মাছ কিনতে গিয়ে শুক্রবার (১ নভেম্বর) বেশ বিপাকে পড়েন রাজধানীর রামপুরার উলন রোড এলাকার বাসিন্দা সোহরাব চৌধুরী। মাছ কেনার পর বিক্রেতা স্বপন দাস কোনোভাবেই তাকে পলিথিনের ব্যাগ দিতে চাননি। মাছ কেটে কাগজের ঠোঙায় প্যাকেট করে নিয়ে যেতে অনুরোধ করেন তিনি। এ নিয়ে তার সঙ্গে বেশ কথা-কাটাকাটি হয় সোহরাব চৌধুরীর। কিন্তু স্বপনের সাফ কথা, ‘পুলিশ আইস্যা ঝামেলা বাধাইব। তারা বইল্যা গেছে, আমরা যেন পলিথিনে মাছ না দিই। এখন আইস্যা জরিমানা করলে, দোকান তুইল্যা দিলে দায়টা কার হইব?’
রামপুরা কাঁচাবাজারের এই চিত্র অবশ্য বেশি সময় ছিল না। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা সরে যেতেই ক্রেতারা পীড়াপীড়ি শুরু করেন পলিথিনের ব্যাগে তাদের মাছ বা সবজি দেওয়ার জন্য। একই চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ অন্য কাঁচাবাজারেও। এই অবস্থায় ক্রেতা-বিক্রেতার অসচেতনতায় গতকাল থেকে কাঁচাবাজারে পলিথিন বিক্রি বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যায়নি।
গতকাল বিকেলে রামপুরা কাঁচাবাজারে কথা হয় মাছ বিক্রেতা মোহাম্মদ রমজান মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পলিথিন ব্যবহারের নোটিশ আমরা আগেই পাইছি। কিন্তু কাস্টমাররাই তো কোনো কথা শুনতে চায় না। তাদের কথা, মাছ নিতে হইলে পলিথিনেই নেব।’
রমজানের দোকানে মাছ কিনতে আসা ইদ্রিস আলী বলেন, ‘মাছ কেটে নিয়ে যেতে হবে বাসায়। এখন যদি বিক্রেতা পলিথিন না দেয় তাহলে কি বাসা থেকে বাসন নিয়ে আসব? পরিস্থিতি তো সেই রকমই।’
মনোয়ারা বেগম নামে আরেক ক্রেতা বলেন, ‘পলিথিন পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সে জন্য পলিথিন বন্ধ সমর্থন করলাম। কিন্তু পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের পলিব্যাগ কি বাজারে অ্যাভাইলেবল?’
সরেজমিনে কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটে দেখা গেছে, সেখানে দেদার পলিথিন বিক্রি হচ্ছে। আনোয়ার নামে এক বিক্রেতা বলেন, ‘কাঁচাবাজার কি পলিথিন ছাড়া চিন্তা করা যায়? পলিথিনের চাহিদা সারা দিনই ছিল। আমার আয়ও বেশ ভালো।’
হামিদ স্টোরের বিক্রয়কর্মী মনোয়ার হোসেন ও চাটখিল স্টোরের রিয়াদ জানান, শুক্রবার থেকে কাঁচাবাজারে পলিথিন বিক্রি বন্ধে কোনো নোটিশ হয়নি। কিছুদিন আগে কিচেন মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতি মৌখিকভাবে পলিথিন নিষিদ্ধের কথা জানিয়েছিল। তবে বিক্রেতারা যে তাতে বিন্দুমাত্র সাড়া দেননি, তা দোকান মালিকরাই জানিয়েছেন খবরের কাগজকে। চাটখিল স্টোরের কর্মী রিয়াদ বলেন, ‘হুট করে পলিথিন বন্ধ করা যাইব না। মানুষরে তো আগে থিকা সচেতন করা লাগব। মুদি দোকানের মালামাল আমরা ঠোঙায় করে দেওয়া শুরু করেছি।’
লক্ষ্মীপুর স্টোরের কর্ণধার মো. আবুল কাশেম খান বলেন, ‘পলিথিনের বিকল্প কী হইবে, সেটা জানতে চাইছিলাম মালিক সমিতির কাছে। কিন্তু তারা কোনো কিছু জানায় নাই। বেশ কিছু মুদি দোকানি পলিথিনেই মালামাল দিয়েছে। অনেক দিনের অভ্যাস। এটা বদলাইতে হইলে তো কিছু সময় লাগবে। হুটহাট কোনো অভিযান ব্যবসায়ীরা মানবে না।’
পলিথিন শপিং ব্যাগ বন্ধে আগামীকাল ৩ নভেম্বর থেকে উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানে যাচ্ছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিং কমিটি। গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও আশপাশের বিভিন্ন সুপারশপে মনিটরিং কার্যক্রমে যায় এ কমিটি। টিমের আহ্বায়ক অতিরিক্ত সচিব (পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ) তপন কুমার বিশ্বাস সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষায় ৩ নভেম্বর থেকে পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ১ ও ২ নভেম্বর সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় মোবাইল কোর্ট বন্ধ থাকলেও মনিটরিং কার্যক্রম চলমান থাকবে।’
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তর গঠিত মনিটরিং কমিটির সদস্যরা বাজার করতে আসা মানুষকে পলিথিন ব্যবহার না করে পাট ও কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহারের অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে দোকানিদের পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার বন্ধে নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং পরবর্তী অভিযানে পলিথিনের ব্যাগ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং কমিটির সদস্য যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ রেজাউল করিম, উপসচিব রুবিনা ফেরদৌসী এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক রাজিনারা বেগম, পরিচালক মোহাম্মাদ মাসুদ হাসান পাটোয়ারী এ সময় উপস্থিত ছিলেন।