সপ্তাহের শেষেই ঈদ। ঈদের নতুন পোশাকের টানে ছুটছেন সবাই। বড় বড় বিপণি কেন্দ্র ছাড়াও এখন ঘরের কাছেই অলিগলিতে গায়ে গায়ে পোশাকের দোকানের ছড়াছড়ি। এমনকি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শোরুমও আছে এখানে-সেখানে। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ধারায় আগের তুলনায় বেড়ে গেছে পোশাকের দামও। অনেকের সামর্থ্যে কুলাচ্ছে না এসব পোশাক কেনার।
কম সামর্থ্যেও সবাই কিনছেন পোশাক, অলংকার, প্রসাধনী, জুতা-স্যান্ডেলসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বিলাসবহুল শপিংমলে দর-কষাকষি ছাড়াই চলে কেনাকাটা। মধ্যবিত্ত বা স্বল্প আয়ের মানুষের ভরসা ফুটপাত। সব জায়গাতেই দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে। যার প্রভাবে আশপাশের সড়কে ব্যাপক যানজট দেখা দেয়।
খবরের কাগজের পক্ষ থেকে ঢাকার এলাকাভিত্তিক ঈদ-বাজারের পরিস্থিতি সরেজমিনে তুলে এনেছেন শাহনাজ পারভীন এলিস, আনিসুর রহমান, রিনা আক্তার তুলি, সাজ্জাদুল কবির, মেহেদী হাসান খাজা, মো. শফিকুল ইসলাম, গ্লোরিয়া অমৃতা ও মুজাহিদ বিল্লাহ।
সময় বেলা ১টা। রাজধানীর আসাদগেটের আড়ং শপিং সেন্টার থেকে ঈদের কেনাকাটা শেষ করে বের হচ্ছিলেন কেরানীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা তারেক-রিক্তা দম্পতি। তাদের দুজনের হাতে ১০-১২টি শপিং ব্যাগ। জিজ্ঞেস করতেই রিক্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের জন্য এক ছাদের নিচে পছন্দের পোশাক কিনতে এসেছিলেন। বেশির ভাগ কেনাকাটা আগেই শেষ। এবার আত্মীয়স্বজনের গিফট করতে আরও কিছু পোশাক কিনলেন। গরমের কারণে এবার সুতি ও লিনেন কাপড়ের জামাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন তিনি।’
শপিং সেন্টারের ভেতর ঢুকতেই দেখা গেল ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। এর মধ্যে স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে শপিংয়ে আসা শারমিন বলেন, ‘কিছু পোশাকে নতুনত্ব থাকলেও বেশির ভাগই গতানুগতিক, তবে দাম খুব চড়া। মেয়ের জন্য আড়ংয়ের বুটিকের টপস আর নিজের জন্য শাড়ি ও থ্রি-পিস কিনেছি। তবে আত্মীয়দের জন্য উপহারসামগ্রী কিনতে যাব কৃষি মার্কেট অথবা নিউ মার্কেটে।’
আড়ং থেকে বেরিয়ে ধানমন্ডির সানরাইজ প্লাজায় গিয়ে দেখা যায় দেশি-বিদেশি শাড়ি, থ্রি-পিস, বাহারি ঈদের পোশাকের সমারোহ। তবে ক্রেতার উপস্থিতি খুব বেশি নয়। সাহারা ফ্যাশন নামের দোকানের বিক্রেতা আবদুল হালিম বলেন, ‘ভারতীয় ও পাকিস্তানি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের থ্রি-পিস, টু-পিস ও ওয়ান পিসের প্রকারভেদে দাম ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। থ্রি-পিসের মধ্যে এবার ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করছেন গঙ্গা, ইস্তা, সাহিবা, রাখি, ওম টেক্স, সীমার, বিপুল বর্সা ও দিল্লি বুটিকস।’ তবে এ মার্কেটের বেশির ভাগ দোকানি জানান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে এবার ক্রেতা আশানুরূপ আসছেন না। বিক্রিও গতবারের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
ক্রেতার উপস্থিতি কম দেখা যায় ধানমন্ডির রাপা প্লাজার বিভিন্ন শোরুমে। রায়েরবাজার এলাকা থেকে শপিংয়ে আসা আফরোজা বেগম জানান, কিছুদিন আগে কলকাতায় বেড়াতে গিয়ে বেশ কিছু থ্রি-পিস কিনে এনেছি। কিন্তু এ সময়ে টেইলাররা সেলাইয়ের দাম হাঁকছেন অনেক বেশি। ১ হাজার টাকার নিচে কোনো সালোয়ার-কামিজ বানানো যাচ্ছে না। একই মার্কেটের সপ্তবর্ন বুটিক হাউসের স্বত্বাধিকারী ফারজানা আক্তার বললেন, শোরুমের পাশাপাশি তিনি অনলাইনে ফেসবুক পেজেও তার বুটিক পোশাক সেল করেন। তবে গত ঈদের তুলনায় এবার বিক্রি প্রায় ৪০ শতাংশ কম। কর্মচারীদের বেতন-বোনাস কীভাবে দেবেন, তা নিয়ে চিন্তিত আছেন।
ঈদ না হলে এত দামে কিনতাম না
দুপুর সাড়ে ১২টায় কেনাকাটার জন্য মার্কেটে এসেছি, এখন বাজে আড়াইটা, কেনাকাটা যা করা দরকার তার অর্ধেকও হয়নি, এবার পোশাক, জুতা, ব্যাগ ও জুয়েলারি যা কিছুই কিনতে যাই, দাম এত বেশি যে তা সাধ্যে কুলাচ্ছে না, দামের কারণে কোনো কিছুতেই হাত দেওয়া যায় না, তাই বেশি প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া তেমন কিছুই কিনছি না, ঈদের জন্যই কেনা, নইলে এত দামে এখন কিনতাম না। অসন্তোষ প্রকাশ করে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টোকিও স্কয়ারে ঈদ পোশাক কিনতে আসা ইভা রহমান এভাবে জানাচ্ছিলেন তার ঈদ মার্কেটের অভিজ্ঞতার কথা। দাম বেশি হওয়ায় শুধু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনেই বাসায় ফিরবেন বলেও জানান এই ক্রেতা।
সরেজমিনে বুধবার (৩ এপ্রিল) রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টোকিও স্কয়ার, কৃষি মার্কেট ও সেইলর, লা-রিভ, সারা, ইনফিনিটি, অ্যাপেক্স, বাটাসহ বিভিন্ন বিপণিবিতান ও দোকান ঘুরে দেখা যায়, এসব শপিংমল ও দোকানে বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে রেখেছেন বিক্রেতারা। ২৩ রমজানের পর থেকে রাজধানীর মার্কেটগুলোতে ক্রেতাসমাগম বাড়লেও বিক্রি তেমন বাড়েনি। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে ঈদ পোশাকের বাজারেও। গত বছরের তুলনায় পোশাকের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চড়া দামে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা।
একই চিত্র দেখা গেছে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে। আগুনে মার্কেট পুড়ে যাওয়ার পর একটা অংশে বেচাবিক্রি চলছে। এই মার্কেটে শিশুসন্তানের জন্য পোশাক কিনতে আসা আবদুল খালেক বলেন, ‘মার্কেটে ভিড় তেমন নেই। এসব মার্কেটে আমরা আসি একটু কম দামে পোশাক কেনার জন্য। তবে এখানেও দেখছি দাম বেশি।’
কৃষি মার্কেটের পোশাক ব্যবসায়ী রমজান বলেন, ‘সব জিনিসের দাম বাড়তি। বেশি দামে কিনে তো আর লসে বিক্রি করতে পারব না। এবার যে অবস্থা দেখছি তাতে ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে।’
ফার্মগেট এলাকায় ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়
ঈদ উপলক্ষে গতকাল রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার মার্কেটগুলোতে দেখা যায় ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। দেশের নামিদামি ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে সব ধরনের বিপণিবিতান রয়েছে এই এলাকায়। তাই যেকোনো উৎসবে বা আয়োজনে কেনাকাটার জন্য মানুষের আকর্ষণ এই এলাকা। গতকাল সরেজমিনে ফার্মগেট এলাকার ইন্দিরা রোডে ফার্মভিউ মার্কেট, সেজান পয়েন্ট, চৌরঙ্গী সুপার মার্কেট ও ফুটপাতের বিভিন্ন দোকানে গিয়ে দেখা যায়, নানা বয়সী মানুষের পদচারণে মুখরিত দোকানগুলো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে কেনাবেচা। ক্রেতার ভিড় সামলে সবাইকে পছন্দমতো পণ্য দেখিয়ে ফুরসত মিলছে না দোকানের কর্মচারীদের। ক্রেতা আকর্ষণে দোকানগুলো সাজানো হয়েছে নানা রঙের বাতিতে। ভারতসহ নানা দেশ থেকে আনা নিত্যনতুন বিভিন্ন ধরনের কাপড়ের পসরা সাজিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু করেছেন দোকানিরা। বিভিন্ন দোকানে দেওয়া হচ্ছে আকর্ষণীয় ছাড়। পোশাকের দোকানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে জুতা, গয়না ও প্রসাধনী কেনার ধুম।
চৌরঙ্গী সুপার মার্কেটের নাহার গার্মেন্টসের বিক্রেতা আল-আমিন খবরের কাগজকে জানান, গত কয়েক দিনে ঈদের বিক্রি বেশ ভালো। রোজার প্রথম দিকে ক্রেতাদের কম আনাগোনা দেখে যে হতাশা কাজ করছিল, এই কয়েক দিনের বিক্রিবাট্টায় অনেকটাই উৎফুল্ল লাগছে। গত কয়েক দিনে আশানুরূপ বিকিকিনি হচ্ছে দোকানে।
ফার্মভিউ মার্কেটের শিশুদের পোশাক বিক্রেতা শফিকুল আলম বলেন, গত বছরের তুলনায় বিক্রি একটু কম হলেও যা হচ্ছে তা মন্দ নয়। গত কয়েক দিন সকাল থেকেই শিশুদের কাপড় কেনার জন্য তার দোকানে ক্রেতাদের আশানুরূপ উপস্থিতি ছিল। তিনি বলেন, শুক্রবারের পর মার্কেট আরও জমজমাট হবে। তখন আরও বেশি বিক্রি হবে মনে করেন তিনি।
ফুটপাতে কাপড় কিনতে আসা হাসনা বানু বলেন, ‘এবারে কাপড়ের দাম চড়া। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে সন্তান ও আত্মীয়দের জন্য কিছু কেনাকাটা তো করতেই হবে। তাই এখান থেকে কম দামে বেছে বেছে ভালো কাপড় নিয়ে নিচ্ছি।’
দাম দ্বিগুণের বেশি
ধনী-গরিবের মার্কেট হিসেবে পরিচিত পুরান ঢাকার রাজধানী সুপার মার্কেট। এখানে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা যেমন আসেন, ঠিক তেমনি নিম্ন আয়ের দরিদ্র মানুষ ঈদের কেনাকাটা করতে আসেন। শিশু ও নারীদের দোকানে কিছুটা ভিড় আছে। কসমেটিকস দোকানে নেই ভিড়। আবার কোনো কোনো দোকানের কর্মীরা অলস সময় পার করছেন। তবে শেষ কয়েক দিনে বেচাবিক্রি বাড়তে পারে। গত বছরের তুলনায় দাম দ্বিগুণের বেশি। তাই এবার বেচাবিক্রি প্রায় ৩০-৪০ শতাংশের মতো কম হতে পারে বলেও জানান ব্যবসায়ীরা।
ক্রেতাদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এবার জামাকাপড়ের দাম অনেক বেশি। প্রতিটি পণ্যের দাম দ্বিগুণ বা তিন গুণ বেশি দাম চাওয়া হচ্ছে। আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজান মাসের শুরুর আগেই প্রতিটি ড্রেসে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে পাইকারি দোকানদাররা। যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বিক্রির ওপর।
বিনেসা শাড়ি বিতানের দোকানদার মো. রাতুল বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে পোশাকের ওপর। এবার বিক্রি বেশি শিশু ও নারীদের পোশাক এবং জুতার। তিনি বলেন, রাজধানী সুপার মার্কেটে ধনী-গবির সব শ্রেণির মানুষ ঈদ মার্কেট করতে আসেন। কিন্তু এবার মানুষের ঢল নেই বললেই চলে। মানুষের আয় না বাড়লে ব্যয় করবে কীভাবে?
ফ্যাশন সিটির মো. শাকিল বলেন, ‘আগের বছরের তুলনায় এবার বিক্রির অবস্থা খুবই খারাপ। জামার দাম শুনেই অনেক ক্রেতা চলে যাচ্ছেন। এবার নায়রা কাট, গাউন, গারারা-সারারা, ফোর প্রিস এগুলোর চাহিদা বেশি। আমরা সামান্য লাভেই পণ্য ছেড়ে দিচ্ছি। কারণ এবার দোকানের খরচ ওঠানোই কষ্টকর হবে।’
ব্যবসায়ীদের হতাশা
রাজধানীর ইসলামপুর, সদরঘাট, বঙ্গবাজার, রাজধানী সুপার মার্কেট, খদ্দর বাজার শপিংমল, আজিজ সুপার মার্কেট, নিউ মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাদের ভিড় রয়েছে মোটামুটি। বিক্রি এখন না থাকলেও আরও বাড়বে বলে আশা বিক্রেতাদের।
বিক্রেতা ও ক্রেতাদের দাম নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করতে দেখা যায়। ক্রেতারা বলছেন দাম বেশি। বিক্রেতারা বলছেন, দাম আগের চেয়ে একটু বেশি হলেও গতবারের দামেই বিক্রি করায় লাভ হচ্ছে কম।
মার্কেটগুলোতে নারীদের পোশাকের দোকানে মোটামুটি ভিড় দেখা যায়। কেউ থ্রি-পিস কিনছেন আবার কেউ কিনছেন থান কাপড়। সবচেয়ে বেশি চাহিদা বিদেশি তৈরি পোশাকের। পুরুষদের মার্কেটে দেখা যায় তরুণদের ভিড়। প্যান্ট-শার্টের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে পাঞ্জাবি।
নিউ মার্কেটের প্যান্ট-শার্টের দোকান স্টাইল জোনের স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান বলেন, ‘বিক্রি অল্প অল্প বাড়ছে। যতটা আশা করেছিলাম, ততটা এখনো হচ্ছে না। আশা করছি আগামী শুক্রবারের পর বেশি বাড়বে।’
ইসলামপুর মার্কেটের জাহান ফেব্রিকসের বিক্রেতা আনোয়ার বলেন, ‘পাইকারিতে বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে, তবে খুচরা বিক্রি কম। অনেকেই হয়তো এখনো স্যালারি পাননি, মাত্র ৩ তারিখ। আশা করছি ২৫ রোজার পর বাড়বে।’
রাজধানী মার্কেটের পাঞ্জাবি বিক্রেতা কলকাতা পাঞ্জাবির স্বত্বাধিকারী সুমন শেখ বলেন, ‘পাঞ্জাবির বেচাকেনা ভালোই আছে, তবে বেশি দামি পাঞ্জাবি অনেকেই কিনতে চান না। অনেকেই দাম নিয়ে বেশি ঝামেলা করেন।’
লাভ বেশি হচ্ছে না বলে জানান আজিজ সুপার মার্কেটের ঐতিহ্যের মালিক অনুপ কুমার। তিনি বলেন, ‘বিক্রি আছে মোটামুটি, গতবারের চেয়ে এবারের দাম ও খরচ বেশি। আমাদের যা সেল হচ্ছে সব নতুন।’
অন্যদিকে ক্রেতাদের দাবি ভিন্ন। দাম বাড়ায় আগের বারের জিনিসের মতো একই ধরনের জিনিস কিনতে হচ্ছে বেশি দাম দিয়ে। অনেকই ক্রেতাই দাম বেশি হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ক্রেতা টানতে লাখ টাকার পুরস্কার
বিক্রি কমে যাওয়ায় ক্রেতা টানতে র্যাফল ড্রয়ের মাধ্যমে লাখ টাকার বেশি পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে উত্তরার নর্থ টাওয়ারের দোকান মালিক ব্যবসায়ী সমিতি। যেকোনো দোকান থেকে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকার কেনাকাটা করলে মিলবে একটি কুপন। কেনাকাটার পরিমাণভেদে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ পাঁচ-ছয়টি কুপন পাবেন। যার র্যাফল ড্র অনুষ্ঠিত হবে ৩০ এপ্রিল। এতে ১০১টি পুরস্কার দেওয়া হবে। প্রথম পুরস্কার মোটর বাইক, দ্বিতীয় পুরস্কার সোনার হার, তৃতীয় পুরস্কার এয়ার কন্ডিশন, চতুর্থ পুরস্কার ফ্রিজ। এ ছাড়া টিভি, ওয়াশিং মেশিন, এয়ার টিকিটসহ বিভিন্ন পুরস্কার রয়েছে। যারা কেনাকাটা করছেন তাদের মধ্যে এই র্যাফল ড্র নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেল। নিচতলায় রাখা স্বচ্ছ কাচের বক্সে ঠিকানা লিখে কুপন জমা দিচ্ছেন।
উত্তরার নর্থ টাওয়ারের আইকন শোরুমে গত ঈদের আগের কয়েক দিন গড়ে বিক্রি হয়েছে প্রায় ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা, যা এ বছর অর্ধেকেরও কমে নেমে এসেছে। বিক্রয়কর্মী সোহেল জানালেন, ‘গাজীপুরসহ আশপাশের লোকজন কম আসায় বিক্রি কমে গেছে। একই সঙ্গে মানুষের হাতে টাকা-পয়সা তেমন নেই।’ একই ফ্লোরের দোকান বেবিডলের বিক্রয়কর্মী লুবানের কাছে ঈদ কেনাকাটা নিয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘না ভাই বেচাকেনা খুবই কম। সুবিধার না। ঈদ প্রায় এসে গেল, মার্কেট ফাঁকা। তুলনা করলে অনেক খারাপ অবস্থা। আগে অনেক ভালো ছিল। এখন স্থানীয় কাস্টমার কম। আগে টঙ্গী, ময়মনসিংহ থেকে প্রচুর ক্রেতা আসত।’
তবে গতবারের তুলনায় দাম তুলনামূলক বেশি রাখা হচ্ছে বলে জানালেন ক্রেতারা। ফলে বাজেট অনুযায়ী কেনাকাটা করতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। টঙ্গীর সফিউদ্দীন কলেজের বাণিজ্য বিভাগের প্রথম বর্ষের মাজহারুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত বছর যেসব পাঞ্জাবি আমরা ১ হাজার থেকে দেড় হাজারের মধ্যে নিতে পেরেছি, সেগুলো এখন প্রায় ডাবল। সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু আমাদের তো ঈদে নতুন জামার দরকার হয়। সে জন্য মধ্যম মানের একটা পাঞ্জাবি কিনেছি। একই অবস্থা হয়েছে ক্বরিউল কোরআন ইসলামিয়া মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্র ইয়াসিন রহমান তামিমেরও।
পরিবার নিয়ে মার্কেটে
রাজধানীর নিউ মার্কেট, চাঁদনী চক মার্কেট ও এর আশপাশের ফুটপাতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। এখানে অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছেন। বেশি ভিড় লক্ষ করা গেছে নারীদের শাড়ি, থ্রি-পিসসহ বিভিন্ন পোশাক, জুতা ও প্রসাধনসামগ্রীর দোকানগুলোতে। মার্কেটের পাশাপাশি ফুটপাতের দোকানগুলোতেও ছিল ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। আহসান নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘শেষ মুহূর্তে কেনাকাটা করতে এলে মার্কেটে প্রচুর ভিড় থাকে। লোকজনের ভিড়ে পা ফেলা যায় না। সে জন্য আগেভাগেই ঈদের কেনাকাটা করতে নিউ মার্কেটে এসেছি। তবে এখানে এসে দেখছি আরও অনেকেই কেনাকাটা করতে এসেছেন। মানুষের প্রচুর ভিড়। এখনো কিছু কিনিনি, ঘুরে ঘুরে দেখছি কী কেনা যায়।’
নিউ মার্কেটের একজন বিক্রেতা জানান, গরম বাড়ছে, তাই গরমে পরার উপযোগী পোশাকগুলোই তারা তাদের দোকানে সাজিয়েছেন। ক্রেতারাও গরমে আরামদায়ক হবে এমন পোশাক কিনছেন।
তবে ক্রেতারা বলছেন, অন্য যেকোনো বারের তুলনায় এবার ঈদের পোশাকের দাম অনেক বেশি। চাহিদার বিপরীতে অল্প কেনাকাটা করেই বাড়ি ফিরছেন অনেকে।
নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা ফুটপাতে
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের ফুটপাতের কেনাকাটার চিত্র ছিল চোখে পড়ার মতো।
ক্রেতারা বলেন, তুলনামূলক অল্প দামে পছন্দের পোশাক, গয়না, জুতা, প্রসাধনীসহ পছন্দের পণ্য কিনতে ফুটপাতের দোকানগুলোতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা ভিড় করছেন।
রাজধানীর মালিবাগে দেখা যায়, ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখরিত হয়ে উঠেছে ফুটপাতের দোকানগুলো। ক্রেতাদের দাবি, মূলত, মার্কেটের তুলনায় কম দামে বাহারি ও প্রয়োজনীয় পণ্য মেলে ফুটপাতের এসব দোকানে। এ জন্য বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এসব জায়গায় ভিড় করছেন।
নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের একাধিক ক্রেতা খবরের কাগজকে জানান, ঢাকায় যেসব মার্কেট রয়েছে সেখানে গেলে তারা অনেক দাম চায়। সেই দামে সবার জন্য কেনাকাটা সম্ভব হয় না। এ জন্য ফুটপাতে থেকে পরিবারের জন্য কেনাকাটা সেরে ফেলছেন।
কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজারের সামনে কথা হয় ফুটপাতের জিনিসের ক্রেতা জসিম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বড় মার্কেটগুলোতে কাপড়ের ব্যাপক দাম। আয়-রোজগারের মধ্যে কেনাকাটা করতে হলে আমাদের মতো নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের ফুটপাত হলো এখন এক মাত্র ভরসা।’
রাজধানীর গুলিস্তানের মাজার এলাকার ফুটপাত থেকে পরিবারের সবার জন্য ঈদের কেনাকাটা করেছেন দিনমজুরি আলী আজগর। তিনি বলেন, ‘আমার আর রোজগার কত, এর পরও পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা শেষ করছি। রবিবার বাড়িতে যাব।’
ফুটপাতের একাধিক ব্যবসায়ীও বলেছেন, এবার রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটের চেয়ে ফুটপাতে ক্রেতাদের একটু বেশি ভিড় লক্ষ করা গেছে। ভালোই কেনাবেচা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন এসব ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা।