জুলাই-আগস্টের শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থান একটা সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে সত্যি। বাংলাদেশে দেড় দশক ক্ষমতায় থাকা একটি গভীর দুর্নীতিগ্রস্ত ও নিপীড়ক শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করেছে এ গণ-অভ্যুত্থান। একালে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা তীব্রভাবে প্রকাশিত হয়েছে, স্বৈরাচার ও বৈষম্যমুক্ত সমাজের জন্য শক্তিশালী জনমত তৈরি হয়েছে। এমনকি দেয়ালে আঁকা চিত্রগুলোও এমন পরিণত বার্তাই প্রকাশ করে। দেয়ালগুলো ঘোষণা করে মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধনির্বিশেষে সব বাংলাদেশির সমানাধিকার থাকা উচিত। এগুলোর স্পষ্ট বক্তব্য এটাই যে, ধর্ম পরিচয় দিয়ে কোনো বিভেদ সৃষ্টি গ্রহণযোগ্য নয়। বাঙালি ছাড়াও আরও বহু জাতির দেশ এ বাংলাদেশ, জাতিগত বৈষম্য তাই চলবে না। দেয়ালচিত্রে তরুণরা লিঙ্গসমতা ও একটি ন্যায়সঙ্গত বাংলাদেশ দাবি করে। এসব বিষয়ও দেয়ালে এসেছে। প্রকৃতপক্ষে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে গেলে বৈষম্যের উৎস নির্মূলের প্রশ্ন আসে। এর জন্য রাজনীতি মতাদর্শও স্পষ্ট করা দরকার হয়।
ক্ষমতায় উঠে আসা ব্যক্তিরা রাজপথে দেয়ালে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত বৈষম্যের অবসানের দাবিগুলো সমান স্পষ্টতার সঙ্গে যে ধারণ করেননি তারই প্রকাশ ঘটছে বারবার। শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। স্বৈরাচারী শাসন দূর হলেও এখনো দেশজুড়ে মব সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি অব্যাহত আছে। জাতীয় স্বার্থবিরোধী বিভিন্ন চুক্তি ও প্রকল্প বহাল আছে। সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষী প্রচারণা ভয়ংকর আকার নিচ্ছে। সরকারের নিষ্ক্রিয়তা কিংবা পরোক্ষ সমর্থনের অভিযোগও আছে।
সে কারণেই অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে সরকার পরিচালনা করছে তাতে আমরা গত সরকারের ছায়া দেখতে পাচ্ছি। সেই একই রকম স্বৈরতন্ত্র, জনগণের ওপর একই রকম নিপীড়ন এবং একই রকম বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হয়েছে। মব সন্ত্রাস করে মানুষের বাড়িঘর ভাঙা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা করা এবং কিছু লোকের ভাড়াটে হিসেবে মব সন্ত্রাস কাজ করছে। মব তৈরি করা হচ্ছে কাউকে বসানোর জন্য, আবার কাউকে ওঠানোর জন্য। এই যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তাতে সরকারকে আমরা দায়ী করতাম না, যদি আমরা দেখতাম, সরকার এগুলো থামানোর জন্য উদ্যোগ নিচ্ছে। আমরা বরং দেখতে পাচ্ছি, সরকারের মধ্যে কেউ কেউ এই মব সন্ত্রাসকে যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ থেকে স্বৈরশাসন, দুর্নীতি, গুম-খুন-নির্যাতন, উন্নয়নের নামে প্রাণবিনাশী প্রকল্প গ্রহণের বিরুদ্ধে একের পর এক আন্দোলনের মধ্যদিয়ে প্রতিরোধের চেতনা এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রত্যাশা ঘনীভূত হয়েছে। ২০১৪ সালের পর থেকে অনির্বাচিত সরকারের জোর-জবরদস্তি, অবৈধ ক্ষমতা আর অদৃষ্টপূর্ব মাত্রায় লুণ্ঠন, অত্যাচার অব্যাহত রাখতে পারায় শাসকদের মধ্যে তৈরি হয় সীমাহীন ঔদ্ধত্য। এ ঔদ্ধত্যই গত বছরের ১৫ জুলাই থেকে নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের অবস্থা তৈরি করে। আর এ হতাহতের নৃশংসতায় বহু বছরে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয় এবং তৈরি হয় চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান। এ গণ-অভ্যুত্থান সফল হয়েছে সব স্তরের মানুষের অদম্য ভূমিকার কারণে। এখানে অংশ নিয়েছেন সব ধর্ম, মত, লিঙ্গ, পেশা, বিশ্বাসের মানুষ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক, নিরাশ্রয়, তরুণ, শিশু, বৃদ্ধ। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন এ দেশের প্রান্তিক, দরিদ্র ও বঞ্চিত জনগণ থেকে আগত। কারণ কোটা আন্দোলন তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সন্তানের নিশ্চিত কর্মসংস্থানের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল সেখানে। গুলিতে রক্তাক্ত হতে হতে পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে যে দাবি সামনে এসেছে তা হলো এই দুর্নীতিবাজ, খুনি, অত্যাচারী শাসকের পতন হোক, আমরা বৈষম্যহীন অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে চাই। এ আন্দোলনে শিশু, নারী, শ্রমিক, শিক্ষার্থীসহ শত শত মানুষের জীবন গেল, ২০ সহস্রাধিক জখম হলেন, যাদের মধ্যে বহুজনের হাত-পা বা চোখ হারিয়ে সারা জীবনের জন্য ভয়ংকর স্বাক্ষর বহন করছেন এক অত্যাচারী শাসকের। অথচ পরিস্থিতির গুণগত পরিবর্তনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং এ বিষয়ে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ বিতর্ক তখন থেকেই রাজনীতির প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়; যা সমাজের অনেক জরুরি বিষয়ও মনোযোগ থেকে দূরে রাখে। ফলে শ্রেণিপ্রশ্ন এবং এ-সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আড়ালে চলে যায়, যা বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভিন্ন ব্যর্থতার প্রধান দিক। ’৮০-এর দশকে কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি ও বিশ্বব্যাংকীয় নীতিকাঠামো অর্থাৎ নয়া উদারনৈতিক অর্থনৈতিক নীতিমালা বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে বৃহৎ শিল্পভিত্তি এবং সেই সঙ্গে শ্রমিকভিত্তিও ভেঙে পড়ে। বর্তমানে কৃষির বাইরে পোশাকশিল্প ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকশ্রেণিই শ্রম খাতের প্রধান অংশ, যেখানে সাংগঠনিক ভিত্তি খুবই দুর্বল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাই বামপন্থিদের অবস্থান প্রায় প্রান্তিক।
অন্যদিকে যখন আমরা ২০২৪ সালের গণজাগরণে ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’ কথাটি শুনি বা দেয়াল লিখন দেখি তখন বুঝতে পারি সমাজে বাম এজেন্ডাই প্রধান আকাঙ্ক্ষা। প্রকৃতপক্ষে সাম্য সম্পর্কে কথা বলতে ও অসমতার বিরোধিতা করার অর্থ স্পষ্ট করতে অবশ্যই বামপন্থি রাজনীতির দিকেই তাকাতে হয়, তার পুনর্গঠনের কথা ভাবতে হয়। বাম বা জনপন্থি দর্শন ছাড়া বৈষম্যের বিরুদ্ধে সামগ্রিক লড়াই এগিয়ে যেতে পারে না। কারণ ডানপন্থি বা পুঁজিপন্থি রাজনীতি, বা এরকম অন্য যেকোনো ধরনের রাজনীতি, সহজাতভাবে বৈষম্য-চিন্তা ধারণ করে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি হোক, জাতিভিত্তিক রাজনীতি হোক বা জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, সবই বৈষম্যের ওপর ভর করেই দাঁড়ায়। সেজন্য এগুলোকে আমি বলছি পুঁজিপন্থি রাজনীতি! তাছাড়া তাদের সহযোগী প্রভাবশালী নয়া উদারনৈতিক অর্থনৈতিক মডেল সহজাতভাবেই অসম। এগুলোর সবই বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যকে উৎসাহিত করে। তাই আমাদের সত্যিকারভাবে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হতে গেলে পরিবর্তনের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক দার্শনিক অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।
আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে কেউ ক্ষমতার ব্যবহার করে তার অধস্তনকে নিপীড়ন করবে না, শ্রমজীবী মানুষের হিস্যা আদায় হবে, তাকে নিপীড়িত হতে হবে না, নারীরা নিরাপদে চলাফেরা ও জীবনযাপন করতে পারবে, যেখানে ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষদের বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হতে হবে না। মানুষের লড়াই ততদিন চলমান থাকবে, যতদিন না পর্যন্ত জুলাই হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ সব নিপীড়ন-অত্যাচারের বিচার না করা হবে। কিংবা যতদিন কৃষক, শ্রমিক, মজুরের দাবি আদায় না হবে, ততদিন ধরেই মানুষের দ্রোহের যাত্রা চলতে থাকবে।
লেখক: শিক্ষাবিদ