পড়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে গবেষণা কাজে কীভাবে অর্থায়ন করা যায় এবং শিক্ষার্থীদের কীভাবে গবেষণা কাজে উদ্বুদ্ধ করা যায় বলে আপনি মনে করেন?
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচুর গবেষণা দরকার। কারণ গবেষক তৈরি না হলে দেশ চলবে কীভাবে? আমাদের দেশে প্রকাশনা এতই সীমিত যে, আন্তর্জাতিক মানে যেতে পারছি না। গবেষণার কাজগুলো অনেক ব্যয়বহুল। গবেষণার কাজে যেসব যন্ত্রপাতি লাগে, তা অনেক ব্যয়বহুল। আমাদের দেশে গবেষণার যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সব কিছুর অভাব রয়েছে। দেশে শিক্ষা ও গবেষণা খাতে অর্থায়ন কম। সবার আগে এগুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে। যারা পাবলিশার, তারাই জানেন কত কষ্টে তারা পাবলিকেশন করছেন। আমরা পাবলিকেশনে অনেক পিছিয়ে আছি। বিদেশের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অনেক সহযোগিতার মধ্যদিয়ে এগিয়ে যান। আমাদের মধ্যে সেই সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে, যেন আমরা সেই যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সুবিধা পাই। সরকারের অনুদান অনেক বাড়াতে হবে। শিক্ষা খাতে যে বাজেট আছে, আমি মনে করি সেখানে আরও বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। বহির্বিশ্বও আমাদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক, সউথ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, আইএমএফ, ইউনেস্কো আমাদের দেশের বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এগিয়ে এসেছে। আমরাও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছি। এভাবে আমরা অনেক সংস্কার করতে পারব।
বাংলাদেশের ছাত্ররা অনেক মেধাবী। ছাত্ররাই এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে সবচাইতে মেধাবী তাকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে বেছে নিতে হবে। যদি কেউ মেধার প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে অন্য কিছুর প্রতি আগ্রহ দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ করে, সেটা জাতির জন্য বড় দুঃখজনক। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দল-মতের ঊর্ধ্বে যদি কেউ না উঠতে পারে, তা হবে আরও ক্ষতিকর। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই আরও সচেতন হতে হবে এবং যোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষায় মনোনিবেশ না করে দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়েছে। এতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?
বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে দেশে যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তারা তাদের পছন্দের লোককে নিয়োগ দিয়ে থাকে। এটা স্বাভাবিক। পৃথিবীর সব দেশেই এমন হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি যদি দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে না পারেন, তাহলে তিনি যোগ্য উপাচার্য নন। শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে। কিন্তু যখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবেন, তার কর্মকাণ্ড, আচরণ, শিক্ষাদান পদ্ধতি, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যদি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায়, তাহলে তিনি প্রকৃত শিক্ষক হতে পারেননি। শিক্ষক হতে হলে তাকে অবশ্যই দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। একজন ছাত্রকে পুরোপুরি ছাত্র হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষককেও প্রকৃতপক্ষে শিক্ষক হিসেবেই থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শিক্ষক, ছাত্র, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে যার যার জায়গা থেকে তার মতো করে দেখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির ওপর সবকিছু নির্ভর করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি থেকে শুরু করে কর্মচারী পর্যন্ত সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশের শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক মানের হচ্ছে না, এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন? আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা অর্জন করতে আমাদের কী করণীয়?
বাংলাদেশের শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক মানের না হওয়ার মূল কারণ গবেষণা না হওয়া। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা বাইরে গিয়ে অনেক প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে। আমাদের দেশের শিক্ষকরা স্কলারশিপ নিয়ে দেশের বাইরে যাচ্ছে। সেই সব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার অফার করা হয় আমাদের ছেলেমেয়েদের। এখানে কিন্তু আমাদের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ও শিক্ষক প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে। আমাদের সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে ছাত্র ও শিক্ষকরা সে সুবিধা পায়। ভারতে আমরা দেখতে পাই, তারা তথ্য ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
৫ আগস্ট সরকার পতনের পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসছে না। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায় বলে আপনি মনে করেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে, তা দৃশ্যমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা বেশি পরিমাণে দলীয় হয়ে পড়েছিলেন। সরকার পতনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা পদত্যাগ করায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যদের শূন্যতা পূরণের জন্য বেশ বেগ পেতে হয়েছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার মতো যোগ্য লোক দেশে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার পরও ধীরে ধীরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ করা হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, কিছুদিনের মধ্যেই স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে।
খবরের কাগজের সঙ্গে থাকার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
খবরের কাগজকেও অনেক ধন্যবাদ।