প্রশাসনের শীর্ষ পদে নিয়মিত কর্মকর্তার (ইনওয়ার্ক) পদে হঠাৎ অনিয়মিত কর্মকর্তার (অফওয়ার্ক) নিয়োগ হওয়ায় সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। এতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নকাজ এবং প্রশাসন ও বিভাগের কাজ সমাপ্ত করতে সময় নষ্ট হচ্ছে। প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলছে ধীরগতিতে।
কর্মকর্তারাও রুটিন কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আবার কিছু মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব এবং মাঠ প্রশাসনের কয়েক জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ না থাকায় ওইসব মন্ত্রণালয়/বিভাগ ও জেলায় সরকারের সামগ্রিক উন্নয়ন কাজে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব খবরের কাগজকে জানান, সরকারের হঠাৎ পরিবর্তনে প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রেই একটা অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা, আতঙ্ক কাজ করছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কাজের গতি কম। কারণ পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ায় কাজের পরিবেশেরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বভাবতই গত সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা বুঝতে কিছুটা সময় নিচ্ছে প্রশাসন। এ কারণে এখন নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেই। তবে রুটিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে না। তা ছাড়া ইন ওয়ার্কে যেসব কর্মকর্তা ছিলেন, তাদের নিয়মিত প্র্যাক্টিস থাকায় অনেক কিছু সহজেই বুঝে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। আর এখন অনেক সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব আছেন, যারা অনেক দিন প্রশাসনের কাজ-কর্মে যুক্ত ছিলেন না। কয়েক বছর বা বেশ কিছু সময় তারা প্রশাসন থেকে বাইরে অর্থাৎ অফ ওয়ার্কে ছিলেন। তাই এসব কর্মকর্তার কাজ বুঝে নিতে সময় লাগছে। তবে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড।
গত সরকারের আমলে বঞ্চিত থাকা কর্মকর্তাদের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপ-সচিব এবং জেলা প্রশাসক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ৭ শতাধিক কর্মকর্তার তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের সচিব পদে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়াসহ মাঠ প্রশাসনে ১৮-২২ জন ডিসি প্রত্যাহার করে নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়া হবে। এ জন্য প্রায় দুই মাস আগ থেকে যোগ্য কর্মকর্তার খোঁজে তালিকা বাছাইয়ের কাজ চলছে।
জানা গেছে, চলতি সপ্তাহে স্থানীয় সরকারসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে সচিব এবং আট জেলায় ডিসি পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। ফলে প্রশাসনে আরও কিছু পরিবর্তন আসছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ পর্যন্ত ২৭ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সচিব পদে নতুন মুখ এসেছে। এর মধ্যে তিনজনের শুধু দপ্তর বদল হয়েছে। কেউ কেউ চুক্তিতে এসেছেন। কিছুদিন যাবৎ সরকারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সচিব পদ শূন্য রয়েছে। অতিরিক্ত সচিবরাই সেখানে রুটিন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। তবে সচিব পদে যোগ্যদের নিয়োগে অধিকতর যাচাই-বাছাই করছে সরকার। বিগত সরকারের মতো অন্তর্বর্তী সরকারের এই আমলেও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে বঞ্চিত ও পদোন্নতি প্রত্যাশী কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
এক মাস যাবৎ আট জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদ শূন্য রয়েছে। ফলে মাঠের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জটিলতা বাড়ছে। এর মধ্যে একটি বিভাগে বিভাগীয় সদরসহ চার জেলায় ডিসি নেই। সেখানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকরাই রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন। তাই সচিবের পাশাপাশি ডিসি পদে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদায়নে অধিকতর যাচাই-বাছাই করতে হচ্ছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সচিবের কয়েকটি পদ শূন্য রয়েছে। এগুলো শিগগিরই পূরণ করা হবে। সে জন্য যোগ্য কর্মকর্তাদের বাছাই করা হচ্ছে। সচিব পদ বেশি দিন শূন্য রাখা যাবে না। একইভাবে ডিসি পদেও নিয়োগ দেওয়া হবে।’
জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই কয়েকটি জেলায় ডিসি নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা ওঠে। যা পরবর্তী সময়ে বাতিল করতে হয়। এসব জেলায় এখনো ডিসি নিয়োগ না হওয়ায় সেখানে মাঠ প্রশাসনে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এরপরও যোগ্য কর্মকর্তাদের (উপসচিব) যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে ডিসি নিয়োগের কাজ করছে সরকার। পাশাপাশি সচিব পদেও নিয়োগ নিয়ে কাজ চলছে।
গত ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সচিব পদে বড় ধরনের রদবদল আনা হয়। বিগত সরকারের আমলে চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া সচিবদের বাতিল করা হয়। আর পদোন্নতি বঞ্চিত ছিলেন এমন কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে তিনজন সচিবের দপ্তর বদল হলেও বেশ কিছু সচিব পদ পূরণ করা হয়েছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রশাসনে নেতিবাচক চোখেই বরাবর দেখা হয়। বর্তমান সরকারের আমলেও নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব, জনপ্রশাসন, জননিরাপত্তা, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক, প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতের সরকারগুলোর পথেই হাঁটছে এ সরকার। ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের শেষ সময়ে প্রশাসনের দুই শীর্ষ পদসহ অন্তত ২৪টি পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ছিলেন অবসরে যাওয়া সাবেক আমলারা। এ নিয়ে প্রশাসনে একধরনের অস্বস্তি ছিল। আর বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েই উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এক দিনেই ১১ জন সচিবের চুক্তি বাতিল করে। পরে আরও কয়েকটি পদের চুক্তি বাতিল করে সরকার। এরপর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয় প্রশাসনে। তারা অধিকাংশই বিসিএস ১৯৮২ নিয়মিত ব্যাচের কর্মকর্তা (বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে বঞ্চিত)। এরপর ধাপে ধাপে আরও কিছু পদে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, হাসিনা সরকারের আমলে অনেকে রাজনৈতিক কারণে বঞ্চিত হয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে ধাপে ধাপে কিছু পদে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া দরকার। তবে বেশি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হলে পরবর্তী সময়ে অন্তত তিন থেকে পাঁচজন কর্মকর্তা পদোন্নতি বঞ্চিত হন। সেগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। যাতে প্রশাসনিক কাজকর্মে স্থবিরতা নেমে না আসে।
ডিসি ছাড়াই চলছে আট জেলা
ডিসি ছাড়াই চলছে দেশের আট জেলা। গত ১০ সেপ্টেম্বর ডিসি হিসেবে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার পর ১১ সেপ্টেম্বর তাদের মধ্যে আটজনের নিয়োগ বাতিল করায় এসব জেলার ডিসির পদ ফাঁকা হয়ে যায়। কাউকে পদায়ন না করায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকরাই রুটিন কাজ করছেন। জেলাগুলো হলো- রাজশাহী, নাটোর, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও দিনাজপুর।
অপরদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুর রউফ বলেন, দ্রুত পদায়ন দিতে তারা চেষ্টা করছেন। আপাতত ডিসি নিয়োগে নতুন করে আর কোনো ফিট লিস্ট করা হবে না। ডিসি নিয়োগের যে ফিট লিস্ট রয়েছে, সেখান থেকেই আট জেলায় ডিসি পদায়ন করা হবে।