বাংলাদেশের রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এখন অনস্বীকার্য। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় সংসদ থেকে স্থানীয় সরকারের তৃণমূল পর্যন্ত নারীরা দৃশ্যমান ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে– রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের এই উপস্থিতি কি তাদের কার্যকরভাবে ক্ষমতায়িত করছে? সংখ্যার বৃদ্ধি কি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়িয়েছে, নাকি নারীর রাজনৈতিক ভূমিকা এখনো কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে আছে?
জাতীয় সংসদে ৩০০টি সাধারণ আসনের পাশাপাশি ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন–তাদের মধ্যে ৬ জন দলীয় (বিএনপি) এমপি এবং একজন স্বতন্ত্র এমপি। সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে এই সংসদের নারী এমপির সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৭ জনে, যা মোট ১৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব। গত ২৫ বছরে এটি সবচেয়ে কম নারী সংসদ সদস্য নির্বাচনের ঘটনা। এ তথ্যই নির্দেশ করে, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনে নারীদের মনোনয়ন দেওয়া এখনো আগের মতো কম।
নারীর ক্ষমতায়ন কী, কেন প্রয়োজন?
নারীর ক্ষমতায়ন বলতে শুধু কর্মক্ষেত্রে বা জনসমক্ষে উপস্থিতি বোঝায় না, বরং এটি নারীর নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পদ ও নীতিনির্ধারণে কার্যকর প্রভাব বিস্তার, নিরাপত্তা এবং নেতৃত্বের সক্ষমতা নিশ্চিত করা। এটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারীর সমান অবস্থান নিশ্চিত করে।
এ ছাড়া নারীর ক্ষমতায়ন মূলত কয়েকটি সূচকে বিভক্ত। যেমন- ১. ব্যক্তিগত ক্ষমতায়ন: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা; ২. অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন: আয়, সম্পত্তি, আর্থিক সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ; ৩. সামাজিক ক্ষমতায়ন: মর্যাদা, বৈষম্যহীন পরিবেশ, নিরাপত্তা; ৪. রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: ভোটাধিকার, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, নীতিনির্ধারণে ভূমিকা।
বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যা বাড়লেই নারীর ক্ষমতায়ন হয় না। কার্যকর অংশগ্রহণ এবং নীতিনির্ধারণে নারীর প্রভাব নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণকে কেবল প্রতীকী বা সহায়ক ভূমিকা হিসেবে দেখলে চলবে না। সংরক্ষিত আসন নারীর প্রতিনিধিত্বের একটি পথ তৈরি করেছে, কিন্তু এটি চূড়ান্ত সমাধান নয়। কারণ রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে তা সীমিত। নারীদের সাধারণ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ বাড়াতে হবে এবং দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ এবং সহিংসতামুক্ত নির্বাচন– এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত না হলে নারীরা টেকসইভাবে এগোতে পারবেন না। বিশেষ করে তরুণ নারীরা অনলাইন হয়রানি ও সামাজিক কটূক্তির কারণে নিরুৎসাহিত হন, যা গণতন্ত্রের জন্যও উদ্বেগের।’
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার মতে, বাংলাদেশে নারী নেতৃত্বের দৃশ্যমানতা আছে, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নে এখনো অনেক পথ বাকি। কারণ সংখ্যা বাড়ালেই ক্ষমতায়ন হয় না; প্রকৃত শক্তি আসে সরাসরি নির্বাচিত হয়ে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সংসদে যাওয়ার মাধ্যমে। রাজনৈতিক দলগুলো এখনো নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে আনতে পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। মনোনয়ন, নির্বাচনি ব্যয় ও রাজনৈতিক সহিংসতার বাস্তবতা নারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নারীদের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান, স্পষ্ট মতাদর্শিক ভূমিকা এবং স্বাধীনভাবে কথা বলার পরিবেশ নিশ্চিত না হলে ক্ষমতায়ন কেবল সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকবে; গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
আন্দোলনে দৃশ্যমান, ক্ষমতায় অদৃশ্য!
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নারীরা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু আন্দোলন-পরবর্তী দলীয় কাঠামো, দলীয় মনোনয়ন, নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় তাদের অনেকেই জায়গা পাননি। কারণ আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, কিন্তু সংগঠিত রাজনীতি কাঠামোবদ্ধ ও নেটওয়ার্কনির্ভর। পরিবার, সামাজিক চাপ, অনলাইন হয়রানি ও রাজনৈতিক সহিংসতা নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতেও তৃণমূল ও মধ্যম পর্যায়ে নারীদের প্রভাব সীমিত। জাতীয় নাগরিক পার্টির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা বলেন, ‘দলীয় রাজনীতির ভেতরে নারীরা এখনো প্রান্তিক অবস্থানে থাকেন। অনেক সময় নারীদের প্রতীকী মুখ হিসেবে সামনে আনা হয়, কিন্তু নীতিনির্ধারণে তাদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সীমিত। তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব গড়ে তোলা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির প্রয়োজন।’
তিনি জানান, তরুণ প্রজন্মের নারীরা রাজনীতিতে আসতে চান, তবে রাজনৈতিক সহিংসতা, চরিত্রহনন, অনলাইন ট্রলিং এবং পারিবারিক ও সামাজিক চাপ রাজনীতিতে আসার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও দলীয় আনুগত্য প্রধান ভূমিকা রাখে। ফলে আন্দোলন বা স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া নারীরা কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক শক্তিতে প্রবেশ করতে পারেন না।
ইন্টার পার্লামেনটারি ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে নারী সংসদ সদস্যের গড় হার প্রায় ২৬ শতাংশ। সংরক্ষিত আসনের কারণে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও সরাসরি নির্বাচিত নারীর সংখ্যা কম থাকায় কাঠামোগত বৈষম্য রয়ে গেছে।
তৃণমূল রাজনীতিতে ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌরসভায় সংরক্ষিত নারী আসনের কারণে হাজার হাজার নারী সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন। তারা স্থানীয় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখছেন। তবে বাজেট, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং পুরুষ সহকর্মীদের সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা এখনো বিদ্যমান।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘সংসদে নারীর উপস্থিতিকে আমরা এখনো অনেক সময় ‘বিধান হিসেবে দেখি, অধিকার হিসেবে নয়– এটি বড় সমস্যা। রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেখানে নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। নারীর প্রতিনিধিত্ব দয়া বা বিশেষ সুবিধা নয়, অধিকারভিত্তিক হতে হবে। নারীর ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব দাবি করা কোনো অতিরঞ্জন নয়; এটি জনসংখ্যার বাস্তব প্রতিফলন।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ আসনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ানো, দলীয় কমিটিতে বাধ্যতামূলক নারী কোটা থাকা, রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচি ও নিরাপত্তা কাঠামো জোরদার করা, নির্বাচনি সহিংসতা ও অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধ এবং সংখ্যাগত অগ্রগতির পাশাপাশি গুণগত ক্ষমতায়নও নিশ্চিত করতে হবে। সংখ্যাগত প্রতিনিধিত্ব থেকে নারীকে গুণগত ক্ষমতায়নের পথে এগিয়ে নেওয়া চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল, সরকার ও নাগরিক সমাজ– সবাইকে সম্মিলিতভাবে এসব দাবি জোরালো করতে হবে। সেটা না হলে নারীর ক্ষমতায়নের আলোচনা কেবল কথাবার্তাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।