মাত্র এক বছরের মধ্যে নবম শ্রেণিতে বিভাগ বিভাজনের বিষয়টি ফিরে আসায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন অংশীজনরা। বিগত সরকার তাদের প্রণীত নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ে বিভাগ বিভাজনকে বাদ দিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার আবার ২০২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে এটি চালুর নির্দেশ দিয়েছে। এভাবে হুটহাট পরিবর্তন না করে একটি শিক্ষানীতি চূড়ান্ত করে তার আলোকে ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তন আনার পক্ষে মত দিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। শিক্ষার সব ধরনের পরিবর্তনের সময় শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের অভিমত নেওয়ার ওপরও জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘যারা এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তাদের অংশীজনদের সঙ্গে বসা উচিত। এই অংশীজন হচ্ছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক। কিন্তু এটা (বিভাগ বিভাজন) এখন ঘোলাটে হয়ে গেছে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্তটা নিতে হবে। শুধু মহানগরের অভিভাবক নন, প্রান্তিক পর্যায়ের অভিভাবকদের মতামত নেওয়াও জরুরি। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ আসলে কী চায়, যা আমরা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি, তার জন্য শিক্ষকরা প্রস্তুত কি না, এসব বিবেচনায় নিতে হবে। কিন্তু আমরা না ভেবে ওপর থেকে গৃহীত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিই। নতুন বাংলাদেশে এটা হওয়া উচিত নয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, বিদায়ী সরকারের কারিকুলামে বলা হয়েছিল বিভাগ বিভাজন থাকবে না। এখন বলা হচ্ছে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। কারিকুলাম তো পেছন দিকে হাঁটা না। একে সময়ের প্রয়োজন অনুসারে পুনর্বিন্যস্ত করতে হয়। নতুন কিছু করতে হলে আগে শিক্ষানীতি তৈরি করতে হবে। এরপর কারিকুলাম। কিন্তু এসব না করে যখন হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেটি তো ভুল সিদ্ধান্ত। এখন যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো বলা যাবে যে, এটিই ঠিক সিদ্ধান্ত।
তিনি বলেন, ‘সম্পূর্ণ জিনিসটিকে একটি আকৃতিতে নিয়ে আসতে হবে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী আমাদের কতজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ইতিহাসবিদ দরকার, সেটা আগে ঠিক করতে হবে। এরপরে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কতজন কোন বিভাগে পড়বে। আমাদের বাধ্যতামূলক শিক্ষার বয়স যদি বাড়াতে পারতাম, তাহলে আমরা বিভাগ বিভাজনকে পিছিয়ে নিতে পারতাম। এগুলো আসলে পলিসির সঙ্গে রিলেটেড।’
এই একই বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের কারিকুলাম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উম্মে মুস্তারী তিথি খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিক্ষায় পরিবর্তন আনতে হয় একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। দেখতে হয়, এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু এবং তা গ্রহণযোগ্য ও প্রয়োগযোগ্য কি না। নবম শ্রেণিতে যখন বিভাগ বিভাজন তুলে দেওয়া হয় তখন অভিভাবক মহলে এ নিয়ে আলোচনা ছিল। আমার মনে হয়, শিক্ষায় কোনো পরিবর্তন আনতে হলে গবেষণার ভিত্তিতে আনলে ভালো হয়। তাহলে শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে না।’
তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতির ওপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করে ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা-২০২১’। ২০২৩ সালে চারটি শ্রেণিতে (প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ এবং সপ্তম) বিতরণ করা হয় নতুন শিক্ষাক্রম অনুসারে প্রণীত বই। চলতি বছর দেওয়া হয় তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণির বই। পর্যায়ক্রমে ২০২৭ সালের মধ্যে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বই দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। ওই রূপরেখায় দেখা যায়, নবম শ্রেণির পাঠ্যসূচি বিভাগভিত্তিক (মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা) ছিল না। এর পরিবর্তে সবার জন্য নির্ধারণ করা হয় সমন্বিত অভিন্ন পাঠ্যসূচি। এতে ‘বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের’ ওপর গুরুত্ব দিয়ে সব শিক্ষার্থীর জন্য বিজ্ঞান, ইতিহাস, সামাজিক বিজ্ঞান ও ইংরেজি বিষয়গুলো পাঠ্য করা হয়।
কিন্তু ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার পূর্বের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ২০২৫ সাল থেকে বিভাগ বিভাজনের বিষয়টি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। যারা নবম শ্রেণিতে এ বছর ২০২১ সালের নতুন কারিকুলামে পড়েছে, তাদের এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে পুরোনো কারিকুলামের সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে।
বিভিন্ন ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, এই বিভাগ বিভাজনের বিষয়টি দেশভেদে বিভিন্ন রকম। এমনকি একই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যেও ভিন্নতা দেখা যায়। কোথাও এই বিভাজন রয়েছে, কোথাও নেই। অর্থাৎ মাধ্যমিক স্তর থেকে বিষয় বিভাজনভিত্তিক পঠন-পাঠন কোনো কোনো দেশে আছে, আবার অনেক দেশে নেই। দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল ও ভারতে অনেকটা বাংলাদেশের নতুন-২০২১ আদলে কারিকুলাম তৈরি করা হয়েছে। আবার অনেক দেশে বিষয় বিভাজন অনুসারে শিক্ষাদান করা হয়।
অংশীজনদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
২০২১ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পর অভিভাবকদের বড় একটি অংশ এর বিভিন্ন দিক নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল। তার মধ্যে এই বিভাগ বিভাজন বাদ দেওয়ার বিষয়টিও ছিল।
রাজধানীর কুর্মিটোলা উচ্চবিদ্যালয়ের এক ছাত্রের অভিভাবক নুরুন্নাহার খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার মতে, নবম শ্রেণিতেই বিভাগ বিভাজন হওয়া উচিত। কারণ বোর্ডের পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের অবশ্যই যেকোনো একটি বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন আছে।’
তবে বিভাগ বিভাজন ফিরে আসায় বেশি বিপাকে আছেন নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা। তাদের মতে, একটা বছর এক পদ্ধতিতে পড়ার পর নতুন পদ্ধতিতে ফেরাটা কষ্টকর। অনেকাংশে মানসিক হয়রানি। আবার এখন যারা সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে নতুন কারিকুলামে পড়ছে, তারাও একটা অভ্যস্ততার মধ্যে চলে আসছে। এখন আবার তাদের ২০১২ সালের কারিকুলামে পড়াশোনা করতে হবে। ফলে এই পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের খাপ খাওয়াতে সময় লাগবে বলে অনেক শিক্ষার্থী জানিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক খবরের কাগজকে বলেন, শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ওয়ার্কশপ বা কর্মশালা করা উচিত। শিক্ষার সঙ্গে মোটাদাগে চারটা পক্ষ আছে- কারিকুলাম প্রণয়নকারী পক্ষ, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। সবাইকে নিয়ে বসাটা জরুরি ছিল। তাদের অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই হতো যৌক্তিক।