ঢাকা ১ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ক্যারিয়ার গড়ুন সীমান্ত ব্যাংকে অবশেষে মায়ামিতে উরুগুয়ে দল খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে সরকার: কৃষিমন্ত্রী প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার তৌহিদ আফ্রিদি ভারতের ভিসা আবেদনের অ্যাপয়েন্টমেন্টে নতুন নির্দেশনা মহাখালী বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত, আলোচনায় সায়েদাবাদ-ফুলবাড়িয়া ব্রাজিলে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা গেল গায়ক অ্যামচেমের নতুন সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, সহসভাপতি আলা উদ্দিন নওগাঁয় বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উদযাপন সরকার ২ হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে: কৃষিমন্ত্রী মাদারীপুরে সংঘর্ষে আহত ১০, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ডিএমপির ২১৬৭ মামলা কিয়ামতের আদালতে সবচেয়ে ভয়ংকর সাক্ষী কে জানেন? ট্রাফিক মামলা নিষ্পত্তি করলেই ২৫ শতাংশ ছাড় বাজেটে ইতিবাচক উদ্যোগের পাশাপাশি উদ্বেগ জানিয়েছে রিহ্যাব জনবল নেবে ব্র্যাক ব্যাংক ম্যাচ শেষেই নির্বাসন, যুক্তরাষ্ট্রের কড়া বিধিনিষেধে ক্ষুব্ধ ইরানের কোচ ধর্ষণচেষ্টায় যুবদল নেতা গ্রেপ্তার, দল থেকে বহিষ্কার ব্যাপন, অভিস্রবণ ও প্রস্বেদন অধ্যায়ের ৪টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ২য় পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান নীল, সাদা রঙে রাঙা রংপুর, আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উচ্ছ্বাস তারপরও টুর্নামেন্ট উপভোগের বার্তা কুরাসাও কোচের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উদ্ভাবনী সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে চান মোশাহিদ বিশ্বকাপের পুরো পারিশ্রমিকই পাচ্ছেন সোমালির রেফারি আরতান দেশে ফিরলেন ৫৬ হাজার ৮৬৮ হাজি, মারা গেছেন কতজন? রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অবাস্তব: জিএম কাদের মার্কিন-ইরান যুদ্ধের আবহে ফিফা বিশ্বকাপ কম আনন্দময়: ইরান অধিনায়ক ধোবাউড়ায় ৫ বছরের শিশুর মরদেহ উদ্ধার, শরীরে ধর্ষণের আলামত রবীন্দ্র সরোবরে উদীচীর বর্ষা উৎসব রাঙামাটিতে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসে মানববন্ধন ঢাকা-ময়সনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ
Nagad desktop

কম সামর্থ্যেও ধুম কেনাকাটা

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:৫০ পিএম
কম সামর্থ্যেও ধুম কেনাকাটা
রাজধানীর নিউ মার্কেটে ঈদ কেনাকাটায় ব্যস্ত ক্রেতারা। ছবি : খবরের কাগজ

সপ্তাহের শেষেই ঈদ। ঈদের নতুন পোশাকের টানে ছুটছেন সবাই। বড় বড় বিপণি কেন্দ্র ছাড়াও এখন ঘরের কাছেই অলিগলিতে গায়ে গায়ে পোশাকের দোকানের ছড়াছড়ি। এমনকি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শোরুমও আছে এখানে-সেখানে। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ধারায় আগের তুলনায় বেড়ে গেছে পোশাকের দামও। অনেকের সামর্থ্যে কুলাচ্ছে না এসব পোশাক কেনার। 

কম সামর্থ্যেও সবাই কিনছেন পোশাক, অলংকার, প্রসাধনী, জুতা-স্যান্ডেলসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বিলাসবহুল শপিংমলে দর-কষাকষি ছাড়াই চলে কেনাকাটা। মধ্যবিত্ত বা স্বল্প আয়ের মানুষের ভরসা ফুটপাত। সব জায়গাতেই দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে। যার প্রভাবে আশপাশের সড়কে ব্যাপক যানজট দেখা দেয়। 

খবরের কাগজের পক্ষ থেকে ঢাকার এলাকাভিত্তিক ঈদ-বাজারের পরিস্থিতি সরেজমিনে তুলে এনেছেন শাহনাজ পারভীন এলিস, আনিসুর রহমান, রিনা আক্তার তুলি, সাজ্জাদুল কবির, মেহেদী হাসান খাজা, মো. শফিকুল ইসলাম, গ্লোরিয়া অমৃতা ও মুজাহিদ বিল্লাহ। 

সময় বেলা ১টা। রাজধানীর আসাদগেটের আড়ং শপিং সেন্টার থেকে ঈদের কেনাকাটা শেষ করে বের হচ্ছিলেন কেরানীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা তারেক-রিক্তা দম্পতি। তাদের দুজনের হাতে ১০-১২টি শপিং ব্যাগ। জিজ্ঞেস করতেই রিক্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের জন্য এক ছাদের নিচে পছন্দের পোশাক কিনতে এসেছিলেন। বেশির ভাগ কেনাকাটা আগেই শেষ। এবার আত্মীয়স্বজনের গিফট করতে আরও কিছু পোশাক কিনলেন। গরমের কারণে এবার সুতি ও লিনেন কাপড়ের জামাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন তিনি।’

শপিং সেন্টারের ভেতর ঢুকতেই দেখা গেল ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। এর মধ্যে স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে শপিংয়ে আসা শারমিন বলেন, ‘কিছু পোশাকে নতুনত্ব থাকলেও বেশির ভাগই গতানুগতিক, তবে দাম খুব চড়া। মেয়ের জন্য আড়ংয়ের বুটিকের টপস আর নিজের জন্য শাড়ি ও থ্রি-পিস কিনেছি। তবে আত্মীয়দের জন্য উপহারসামগ্রী কিনতে যাব কৃষি মার্কেট অথবা নিউ মার্কেটে।’ 

আড়ং থেকে বেরিয়ে ধানমন্ডির সানরাইজ প্লাজায় গিয়ে দেখা যায় দেশি-বিদেশি শাড়ি, থ্রি-পিস, বাহারি ঈদের পোশাকের সমারোহ। তবে ক্রেতার উপস্থিতি খুব বেশি নয়। সাহারা ফ্যাশন নামের দোকানের বিক্রেতা আবদুল হালিম বলেন, ‘ভারতীয় ও পাকিস্তানি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের থ্রি-পিস, টু-পিস ও ওয়ান পিসের প্রকারভেদে দাম ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। থ্রি-পিসের মধ্যে এবার ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করছেন গঙ্গা, ইস্তা, সাহিবা, রাখি, ওম টেক্স, সীমার, বিপুল বর্সা ও দিল্লি বুটিকস।’ তবে এ মার্কেটের বেশির ভাগ দোকানি জানান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে এবার ক্রেতা আশানুরূপ আসছেন না। বিক্রিও গতবারের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম। 

ক্রেতার উপস্থিতি কম দেখা যায় ধানমন্ডির রাপা প্লাজার বিভিন্ন শোরুমে। রায়েরবাজার এলাকা থেকে শপিংয়ে আসা আফরোজা বেগম জানান, কিছুদিন আগে কলকাতায় বেড়াতে গিয়ে বেশ কিছু থ্রি-পিস কিনে এনেছি। কিন্তু এ সময়ে টেইলাররা সেলাইয়ের দাম হাঁকছেন অনেক বেশি। ১ হাজার টাকার নিচে কোনো সালোয়ার-কামিজ বানানো যাচ্ছে না। একই মার্কেটের সপ্তবর্ন বুটিক হাউসের স্বত্বাধিকারী ফারজানা আক্তার বললেন, শোরুমের পাশাপাশি তিনি অনলাইনে ফেসবুক পেজেও তার বুটিক পোশাক সেল করেন। তবে গত ঈদের তুলনায় এবার বিক্রি প্রায় ৪০ শতাংশ কম। কর্মচারীদের বেতন-বোনাস কীভাবে দেবেন, তা নিয়ে চিন্তিত আছেন। 

ঈদ না হলে এত দামে কিনতাম না

দুপুর সাড়ে ১২টায় কেনাকাটার জন্য মার্কেটে এসেছি, এখন বাজে আড়াইটা, কেনাকাটা যা করা দরকার তার অর্ধেকও হয়নি, এবার পোশাক, জুতা, ব্যাগ ও জুয়েলারি যা কিছুই কিনতে যাই, দাম এত বেশি যে তা সাধ্যে কুলাচ্ছে না, দামের কারণে কোনো কিছুতেই হাত দেওয়া যায় না, তাই বেশি প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া তেমন কিছুই কিনছি না, ঈদের জন্যই কেনা, নইলে এত দামে এখন কিনতাম না। অসন্তোষ প্রকাশ করে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টোকিও স্কয়ারে ঈদ পোশাক কিনতে আসা ইভা রহমান এভাবে জানাচ্ছিলেন তার ঈদ মার্কেটের অভিজ্ঞতার কথা। দাম বেশি হওয়ায় শুধু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনেই বাসায় ফিরবেন বলেও জানান এই ক্রেতা। 

সরেজমিনে বুধবার (৩ এপ্রিল) রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টোকিও স্কয়ার, কৃষি মার্কেট ও সেইলর, লা-রিভ, সারা, ইনফিনিটি, অ্যাপেক্স, বাটাসহ বিভিন্ন বিপণিবিতান ও দোকান ঘুরে দেখা যায়, এসব শপিংমল ও দোকানে বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে রেখেছেন বিক্রেতারা। ২৩ রমজানের পর থেকে রাজধানীর মার্কেটগুলোতে ক্রেতাসমাগম বাড়লেও বিক্রি তেমন বাড়েনি। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে ঈদ পোশাকের বাজারেও। গত বছরের তুলনায় পোশাকের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চড়া দামে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা।

একই চিত্র দেখা গেছে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে। আগুনে মার্কেট পুড়ে যাওয়ার পর একটা অংশে বেচাবিক্রি চলছে। এই মার্কেটে শিশুসন্তানের জন্য পোশাক কিনতে আসা আবদুল খালেক বলেন, ‘মার্কেটে ভিড় তেমন নেই। এসব মার্কেটে আমরা আসি একটু কম দামে পোশাক কেনার জন্য। তবে এখানেও দেখছি দাম বেশি।’

কৃষি মার্কেটের পোশাক ব্যবসায়ী রমজান বলেন, ‘সব জিনিসের দাম বাড়তি। বেশি দামে কিনে তো আর লসে বিক্রি করতে পারব না। এবার যে অবস্থা দেখছি তাতে ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে।’ 

ফার্মগেট এলাকায় ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়

ঈদ উপলক্ষে গতকাল রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার মার্কেটগুলোতে দেখা যায় ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। দেশের নামিদামি ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে সব ধরনের বিপণিবিতান রয়েছে এই এলাকায়। তাই যেকোনো উৎসবে বা আয়োজনে কেনাকাটার জন্য মানুষের আকর্ষণ এই এলাকা। গতকাল সরেজমিনে ফার্মগেট এলাকার ইন্দিরা রোডে ফার্মভিউ মার্কেট, সেজান পয়েন্ট, চৌরঙ্গী সুপার মার্কেট ও ফুটপাতের বিভিন্ন দোকানে গিয়ে দেখা যায়, নানা বয়সী মানুষের পদচারণে মুখরিত দোকানগুলো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে কেনাবেচা। ক্রেতার ভিড় সামলে সবাইকে পছন্দমতো পণ্য দেখিয়ে ফুরসত মিলছে না দোকানের কর্মচারীদের। ক্রেতা আকর্ষণে দোকানগুলো সাজানো হয়েছে নানা রঙের বাতিতে। ভারতসহ নানা দেশ থেকে আনা নিত্যনতুন বিভিন্ন ধরনের কাপড়ের পসরা সাজিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু করেছেন দোকানিরা। বিভিন্ন দোকানে দেওয়া হচ্ছে আকর্ষণীয় ছাড়। পোশাকের দোকানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে জুতা, গয়না ও প্রসাধনী কেনার ধুম।

চৌরঙ্গী সুপার মার্কেটের নাহার গার্মেন্টসের বিক্রেতা আল-আমিন খবরের কাগজকে জানান, গত কয়েক দিনে ঈদের বিক্রি বেশ ভালো। রোজার প্রথম দিকে ক্রেতাদের কম আনাগোনা দেখে যে হতাশা কাজ করছিল, এই কয়েক দিনের বিক্রিবাট্টায় অনেকটাই উৎফুল্ল লাগছে। গত কয়েক দিনে আশানুরূপ বিকিকিনি হচ্ছে দোকানে। 

ফার্মভিউ মার্কেটের শিশুদের পোশাক বিক্রেতা শফিকুল আলম বলেন, গত বছরের তুলনায় বিক্রি একটু কম হলেও যা হচ্ছে তা মন্দ নয়। গত কয়েক দিন সকাল থেকেই শিশুদের কাপড় কেনার জন্য তার দোকানে ক্রেতাদের আশানুরূপ উপস্থিতি ছিল। তিনি বলেন, শুক্রবারের পর মার্কেট আরও জমজমাট হবে। তখন আরও বেশি বিক্রি হবে মনে করেন তিনি।
 
ফুটপাতে কাপড় কিনতে আসা হাসনা বানু বলেন, ‘এবারে কাপড়ের দাম চড়া। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে সন্তান ও আত্মীয়দের জন্য কিছু কেনাকাটা তো করতেই হবে। তাই এখান থেকে কম দামে বেছে বেছে ভালো কাপড় নিয়ে নিচ্ছি।’

দাম দ্বিগুণের বেশি

ধনী-গরিবের মার্কেট হিসেবে পরিচিত পুরান ঢাকার রাজধানী সুপার মার্কেট। এখানে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা যেমন আসেন, ঠিক তেমনি নিম্ন আয়ের দরিদ্র মানুষ ঈদের কেনাকাটা করতে আসেন। শিশু ও নারীদের দোকানে কিছুটা ভিড় আছে। কসমেটিকস দোকানে নেই ভিড়। আবার কোনো কোনো দোকানের কর্মীরা অলস সময় পার করছেন। তবে শেষ কয়েক দিনে বেচাবিক্রি বাড়তে পারে। গত বছরের তুলনায় দাম দ্বিগুণের বেশি। তাই এবার বেচাবিক্রি প্রায় ৩০-৪০ শতাংশের মতো কম হতে পারে বলেও জানান ব্যবসায়ীরা।

ক্রেতাদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এবার জামাকাপড়ের দাম অনেক বেশি। প্রতিটি পণ্যের দাম দ্বিগুণ বা তিন গুণ বেশি দাম চাওয়া হচ্ছে। আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজান মাসের শুরুর আগেই প্রতিটি ড্রেসে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে পাইকারি দোকানদাররা। যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বিক্রির ওপর।

বিনেসা শাড়ি বিতানের দোকানদার মো. রাতুল বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে পোশাকের ওপর। এবার বিক্রি বেশি শিশু ও নারীদের পোশাক এবং জুতার। তিনি বলেন, রাজধানী সুপার মার্কেটে ধনী-গবির সব শ্রেণির মানুষ ঈদ মার্কেট করতে আসেন। কিন্তু এবার মানুষের ঢল নেই বললেই চলে। মানুষের আয় না বাড়লে ব্যয় করবে কীভাবে?

ফ্যাশন সিটির মো. শাকিল বলেন, ‘আগের বছরের তুলনায় এবার বিক্রির অবস্থা খুবই খারাপ। জামার দাম শুনেই অনেক ক্রেতা চলে যাচ্ছেন। এবার নায়রা কাট, গাউন, গারারা-সারারা, ফোর প্রিস এগুলোর চাহিদা বেশি। আমরা সামান্য লাভেই পণ্য ছেড়ে দিচ্ছি। কারণ এবার দোকানের খরচ ওঠানোই কষ্টকর হবে।’

ব্যবসায়ীদের হতাশা

রাজধানীর ইসলামপুর, সদরঘাট, বঙ্গবাজার, রাজধানী সুপার মার্কেট, খদ্দর বাজার শপিংমল, আজিজ সুপার মার্কেট, নিউ মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাদের ভিড় রয়েছে মোটামুটি। বিক্রি এখন না থাকলেও আরও বাড়বে বলে আশা বিক্রেতাদের। 

বিক্রেতা ও ক্রেতাদের দাম নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করতে দেখা যায়। ক্রেতারা বলছেন দাম বেশি। বিক্রেতারা বলছেন, দাম আগের চেয়ে একটু বেশি হলেও গতবারের দামেই বিক্রি করায় লাভ হচ্ছে কম। 

মার্কেটগুলোতে নারীদের পোশাকের দোকানে মোটামুটি ভিড় দেখা যায়। কেউ থ্রি-পিস কিনছেন আবার কেউ কিনছেন থান কাপড়। সবচেয়ে বেশি চাহিদা বিদেশি তৈরি পোশাকের। পুরুষদের মার্কেটে দেখা যায় তরুণদের ভিড়। প্যান্ট-শার্টের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে পাঞ্জাবি। 

নিউ মার্কেটের প্যান্ট-শার্টের দোকান স্টাইল জোনের স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান বলেন, ‘বিক্রি অল্প অল্প বাড়ছে। যতটা আশা করেছিলাম, ততটা এখনো হচ্ছে না। আশা করছি আগামী শুক্রবারের পর বেশি বাড়বে।’

ইসলামপুর মার্কেটের জাহান ফেব্রিকসের বিক্রেতা আনোয়ার বলেন, ‘পাইকারিতে বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে, তবে খুচরা বিক্রি কম। অনেকেই হয়তো এখনো স্যালারি পাননি, মাত্র ৩ তারিখ। আশা করছি ২৫ রোজার পর বাড়বে।’ 

রাজধানী মার্কেটের পাঞ্জাবি বিক্রেতা কলকাতা পাঞ্জাবির স্বত্বাধিকারী সুমন শেখ বলেন, ‘পাঞ্জাবির বেচাকেনা ভালোই আছে, তবে বেশি দামি পাঞ্জাবি অনেকেই কিনতে চান না। অনেকেই দাম নিয়ে বেশি ঝামেলা করেন।’ 

লাভ বেশি হচ্ছে না বলে জানান আজিজ সুপার মার্কেটের ঐতিহ্যের মালিক অনুপ কুমার। তিনি বলেন, ‘বিক্রি আছে মোটামুটি, গতবারের চেয়ে এবারের দাম ও খরচ বেশি। আমাদের যা সেল হচ্ছে সব নতুন।’ 

অন্যদিকে ক্রেতাদের দাবি ভিন্ন। দাম বাড়ায় আগের বারের জিনিসের মতো একই ধরনের জিনিস কিনতে হচ্ছে বেশি দাম দিয়ে। অনেকই ক্রেতাই দাম বেশি হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। 

ক্রেতা টানতে লাখ টাকার পুরস্কার

বিক্রি কমে যাওয়ায় ক্রেতা টানতে র‌্যাফল ড্রয়ের মাধ্যমে লাখ টাকার বেশি পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে উত্তরার নর্থ টাওয়ারের দোকান মালিক ব্যবসায়ী সমিতি। যেকোনো দোকান থেকে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকার কেনাকাটা করলে মিলবে একটি কুপন। কেনাকাটার পরিমাণভেদে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ পাঁচ-ছয়টি কুপন পাবেন। যার র‌্যাফল ড্র অনুষ্ঠিত হবে ৩০ এপ্রিল। এতে ১০১টি পুরস্কার দেওয়া হবে। প্রথম পুরস্কার মোটর বাইক, দ্বিতীয় পুরস্কার সোনার হার, তৃতীয় পুরস্কার এয়ার কন্ডিশন, চতুর্থ পুরস্কার ফ্রিজ। এ ছাড়া টিভি, ওয়াশিং মেশিন, এয়ার টিকিটসহ বিভিন্ন পুরস্কার রয়েছে। যারা কেনাকাটা করছেন তাদের মধ্যে এই র‌্যাফল ড্র নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেল। নিচতলায় রাখা স্বচ্ছ কাচের বক্সে ঠিকানা লিখে কুপন জমা দিচ্ছেন।

উত্তরার নর্থ টাওয়ারের আইকন শোরুমে গত ঈদের আগের কয়েক দিন গড়ে বিক্রি হয়েছে প্রায় ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা, যা এ বছর অর্ধেকেরও কমে নেমে এসেছে। বিক্রয়কর্মী সোহেল জানালেন, ‘গাজীপুরসহ আশপাশের লোকজন কম আসায় বিক্রি কমে গেছে। একই সঙ্গে মানুষের হাতে টাকা-পয়সা তেমন নেই।’ একই ফ্লোরের দোকান বেবিডলের বিক্রয়কর্মী লুবানের কাছে ঈদ কেনাকাটা নিয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘না ভাই বেচাকেনা খুবই কম। সুবিধার না। ঈদ প্রায় এসে গেল, মার্কেট ফাঁকা। তুলনা করলে অনেক খারাপ অবস্থা। আগে অনেক ভালো ছিল। এখন স্থানীয় কাস্টমার কম। আগে টঙ্গী, ময়মনসিংহ থেকে প্রচুর ক্রেতা আসত।’ 

তবে গতবারের তুলনায় দাম তুলনামূলক বেশি রাখা হচ্ছে বলে জানালেন ক্রেতারা। ফলে বাজেট অনুযায়ী কেনাকাটা করতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। টঙ্গীর সফিউদ্দীন কলেজের বাণিজ্য বিভাগের প্রথম বর্ষের মাজহারুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত বছর যেসব পাঞ্জাবি আমরা ১ হাজার থেকে দেড় হাজারের মধ্যে নিতে পেরেছি, সেগুলো এখন প্রায় ডাবল। সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু আমাদের তো ঈদে নতুন জামার দরকার হয়। সে জন্য মধ্যম মানের একটা পাঞ্জাবি কিনেছি। একই অবস্থা হয়েছে ক্বরিউল কোরআন ইসলামিয়া মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্র ইয়াসিন রহমান তামিমেরও। 

পরিবার নিয়ে মার্কেটে

রাজধানীর নিউ মার্কেট, চাঁদনী চক মার্কেট ও এর আশপাশের ফুটপাতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। এখানে অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছেন। বেশি ভিড় লক্ষ করা গেছে নারীদের শাড়ি, থ্রি-পিসসহ বিভিন্ন পোশাক, জুতা ও প্রসাধনসামগ্রীর দোকানগুলোতে। মার্কেটের পাশাপাশি ফুটপাতের দোকানগুলোতেও ছিল ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। আহসান নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘শেষ মুহূর্তে কেনাকাটা করতে এলে মার্কেটে প্রচুর ভিড় থাকে। লোকজনের ভিড়ে পা ফেলা যায় না। সে জন্য আগেভাগেই ঈদের কেনাকাটা করতে নিউ মার্কেটে এসেছি। তবে এখানে এসে দেখছি আরও অনেকেই কেনাকাটা করতে এসেছেন। মানুষের প্রচুর ভিড়। এখনো কিছু কিনিনি, ঘুরে ঘুরে দেখছি কী কেনা যায়।’

নিউ মার্কেটের একজন বিক্রেতা জানান, গরম বাড়ছে, তাই গরমে পরার উপযোগী পোশাকগুলোই তারা তাদের দোকানে সাজিয়েছেন। ক্রেতারাও গরমে আরামদায়ক হবে এমন পোশাক কিনছেন। 

তবে ক্রেতারা বলছেন, অন্য যেকোনো বারের তুলনায় এবার ঈদের পোশাকের দাম অনেক বেশি। চাহিদার বিপরীতে অল্প কেনাকাটা করেই বাড়ি ফিরছেন অনেকে।

নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা ফুটপাতে

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের ফুটপাতের কেনাকাটার চিত্র ছিল চোখে পড়ার মতো। 

ক্রেতারা বলেন, তুলনামূলক অল্প দামে পছন্দের পোশাক, গয়না, জুতা, প্রসাধনীসহ পছন্দের পণ্য কিনতে ফুটপাতের দোকানগুলোতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা ভিড় করছেন।

রাজধানীর মালিবাগে দেখা যায়, ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখরিত হয়ে উঠেছে ফুটপাতের দোকানগুলো। ক্রেতাদের দাবি, মূলত, মার্কেটের তুলনায় কম দামে বাহারি ও প্রয়োজনীয় পণ্য মেলে ফুটপাতের এসব দোকানে। এ জন্য বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এসব জায়গায় ভিড় করছেন।

নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের একাধিক ক্রেতা খবরের কাগজকে জানান, ঢাকায় যেসব মার্কেট রয়েছে সেখানে গেলে তারা অনেক দাম চায়। সেই দামে সবার জন্য কেনাকাটা সম্ভব হয় না। এ জন্য ফুটপাতে থেকে পরিবারের জন্য কেনাকাটা সেরে ফেলছেন।

কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজারের সামনে কথা হয় ফুটপাতের জিনিসের ক্রেতা জসিম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বড় মার্কেটগুলোতে কাপড়ের ব্যাপক দাম। আয়-রোজগারের মধ্যে কেনাকাটা করতে হলে আমাদের মতো নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের ফুটপাত হলো এখন এক মাত্র ভরসা।’

রাজধানীর গুলিস্তানের মাজার এলাকার ফুটপাত থেকে পরিবারের সবার জন্য ঈদের কেনাকাটা করেছেন দিনমজুরি আলী আজগর। তিনি বলেন, ‘আমার আর রোজগার কত, এর পরও পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা শেষ করছি। রবিবার বাড়িতে যাব।’ 

ফুটপাতের একাধিক ব্যবসায়ীও বলেছেন, এবার রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটের চেয়ে ফুটপাতে ক্রেতাদের একটু বেশি ভিড় লক্ষ করা গেছে। ভালোই কেনাবেচা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন এসব ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা।

আতঙ্কে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামিরা

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৮:৪২ এএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬, ১১:৫১ এএম
আতঙ্কে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামিরা
ছবি: সংগৃহীত

একসময়ের মহাপ্রতাপশালী হিসেবে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ব্যাপক পরিচিত। যিনি বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের সময়ে অনেকের কাছেই ছিলেন মূর্তিমান আতঙ্ক। বলা হয়ে থাকে– বেনজীর আহমেদ সে সময়ের অনেক মন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাধর ছিলেন। সেই বেনজীর আহমেদ এবার আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ‘ইন্টারপোল’ এর সহায়তায় দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিদেশে পলাতক বা আত্মগোপনে থাকা অন্য আসামিরাও এখন আতঙ্কে ভুগছেন বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।

রবিবার (১৪ জুন) ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটের ‘রেড নোটিশ’ তালিকায় সারা বিশ্বের ৬ হাজার ৪৪২ জন ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামির নাম, ছবি ও বয়সসহ প্রাথমিক তথ্য দেখা গেছে। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামি রয়েছেন ৫৯ জন। সাম্প্রতিক সময়ে এ তালিকায় নতুন মাত্র কয়েকজন যুক্ত হলেও অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে ওই ওয়েবসাইটের রেড নোটিশের তালিকায় প্রদর্শিত হয়ে আসছেন।

যদিও এই রেড নোটিশের তালিকায় গতকাল পর্যন্ত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের নাম বা ছবি কোনো কিছুই দেখা যায়নি। তবে ইন্টারপোলের কাছে ‘অফিশিয়ালি’ বাংলাদেশ পুলিশ বেনজীরকে গ্রেপ্তারে সহযোগিতা চেয়েছিল বলে জানা গেছে। গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরের একজন এআইজি খবরের কাগজকে বলেন, ইন্টারপোলের পলিসি অনুসারে কিছু ক্ষেত্রে কোনো আসামির নাম বা ছবি তালিকায় না রেখে অপ্রকাশিত রাখা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বেনজীর আহমেদ ইন্টারপোলের রেড নোটিশ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তার নাম বা ছবি দেখা যায়নি।

এ কারণে দুবাইয়ে ‘বিপুল অর্থসম্পদ’ বিনিয়োগের তথ্য থাকা বেনজীর আহমেদ সেখানে গ্রেপ্তার হওয়ায় অন্য আলোচিত আসামিদের মধ্যেও এক ধরনের শঙ্কা বিরাজ করছে বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ইন্টারপোলের তালিকায় থাকা বা পলাতক হিসেবে বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে থাকা গুরুতর ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলার আসামিরা অনেকটা আতঙ্কগ্রস্ত বলে মনে করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এই ধরনের আসামি যারা রয়েছেন, তাদের মধ্যে ভীতি বা আতঙ্ক কাজ করবে। অনেকেই যারা আত্মগোপনে রয়েছেন, তারা একই জায়গায় বেশি দিন থাকবেন না। তারা গ্রেপ্তার এড়াতে অবস্থান পাল্টাবেন–এগুলো স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, ‘আমি মনে করি, এই ধরনের (বেনজীর) আসামি যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, ক্ষমতার চেয়ারে বসে রাষ্ট্রকে বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন– তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া জরুরি। কেননা, শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তা অন্যদের জন্য সতর্ক বার্তা বা শিক্ষণীয় হবে।

একই সঙ্গে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জায়গাগুলো আরও মজবুত হবে। ফলে বিদেশে গ্রেপ্তারেই যেন সবকিছু থমকে না থাকে। দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে আইনানুসারে যথাযথ বিচার বা শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল এই প্রক্রিয়ার সার্বিক সুফল পাওয়া যাবে।

এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় বা প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তারা ক্ষমতার চেয়ারে বসে বেপরোয়া দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা বা অপেশাদার আচরণ করেন–এমন কর্মকর্তাদের জন্য সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তারের ঘটনাটি অবশ্যই শিক্ষণীয়।

যদিও এমন বিভিন্ন ঘটনা থেকেও অনেকে শিক্ষা নেন না। তার পরও পুলিশ, প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রেই কর্মকর্তাদের দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচারিতা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সরকারের জবাবদিহিমূলক কঠোর অবস্থান জারি রাখতে হবে। এতে সরকারের সঙ্গে জনগণের সুসম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি (মহাপরিদর্শক) আব্দুল কাইয়ুম খবরের কাগজকে বলেন, প্রতিটি সরকারি চাকরিতে বা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্ধারিত রুলস বা বিধিবিধান রয়েছে। কিন্তু অনেকেই সেটি মনে রাখেন না। চেয়ার পেলেই অনেকেই হয়ে যান লাগামছাড়া। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও অপেশাদার আচরণ তাদের এমনভাবে বাড়তে থাকে, যা সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ ও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কিন্তু সবার মনে রাখা দরকার, কোনো চেয়ার বা ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। সেটা মাথায় রেখে শুধু পুলিশ কর্মকর্তা নন, যেকোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। যাতে করে ভবিষ্যতে অসম্মানজনক পরিণতির শিকার হতে না হয়।

ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘রেড নোটিশ’ বা লাল সংকেতের তালিকাটি হচ্ছে–বিশ্বব্যাপী আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে কোনো ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে এবং প্রত্যর্পণ, আত্মসমর্পণ বা অনুরূপ আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে তাকে সাময়িকভাবে গ্রেপ্তার করার একটি অনুরোধ। তবে রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মূলত অনুরোধকারী সদস্য দেশ বা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল দ্বারা ‘ওয়ান্টেড’। সদস্য দেশগুলো কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের নিজস্ব আইন প্রয়োগ করে। অধিকাংশ রেড নোটিশ শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ।

গতকাল পর্যন্ত ইন্টারপোলের রেড নোটিশের তালিকায় থাকা ৫৯ জন বাংলাদেশি হলেন–

রাজু ঢালি (৪২), মো. মিলন (৩৭), লিটন ব্যাপারী (৪৭), রবিউল ইসলাম রবিউল ওরফে আরাভ খান (৩৮), জাফর ইকবাল (৪৪), তানজিরুল (৪১), স্বপন (৩৪), নজরুল ইসলাম মোল্লা (৪৯), মিন্টু মিয়া (৪৭), ওয়াসিম (৪১), খোরশেদ আলম (৪৩), গিয়াস উদ্দিন (৫৬), অশোক কুমার দাস (৪৫), মিজান মিয়া (৪৮), কুমার চন্দ্র রায় (৪৬), রাতুল আহমেদ বাবু (৪৫), মো. সিরাজ মোস্তফা লালু (৩০), জাহিদ হোসাইন খোকন (৮৪), মো. সাঈদ হোসাইন ওরফে হোসেন (৭৪), মো. হাছান আলী সাঈদ ওরফে সৈয়দ মো. হাছান আলী (৭৮), আজিজুর রহমান (৫০), অজয় বিশ্বাস (৪৪), তরিকুল ইসলাম (৩৯), এন এ হানিফ (৪১), আলাউদ্দিন মোহাম্মদ (৫৩), মোহাম্মদ সবুজ ফকির (৫১), মোহাম্মদ মনির ভুঁইয়া (৬২), শফিকুল (৫৮), আমান উল্লাহ শফিক (৪৪) আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার (৭৯), জাহিদুল ইসলাম (৭০), সাজ্জাদ হোসাইন খান (৪৭), মো. নাঈম খান ইকরাম (৫৭), কালা জাহাঙ্গীর ওরফে ফেরদৌস (৪৮), মো. ইউসুফ (৭৯), আব্দুল আলিম শরীফ (৫৬), আহমেদ মজনু (৫৩), নুরুল দিপু (৪৯), মুহাম্মদ ফজলুল আমিন জাভেদ (৩৮), এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী (৭৫), খন্দকার আবদুর রশিদ (৭৯), নাজমুল হোসেন আনসার (৭৩), শরিফুল হক ডালিম (৮০), আহমেদ শরিফুল হোসেন (৮৩), মুসলেম উদ্দিন খান (৮৮), এ এম রাশেদ চৌধুরী (৭৯), চৌধুরী মোহাম্মদ আতাউর রহমান (৬৪), আলহাজ মাওলানা মোহাম্মদ তাজউদ্দিন মিয়া (৫৩), সালাউদ্দিন মিন্টু (৪৬), গোলাম ফারুক অভি (৬০), হারুন শেখ (৫৫), তৌফিক আলম (৫১), আহমেদ জাফর (৫৬), রফিকুল ইসলাম (৫৫), জিসান আহমেদ (৫৬), আমীনুর রসুল (৬৮), নবী হোসেন (৫৬), প্রকাশ কুমার বিশ্বাস (৫৩) এবং আব্দুল জব্বার (৫৪)।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব নিয়োগ হয়নি তিন মাসেও

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬, ১২:৫৭ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব নিয়োগ হয়নি তিন মাসেও
ছবি: সংগৃহীত

প্রায় তিন মাস ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব পদ শূন্য রয়েছে। দীর্ঘ এ সময়ে এই পদে নিয়োগ না হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে নতুন সরকারের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম। দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও)। সরকারের নীতি বাস্তবায়ন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সমন্বয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ কার্যালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সচিব পদ শূন্য থাকলেও কার্যালয়ের কার্যক্রম থেমে নেই। তবে পূর্ণকালীন সচিব না থাকায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নথি নিষ্পত্তি এবং সমন্বয়মূলক কিছু কর্মকাণ্ডে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত সময় লাগছে। মুখ্য সচিব অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব পদটি কেবল একটি প্রশাসনিক পদ নয়; এটি সরকারের কেন্দ্রীয় সমন্বয় ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। মুখ্য সচিব নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলো তদারকি করলেও সচিবের ওপর দৈনন্দিন প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প তদারকি, কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যবস্থাপনা এবং দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার বড় দায়িত্ব থাকে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এ পদ শূন্য থাকাকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন না অনেক কর্মকর্তা।

প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকার এমন একজন কর্মকর্তাকে খুঁজছে, যিনি দক্ষতা, সততা, পেশাদারত্ব এবং প্রশাসনিক গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবেন। সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক পদায়নে শুধু জ্যেষ্ঠতাই নয়, বরং অতীত কর্মজীবন, পেশাগত দক্ষতা, নিরপেক্ষতা এবং সরকারের আস্থার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে। এ কারণেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সময় লাগছে বলে মনে করছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

তারা জানান, গত কয়েক মাসে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম আলোচনায় এলেও এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানা গেছে। প্রশাসনের অভ্যন্তরে গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলে কর্মকর্তারা ধারণা করছেন।

অতীতে বিতর্ক বা পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ রয়েছে, এমন কর্মকর্তাদের বিষয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে বলে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এ পদে নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্টদের কর্মজীবনের নানা দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, অতীতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদায়নকে ঘিরে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার অপেক্ষাকৃত বেশি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। শুধু তদবির বা লবিংয়ের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের সুযোগ আগের তুলনায় অনেক সীমিত বলে তারা মনে করেন।

এদিকে সচিব পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় মুখ্য সচিবের ওপর বাড়তি কাজের চাপ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বের পরিধি এমনিতেই ব্যাপক। এর সঙ্গে সচিবের দায়িত্বের অতিরিক্ত অংশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাড়তি চাপে রয়েছেন মুখ্য সচিব। এতে প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ এই পদের শূন্যতা সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের গতিকে শ্লথ করে দিতে পারে। প্রশাসনসংশ্লিষ্টদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি কিছুটা কমে যেতে পারে এবং সমন্বয়মূলক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। 

দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব পদে নিয়োগের আলোচনায় কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম বিবেচনায় থাকলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। 

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এই পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকলেও এতে খুব বেশি অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কারণ সেখানে মুখ্য সচিব, যুগ্ম সচিব, পিএস রয়েছেন। তারা সবাই প্রশাসনের কর্মকর্তা। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী যেহেতু সচিবালয়ে অফিস করছেন, তাই সেখানে হাতের কাছে মন্ত্রিপরিষদ সচিবও রয়েছেন। আমি মনে করি, হঠাৎ করে বা তড়িঘড়ি করে এই পদে কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে বিব্রত হওয়ার চেয়ে একটু দেখেশুনে অপেক্ষা করে যোগ্য কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়াই শ্রেয়তর হবে।

পরিদর্শন নেই, অরক্ষিত রেলপথ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬, ০৯:৩০ এএম
পরিদর্শন নেই, অরক্ষিত রেলপথ
ছবি: খবরের কাগজ

কাগজে-কলমে জনবল শতভাগ পূর্ণ থাকলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে তাদের দেখা মেলে না। নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকির অভাবে অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে রেলপথ, যার ফলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের রেল দুর্ঘটনা। দায়িত্বে অবহেলা করলেও কর্মকর্তাদের নিয়মিত ‘মাসোহারা’ বা উৎকোচ দেওয়ার কারণে চাকরি হারানোর কোনো ঝুঁকি থাকে না। বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে (সিআরবি) এ ধরনের অনিয়মই যেন এখন এক স্বাভাবিক চিত্র।

কতিপয় কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের যোগসাজশে ভেঙে পড়েছে সিআরবির চেইন অব কমান্ড, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। সিআরবির বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

কাজ না করে হাজিরা, প্রশাসনের চোখে ধুলো

সিআরবির আওতাধীন উচ্চমান উপসহকারী প্রকৌশলী (এসএসএই-ওয়ে) এবং চট্টগ্রাম বন্দরসংলগ্ন রেলওয়ের প্রধান পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনার ইয়ার্ডের (সিজিপিওয়াই) অধীনে মোট ১৪টি ওয়ার্কিং টিম বা গ্যাং কাগজে-কলমে পূর্ণাঙ্গ জনবল নিয়ে চলছে। সূত্র বলছে, এখানে কোনো শূন্যপদ নেই।

এ ছাড়া মিরসরাইয়ের চিনকি আস্তানায় ১৪টি, ফেনীতে ১৪টি, লাকসামে ১৪টি এবং কুমিল্লায় ১৪টি গ্যাং চালু রয়েছে। প্রতি গ্যাংয়ে মেইট, কিম্যান ও ওয়েম্যানসহ সর্বোচ্চ ১১ জন এবং সর্বনিম্ন ৯ জন সদস্য থাকার কথা।

কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অধিকাংশ ওয়েম্যান লাইনে নিয়মিত কাজ করছেন না। তারা সহকারী প্রকৌশলী চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী-৩, চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের দপ্তরসহ সিআরবির বিভিন্ন অফিসে কর্মরত।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী-১-এর অধীনে গ্যাং নং ১৪-তে মাত্র ৩-৪ জন কর্মী কাজ করছেন। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বাংলাবাজার এলাকায় এসআরভি রেলস্টেশনে সিজিপিওয়াই গ্যাংয়ের অধীনে ৯ জন রেলপথকর্মী নিয়োজিত থাকার কথা। কিন্তু তার বিপরীতে কাজ করতে দেখা গেছে মাত্র ১ জন ওয়েম্যানকে। অন্য গ্যাংয়ে ১১ জনের বিপরীতে কাজ করতে দেখা গেছে মাত্র ২ থেকে ৩ জনকে। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী এসব জেনেও কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না বলে রেলওয়ে মহাপরিচালকের দপ্তরে অভিযোগ জমা পড়েছে।

রেলের পূর্বাঞ্চলের (চট্টগ্রামের মিরসরাই) চিনকি আস্তানার ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী এবং ফেনীর সহকারী প্রকৌশলী কার্যালয়ের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রেলপথ তদারকি কার্যক্রমে তারা দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করছেন না। একই চিত্র দেখা গেছে, এসএসএই (ওয়ে)-চট্টগ্রাম ও এসএসএই (ওয়ে)-ষোলশহরসহ প্রতিটি দপ্তরে। প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে এই নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে রেলপথ। এর আগে ২০২৪ সালে রেলওয়ের মহাপরিচালক দপ্তর থেকে ওয়েম্যানদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরার আদেশ জারি করা হয়েছিল। কিন্তু সে নির্দেশ মানেননি রেলের অসাধু কর্মচারীরা। এতে যারা রেলপথে নিয়মিত কাজ করছেন, তাদের ওপর বাড়তি কাজের চাপ পড়ছে।

ওয়েম্যানরাই রেলপথের মূল তদারককারী। তাদের অনুপস্থিতিতে লাইনের নাট-বল্টু ঢিলা হওয়া বা ফাটল শনাক্ত না হওয়ায় লাইনচ্যুত হওয়া ও বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়।

শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে ‘নিয়মিত মাসোহারা’

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসএসএই (ওয়ে), সিজিপিওয়াই এবং গ্যাং মেইটের (রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণকারী দল বা ‘গ্যাং’-এর দলনেতা) যোগসাজশে অনেক ওয়েম্যান বা গ্যাংম্যান গরহাজির থাকছেন। শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘মাসোহারা’ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই মাসোহারার জন্য গ্যাং মেইটদেরও ‘চাপে রাখা হয়’ বলে জানিয়েছেন ওয়েম্যানদের একাংশ।

চট্টগ্রাম গ্যাং নং ৮, ৯, ১০, ১১, ১২–এই ‘মাসোহারা সিস্টেম’-এর বিরুদ্ধে গ্যাং মেইটরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন।

কর্মস্থলে না গিয়েও বেতন-ভাতা তুলে নিচ্ছেন নিয়মিত

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগে রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ওয়েম্যানদের একটি বড় অংশ কর্মস্থলে না গিয়ে নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। লাইনে কঠোর শ্রম দেওয়ার কথা থাকলেও অনেকে বিভিন্ন নেতার দপ্তরে কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বাসাবাড়িতে অবস্থান করে মাস শেষে বেতন তুলছেন, আর মাসোহারা দিয়ে বছরের পর বছর চাকরি ধরে রেখেছেন।

রেলওয়ের মাঠপর্যায়ের একাধিক সাধারণ কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ফাঁকিবাজ কর্মীরাও রাতারাতি খোলস বদল করেন। বিগত সরকারের আমলে যারা আওয়ামী লীগের পরিচয় দিয়ে সুবিধা নিয়েছেন, তারা এখন শ্রমিক দলের নাম ভাঙিয়ে কিংবা তথাকথিত ‘সংস্কারপন্থি’ গ্রুপের ‘লেবাস’ ধরে একই ধারা বজায় রাখছেন।

কর্মচারীদের অভিযোগ, এই কর্মীরা সপ্তাহে বড়জোর এক দিন কিংবা ১৫ দিনে একবার এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে যান, যাতে কাগজে-কলমে তাদের অনুপস্থিতি ধরা না পড়ে। মাস শেষে ঠিকই তারা পুরো মাসের বেতন তুলে নিচ্ছেন। একে রেলওয়ে ও রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য বড় ধরনের লোকসান ও ক্ষতি হিসেবে দেখছেন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

একজন রেল কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ব্যক্তিগত লাভের জন্য একটা মানুষ পুরো রেলের ক্ষতি করছেন। অথচ এদের দেখার যেন কেউ নেই।’

নিয়মিত বিরতিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের নিয়ম থাকলেও কেন এই অনিয়ম ধরা পড়ছে না–এমন প্রশ্নে মাঠপর্যায়ের কর্মচারীরা জানান, রেলের ব্রিটিশ আমলের নিয়ম অনুযায়ী প্রধান প্রকৌশলীর ছয় মাসে একবার ট্রলিযোগে লাইন পরিদর্শনে আসার কথা। পূর্বাঞ্চলের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম কাজের বিষয়ে সচেতন হলেও এই পরিদর্শনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কর্মচারীরা বলছেন, এখন অনলাইনের যুগ। প্রধান প্রকৌশলী পরিদর্শনে বের হওয়ার আগেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে বার্তা পৌঁছে যায় যে ‘আগামীকাল স্যার ট্রলি করবেন’। ফলে পরিদর্শনের দিন সকাল সকাল সব ফাঁকিবাজ কর্মী লাইনে গিয়ে হাজির হন। তিনি পরিদর্শনে গিয়ে সবাইকে কাজ করতে দেখেন। কিন্তু তিনি চলে গেলেই পরিস্থিতি আবার আগের মতো হয়ে যায়।

সাধারণ কর্মচারীদের মতে, অনিয়মের মূল গোড়াটি রয়েছে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্তরে। স্থানীয় এসএসএই (সিনিয়র সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার) বা এইএন (অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার) পর্যায়ের কর্মকর্তারা যদি কঠোরভাবে তদারকি না করেন, তবে প্রধান প্রকৌশলীর একক সচেতনতা দিয়ে এই দীর্ঘদিনের ফাঁকিবাজির সংস্কৃতি বন্ধ করা সম্ভব নয়।

যা বলছেন প্রধান প্রকৌশলী

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, রেলওয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভ্যন্তরীণ এসব তথ্য বেশ সময়সাপেক্ষ। ফোনে সব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া মুশকিল। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। 
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, রেলপথে জনবলে নিয়োগ ও পরিচালনার পুরো বিষয়টি চট্টগ্রামের সহকারী কর্মকর্তা (এএন) পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ক্রমান্বয়ে বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিএন) এবং প্রধান পার্সোনেল অফিসার (সিপিও) উইংয়ের অধীনে পুরো পূর্বাঞ্চলের এই জনবল কাঠামো পরিচালিত হয়ে থাকে।

টেলিফোনে এই প্রশাসনিক কাঠামোর বিস্তারিত তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম বলেন, ‘টেলিফোনে আমি কোনো তথ্য দিতে পারব না। আপনি যদি চট্টগ্রামের কার্যালয়ে আসতে পারেন তবে ভালো, অন্যথায় স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’

খবরের কাগজের এই প্রতিবেদক পরে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের বার্তাও পাঠান। কিন্তু তারা কেউ সাড়া দেননি। ঢাকায় রেল ভবনের প্রধান পার্সোনেল কর্মকর্তা জাকির হাসানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে।’ বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীনও খবরের কাগজের বার্তায় কোনো সাড়া দেননি।

গৌরীপুর ও মুক্তাগাছায় পানির প্রকল্প: ২ বছরে অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪২ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
গৌরীপুর ও মুক্তাগাছায় পানির প্রকল্প: ২ বছরে অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার পাইকেশমোড়ে ‘লার্জ পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম’ প্রকল্পের কাজ মেঝে পর্যন্ত হয়েই বন্ধ রয়েছে। ছবি: খবরের কাগজ

গ্রামীণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল সাড়ে ১২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। ১৮ মাসের মধ্যে এই পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রায় দুই বছর পার হয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের বড় অংশের বিল তুলে নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী কার্যাদেশ বাতিলের জন্য প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় ‘লার্জ পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে। দুই উপজেলায় বাস্তবায়ন হতে যাওয়া এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ১২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নূর অ্যান্ড কোং এই কাজ পায়।

সম্প্রতি সরেজমিনে গৌরীপুর উপজেলার পুম্বাইল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। সেখানে কোনো শ্রমিক নেই। নির্মাণকাজের কোনো তৎপরতাও দেখা যায়নি। গৌরীপুরে শুধু একটি ঘরের আংশিক ইটের গাঁথুনি দাঁড়িয়ে আছে।

মুক্তাগাছার পাইকেশ মোড় এলাকায় প্রকল্প স্থানে গিয়েও দেখা যায়, নির্মাণকাজ কেবল মেঝে পর্যন্ত হয়েছে। অথচ দপ্তরের নথিতে কাজের অগ্রগতি ২০ শতাংশ দেখানো হচ্ছে।

বাস্তবে কাজের অগ্রগতি খুব কম হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বড় অঙ্কের বিল তুলে নিয়েছে। কত টাকা ছাড় করা হয়েছে, সেই তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রকল্প ব্যয়ের মোটা অংশ এরই মধ্যে ঠিকাদারের হাতে চলে গেছে।

ময়মনসিংহ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদারকে একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় কার্যাদেশ বাতিলে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে রহস্যজনক কারণে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় গৌরীপুর এবং মুক্তাগাছায় পাম্প স্থাপন ও ট্যাংক নির্মাণ শেষ হলে মোট ৭০০ পরিবার বিশুদ্ধ পানি পাবে। উপকারভোগীরা মিটার অনুযায়ী পানির বিল পরিশোধ করবেন। স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করেই মাসিক বিল নির্ধারণ করা হবে। 

কিন্তু প্রকল্প এলাকার বাসিন্দারা জানান, এ বিষয়ে তারা তেমন কিছু জানেন না। কেউ তাদের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে লোকমুখে তারা জেনেছেন পানি সরবরাহের জন্য পাম্প স্থাপন করা হবে। মাসে ১০০ টাকার বিনিময়ে পানি ব্যবহার করতে পারবেন গ্রামের মানুষ।

গৌরীপুরের পুম্বাইল গ্রামের বাসিন্দা আজিজ মিয়া বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে মোটর আছে। বিশুদ্ধ পানিই খাই। আবার সরকারি পানি নেওয়ার দরকার কী?’ মুক্তাগাছার পাইকেশমোড় এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ আলী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নামেমাত্র কাজ হয়। পরে আবার বন্ধ হয়ে যায়। এলাকার মানুষও এখন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।’

মুক্তাগাছা প্রকল্পে কাজ করা শ্রমিক শফিকুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের সঙ্গে ২৬ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে। কিন্তু নির্মাণসামগ্রী সময়মতো সরবরাহ না করায় কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। রড, সিমেন্টসহ প্রয়োজনীয় মালামাল ঠিকমতো না এলে কাজ এগোবে না।

নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, মুক্তাগাছা ও গৌরীপুরের এই প্রকল্পের জমি কেনা হয়নি। দুটি ইউনিটেই জমি নেওয়া হয়েছে স্থানীয়দের দানের মাধ্যমে। ফলে জমি পেতেই অনেক সময় লেগে যায়। এরপর কাজ শুরু হলেও তা চলছে ধীরগতিতে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর ঠিকাদার দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেন। কিন্তু সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক নূর আলম টিটু কাজের ধীরগতির কথা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি দাবি করেন, কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি। বিল উত্তোলনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেননি। তবে ঠিকাদারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বিল উত্তোলনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল হোসেনের দায়িত্বে থাকাকালীন এই প্রকল্প শুরু হয়েছিল। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন। এরপর একাধিকবার চেষ্টা করলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ময়মনসিংহ বিভাগের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হক স্বীকার করেন, ঠিকাদারকে বারবার মৌখিক ও লিখিত তাগাদা দেওয়া হয়েছে। অগ্রগতি না হওয়ায় কার্যাদেশ বাতিলে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অর্থবিল বিশ্লেষণ: পার পাচ্ছেন সম্পদশালীরা

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:০১ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:০৩ এএম
অর্থবিল বিশ্লেষণ: পার পাচ্ছেন সম্পদশালীরা
বাজেট ২০২৬-২০২৭

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খুব কায়দা করে প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব জাল বিছিয়েছেন। মোটাদাগে এ জালে সাধারণ মানুষকেই আটকে ফেলে বড়দের এড়িয়ে গেছেন। সম্পূরক শুল্ক কমবেশি করে হাজারের বেশি পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। ব্যবসায়ী অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির টানাপোড়নেও দেশি শিল্প বিকাশের অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে ছাড় দিলেও ছেড়ে দিলেন না। করপোরেট করহার বাড়ালেন না। 

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের অর্থবিল বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য মিলেছে। 

অর্থবিলে উপজেলা থেকে পাড়ার মোড়ের দোকানও ভ্যাটের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ওপর দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। এতে প্রতি ১ হাজার টাকায় ২ টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে। 

অর্থবিলে সাধারণ মানুষ রাজস্ব পরিশোধ না করলে বিদ্যমান আইনের কঠোরতা বহাল রাখা হয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা আগামী পাঁচ অর্থবছর কয়েক ধাপে বাড়ানোর কথা বলে বাহবা পাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আগামী অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে মাত্র ২৫ হাজার টাকা, যা মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের জন্য তেমন স্বস্তির হবে না। অথচ সম্পদশালীদের কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার বন্ধ করতে সেই পুরোনো ঢিলেঢালা পথেই হেঁটেছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের মতো বিভিন্ন দূতাবাসে রাজস্ব দপ্তর স্থাপন করে বিদেশে পাচারকারীদের সম্পদ চিহ্নিত করা এবং সেই দেশে আইন (ল ফার্ম) সংস্থা নিয়োগে পদক্ষেপ নিতে খোদ এনবিআরের সুপারিশ থাকলেও তা বাজেটে আনা হয়নি।

ঋণদানকারী সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) খুশি করতে অর্থবিলে রাজস্ব অব্যাহতির সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। এতে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বাড়লেও জনজীবনে চাপ কমবে না, বরং বাড়বে। 

এতদিন ই-টিআইএন নিয়েও অনেকে করযোগ্য আয় না থাকলে শুধু রিটার্ন দাখিল করেছেন, একটি টাকার কর দিতে হয়নি। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত অর্থবিল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, করদাতার আয় যা-ই হোক না কেন, অতি জরুরি অনেক সেবা নিতে হলে শুধু ই-টিআইএন থাকলেই হবে না, রিটার্ন জমার বাধ্যবাধ্যকতায় কঠোরতা আনা হয়েছে। শূন্য রিটার্ন নিরুৎসাহিত করে শূন্য রিটার্নধারীর আয়-ব্যয় খতিয়ে দেখার আইনি বিধান আনা হয়েছে। 

অর্থবিলে ব্যাংক হিসাব খুলতে ও ব্যাংকঋণ পেতে, পাসপোর্ট করতে, বিদেশ ভ্রমণ সম্পর্কিত কাগজপত্র সংগ্রহ করতে, বাড়ি, ফ্ল্যাট বা জমি কেনা, গাড়ি কেনা এবং এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র নবায়ন করা থেকে যেকোনো ব্যবসায়ে লাইসেন্স পাওয়া বা নবায়ন করতে ই-টিআইএন নেওয়া ও রিটার্ন জমার পক্ষে প্রমাণপত্র জমায় কঠোরতা থাকছে। বাড়ির গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন ইউলিটি সংযোগ নেওয়া থেকে এককালীন ৩ লাখ টাকার বেশি মূল্যের সোনা, মুক্তা বা মূল্যবান গহনাসহ যেকোনো কেনাকাটায়ও একই কঠোরতা থাকছে। অর্থবিলে সরকারি সব কাজে বা সেবা পেতে বাধ্যতামূলকভাবে ই-টিআইএন ও রিটার্ন দাখিলের পক্ষে প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। 

আগামী প্রস্তাবিত অর্থবিলে হিমায়িত মাছ, গুঁড়া দুধ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, মাখন, টমেটো, তাজা বা শুকনা আঙুর, কমলালেবু, আম, লেবুসহ প্রায় সব ধরনের ফল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। সব ধরনের বিস্কুট, চকলেট ও ময়দাজাতীয় খাবার আমদানিতেও শুল্ক বাড়ানো হতে পারে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়বে।

আয়কর অধ্যাদেশের ৬৮৮বি ধারা অনুসারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা (বিআরটিএ) ১৯৮৪ ধারায় ব্যক্তিগত যানবাহনের মালিকদের কাছ থেকে যানবাহন নিবন্ধন বা বার্ষিক ফিটনেস নবায়নের জন্য অগ্রিম আয়কর সংগ্রহ করে থাকে। ধাপে ধাপে এই অগ্রিম কর বাড়ানো হয়েছে। আগামীতে এই কর কমানোর আবেদন জানালেও অর্থবিলে গাড়ির ইঞ্জিনের ধারণক্ষমতা এবং গাড়ির মডেলের ধরনের ওপর অগ্রিম কর আগের মতোই বেশি থাকছে। 

সাধারণ আয়ের অনেক করদাতা বলেছেন, খাবারের খরচ অনেক বেড়েছে। বাসা ভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা সবকিছুই এখন বেশি। এর মধ্যে সাধারণ আয়ের মানুষের ওপর কর পরিশোধে চাপ দেওয়া হলে ভোগান্তি বাড়বে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, বাজেট বক্তৃতায় অনেক কিছু আনা হয়নি। কিন্তু অর্থবিলে উল্লেখ করা হয়েছে। সমালোচনা এড়াতেই সরকার এটা করেছে। 

অর্থবিলে সৃজনশীল অর্থনীতি হিসেবে অনেক খাত নতুনভাবে যুক্ত করে করের আওতায় আনা হয়েছে। 

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সৃজনশীল খাত হিসেবে বিদেশে সরকার অনেক অর্থ আয় করে। ভারতেও এমন ব্যবস্থা আছে। 

অর্থবিল থেকে জানায় যায়, সৃজনশীল খাত হিসেবে উপজেলা পর্যায়ের কুটির শিল্প উৎপাদনকারীকেও আগামী অর্থবছর থেকে কর দিতে হবে। নাটক, সিনেমা বা স্টেডিয়ামে খেলা দেখার টিকিটেও কর বসানো হয়েছে। এমনকি কেউ কোনো রিসোর্টে বেড়াতে গেলেও বাড়তি কর গুনতে হবে।