বর্ষ পরিক্রমায় আরও একটি বছর আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। ঘটনাবহুল ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ পেরিয়ে আমরা ২০২৬ সালে পদার্পণ করলাম। একটি জাতির জীবনে নতুন বছরের আগমন যেকোনো বিচারেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন বছরের সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে ফেলে আসা দিনগুলোর চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলাতে হয়- এটাই রীতি। বাংলাদেশের মানুষের জীবনে ২০২৫ সাল ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী ২০২৫ ছিল স্বৈরাচারমুক্ত একটি পূর্ণাঙ্গ বছর। অন্যান্য বছরের মতো ২০২৫ সাল কোনো সাধারণ বছর ছিল না। বিদ্রোহ-বিপ্লবমন্দ্রিত এ বছরটি আমাদের জাতীয় জীবনে নানা কারণেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিগত ১৮ বছর দেশে সৃষ্ট অন্ধকার যুগ থেকে উত্তরণের মাধ্যমে একটি আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের সূচনা করার ক্ষেত্রে ২০২৫ সাল গুরুত্বপূর্ণ বছর হিসেবে বিবেচিত হবে। বিগত সরকারের আমলের ধংসযজ্ঞ থেকে বেরিয়ে এসে একটি গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণমূলক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার এ সময় ব্যক্ত করা হয়েছে।
প্রথমেই প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে, আমাদের জাতীয় জীবনে কেমন ছিল ২০২৫ সাল? এ বছরের সাফল্য-ব্যর্থতাই বা কেমন ছিল। দেশের সাধারণ মানুষ ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশায় রাজপথে রক্ত দিয়ে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। নতুন সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশার পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বিগত সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যবহার করে দেশের মধ্যে যে অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল তা থেকে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি ছিল জনগণের প্রত্যাশা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, দেশের মানুষ এখনো পরিপূর্ণ শান্তি ফিরে পায়নি। ফিরে আসেনি স্বস্তিদায়ক অবস্থা। গণ-অভ্যুত্থান এবং বিপ্লবের পর দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটা স্বাভাবিক। কিন্তু সে পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে। বাংলাদেশে এর আগেও বেশ কয়েকবার আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটেছে। এরপর নতুন সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলেও কিছু দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। কিন্তু চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ এখনো ফিরে আসেনি। অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো সফলতা দেখাতে পারছে না। এর মধ্যে বেশ কিছু টার্গেট কিলিং হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিভিন্ন স্থানে মবসন্ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলা হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এ ক্রমাবনতি স্বাভাকি ঘটনা নয়। পতিত স্বৈরাচারের আমলে অনৈতিক সুবিধাভোগী একটি মহল উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে। বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষীয় পর্যায়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে।
বিদায়ি বছর (২০২৫) ছিল আন্দোলন-সংগ্রামের বছর। বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন তাদের নানা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথ অবরোধ করে আন্দোলন করেছে। বিদায়ি বছরটি ছিল যেন বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের বছর। আমি দেশের একজন সচেতন মানুষ হিসেবে সব সময়ই পেশাজীবীদের ন্যায্য অধিকারের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলাম। সবাই ন্যায্যতার ভিত্তিতে তাদের অধিকার ভোগ করবে, এটাই আমার চাওয়া। দেশের মানুষের এ আকাঙ্ক্ষার প্রতি নিবিড় সমর্থনের কারণেই আমি শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সব সময়ই নৈতিক সমর্থন দিয়ে এসেছি। তবে আন্দোলনের নামে যখন তখন রাস্তা অবরোধ এবং যানবাহন আটকে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা নিশ্চয়ই কোনো সুস্থ মানুষের কাজ হতে পারে না।
বিগত সরকারের আমলে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার পরিবর্তে শুধু পাশের হার বাড়ানোর প্রতি তারা মনোযোগ দিয়েছিল। ফলে এমন একটি শিক্ষার্থী শ্রেণি গড়ে ওঠে যারা কর্মক্ষেত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম নয়। জাতিকে মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত করা না গেলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পরও একজন শিক্ষার্থী উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় ভালো করতে পারবে না। এ মুহূর্তে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়াটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ ব্যাপারে আমি পত্রিকায় লেখালেখি করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গত দেড় বছর দেশের সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এক ধরনের স্থবিরতা প্রত্যক্ষ করা গেছে। দেশের মানুষের জন্য সবচয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিরাজমান উচ্চমূল্যস্ফীতি। করোনা-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি যখন উত্তরণের পর্যায়ে ছিল তখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। এতে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যায়। বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো বাংলাদেশও উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রবণতা দেখা দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পলিসি রেট বৃদ্ধিসহ অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের মাধমে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ উচ্চমূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হলেও আমরা এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছি। বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকার-সমর্থক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে যা উচ্চমূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। গত নভেম্বরে সার্বিক মূলস্ফীতির হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা কমে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মজুরি বৃদ্ধি না পাওয়ার কারণে জনদুর্ভোগ কমেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, আগামী জুন মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতির সার্বিক হার ৭ শতাংশে নেমে আসবে। তবে এটা কতটা অর্জনযোগ্য তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। কারণ আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তার প্রাক্কালে বাজারে অর্থ প্রবাহ বেড়ে যাবে। ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনীতির অন্যান্য সূচকের ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক দিন ধরেই স্থবিরতা বিরাজ করছে। উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করছেন। তারা নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অপেক্ষা করছেন। অর্থনীতির দুটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক ধারা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। এর একটি হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্থিতি এবং দ্বিতীয়টি প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্স। গত ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্থিতি ছিল ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে মোট ৫ লাখ বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। আগের বছর একই সময়ে ৩ লাখ ৯৭ হাজার বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে বাংলাদেশ মোট ১৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমতুল্য রেমিট্যান্স আহরণ করতে সক্ষম হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এগুলো আমাদের অর্জন।
আমি এখন অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক। বরাবরের মতো এ বছরটিতেও আমি লেখা ও পড়া নিয়ে বেশি সময় কাটিয়েছি। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, আমাকে যেন জ্ঞান আহরণের জন্য তিনি আরও সময় বরাদ্দ করেন। আমি মনে করি, জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের মাধ্যমে সমাজের অন্ধকার দূর করা সম্ভব। বছরটিতে ব্যক্তিগত কাজে মাস দুয়েক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করি। সেখানে কর্মরত আমার ছেলেদের সঙ্গে জ্ঞানের জগতে পশ্চিমা বিশ্বে যে বিস্ফোরণ ঘটেছে সে বিষয় নিয়ে প্রায়শই আলোচনার প্রয়াস পেয়েছি। আমার মন সব সময় দেশের জন্য ব্যাকুল থাকত। আমি কোনোভাবেই বিদেশে গিয়ে নিজের দেশকে ভুলে থাকতে পারিনি। তাই দ্রুত দেশে প্রত্যাবর্তন করি।
আমি একজন আশাবাদী মানুষ। আমি সুন্দর ভবিষ্যৎ দেখতে চাই। আমি মনে করি, আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা যদি গণতন্ত্রের শুভ সূচনা করতে পারি তাহলে দেশকে একটি কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব। ২০২৫ সালের ব্যর্থতার গ্লানি আমরা ২০২৬ সালে কাটিয়ে উঠব, এটাই আমার একান্ত চাওয়া। বাংলাদেশ আমাদের মাতৃভূমি, সেই মাতৃভূমির অসম্মান বা অমর্যাদা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত