সিরাজগঞ্জ জেলা জজ আদালত ও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দুই বছর আগে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষার হলে পরীক্ষা না নিয়ে নিয়োগ কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারকরা নিজেদের খাসকামরায় পছন্দের প্রার্থীদের বসিয়ে ‘গোপন পরীক্ষা’ নিয়েছিলেন। সেই গোপন পরীক্ষার ছবি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, নিয়ম অনুযায়ী সিরাজগঞ্জ জেলাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের জেলার (ব্রাক্ষণবাড়িয়া) বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দিয়ে কারচুপির মাধ্যমে ৩৪ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা নিয়ে সিরাজগঞ্জ আদালতপাড়ায় তোলপাড় চলছে। বঞ্চিত ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাত ভুক্তভোগী সিরাজগঞ্জ সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালতে এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তারা হলেন জাফর ইমাম, মঞ্জুর আলম, আকাশ সাহা, বিপুল রাহা, রিজন আহম্মেদ, শাহিন রেজা ও শিহাব উদ্দিন। তাদের লিখিত অভিযোগসহ দুর্নীতির কিছু নথিপত্র ও ভাইরাল হওয়া ছবি খবরের কাগজের হাতে এসেছে।
তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে সিরাজগঞ্জ জেলা জজ আদালত ও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সাঁটমুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর, প্রসেস সার্ভার, অফিস সহায়ক, নাজির, হিসাবরক্ষক, বেঞ্চ সহকারী, ক্যাশিয়ার, লাইব্রেরি সহকারী, অফিস সহায়ক, নৈশপ্রহরীসহ ৩৪ জন কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত নিয়োগসংক্রান্ত বাছাই কমিটি। ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল লিখিত পরীক্ষা ও ২৬ জুন মৌখিক পরীক্ষার দিন ধার্য করে কমিটি। নিয়োগ কমিটির প্রধান ছিলেন সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফজলে খোদা নাজির (বর্তমানে রংপুরে কর্মরত)। নিয়োগ, বাছাই ও পরীক্ষা গ্রহণসংক্রান্ত কমিটির সদস্য ছিলেন সদরের সিনিয়র সহকারী জজ মিনহাজ উদ্দিন ফরাজী এবং যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ তানবীর আহম্মেদ। কমিটির সভাপতি ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ বেগম সালমা খাতুন। এ বিষয়ে কেউই এখন মুখ খুলতে চাচ্ছেন না।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগে জানা যায়, চাকরিপ্রাপ্তদের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার রয়েছেন ২২ জন। অথচ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সিরাজগঞ্জ জেলার প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলা ছিল। কিন্তু পরীক্ষায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রার্থীরা যাতে বেশি নম্বর পেতে পারেন, সে জন্য বিচারকদের খাসকামরায় বসিয়ে তাদের পরীক্ষা নেওয়া হয়। ক্ষমতাবলে এই দুর্নীতিতে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও তৎকালীন সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফজলে খোদা নাজিরের হাত রয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে গোপন পরীক্ষার ছবি ফাঁস হওয়ার পর শাহজাদপুরের সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের নাজির রবিউল হাসান, তাড়াশের সহকারী জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী মুনতাছির মামুন ও কাজীপুরের সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী সাব্বির হোসেনের চাকরি স্থায়ীকরণ আটকে যায়। তবে আগেই ৩১ জনের চাকরি স্থায়ী হয়ে যায়। ভুক্তভোগীরা সবার নিয়োগ বাতিল ও পুনরায় পরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী চাকরি প্রার্থী সিহাব উদ্দিন বলেন, ‘আদালত হচ্ছে একটি বিশ্বাসের জায়গা, আস্থার জায়গা। সেই আদালত যদি এমন হয় তাহলে আমরা কোথায় যাব? ভাবতে অবাক লাগে সিরাজগঞ্জের একটি নিয়োগ, যেখানে বলা আছে স্থায়ী বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অথচ বেশির ভাগ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার বাসিন্দাদের। ন্যায্য অধিকার থেকে যদি বঞ্চিত করা হয়, তাহলে তো অনেক কষ্ট লাগে। কেউ অপরাধ করলে সর্বশেষ আদালতে আসেন। আর সেই আদালতের জায়গায় আমরা প্রতারিত হচ্ছি।’
আরেক ভুক্তভোগী চাকরিপ্রার্থী জাফর ইমাম বলেন, ‘মেধাতালিকায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও ভাইভা বোর্ড থেকে আমাকে বের করে দেওয়া হয়। ব্রাক্ষণবাড়িয়ার প্রার্থীদের বেশির ভাগ চাকরি দেওয়া হয়। সিরাজগঞ্জের বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার না দিয়ে ব্রাক্ষণবাড়িয়া লোকজনকে কেন এত মূল্যায়ন করা হয়েছে তা বুঝে আসে না। এ নিয়োগে চরম দুর্নীতি হয়েছে, তা তদন্ত করে বের করা হোক।’
আরেক চাকরিপ্রার্থী রিজন আহমেদ বলেন, ‘সাবেক আইনমন্ত্রী ও আইন সচিবের হস্তক্ষেপে নিয়োগ কমিটির সদস্যরা ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার প্রার্থীদের আলাদা রুমে খাতা দেখে লেখার সুযোগ দিয়ে চাকরি দিয়েছেন। লিখিত পরীক্ষা যথাযথভাবে উত্তীর্ণ হয়ে ভাইভা পরীক্ষায় দুই মিনিট রেখে আমাদের বের করে দেওয়া হয়েছে। যারা মেধাবী ও যোগ্য ছিলাম তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ এই নিয়োগ বোর্ডে যারা জড়িত তারা দুর্নীতিতে জড়িত। বর্তমান আইন উপদেষ্টার কাছে সঠিক তদন্ত ও বিচার চাই।’
পরীক্ষার ছবি ভাইরাল ও বিষয়টি জানাজানি হলে তাড়াশের সহকারী জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী মুনতাছির মামুন, শাহজাদপুরের সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের নাজির রবিউল হাসান ও কাজিপুরের সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী সাব্বির হোসেনের সঙ্গে যোগযোগ করলে তারা জানান, এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী শিক্ষার্থী ইমন হোসেন বলেন, ‘৩৪ জনের মধ্যে ২২ জনই যদি ব্রাক্ষণবাড়িয়ার জেলার বাসিন্দা হয়, তাহলে সিরাজগঞ্জবাসী হিসেবে আমরা কীভাবে অগ্রাধিকার পেলাম। এখানে চাকরিপ্রার্থীরা চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। তাই এই নিয়োগ বাতিল করতে হবে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আনজারুল হক বলেন, ‘এখানে সাবেক আইনমন্ত্রী ক্ষমতাবলে এ নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন। আমাদের আইনের প্রতি যে বিশ্বাস আর আস্থা আছে, তা আমরা দিনে দিনে আমরা হারিয়ে ফেলছি। অর্ন্তবর্তী সরকারের কাছে আমাদের দাবি, সরকারি চাকরি সিন্ডিকেট ও নিয়োগ বাণিজ্য ভেঙে দিয়ে মেধাকে ও মেধাবীদের যেন মূল্যায়ন করা হয়।’
এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী শহীদুল ইসলাম বলেন, দেশের সব মেধাবী কি শুধু ব্রাক্ষণবাড়িয়ার? আমাদের সিরাজগঞ্জ জেলাসহ আশপাশের জেলার চাকরি প্রার্থীদের কি কোনো মেধাই ছিল না। এ নিয়োগ কমিটিতে যারা ছিলেন, তাদের মাধ্যমে বেআইনি কার্যক্রম হয়েছে। এর একটি সঠিক তদন্ত হওয়া দরকার। জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা দরকার।
সিরাজগঞ্জ স্বার্থরক্ষা সংগ্রাম কমিটি সদস্য সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, দ্রুত নিয়োগ বাতিল করে মেধাবীদের মূল্যায়ন করতে হবে। সাবেক আইনমন্ত্রী সাবেক ও আইনসচিবসহ এই নিয়োগে যারা অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
বিষয়টি নিয়ে সাবেক সিনিয়র জেলা জজ, বর্তমান সিনিয়র জেলা জজ ও নিয়োগ কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা প্রধান বিচারপতির অনুমতি ছাড়া কথা বলতে পারবেন না বলে জানান।