অরাজনৈতিক দাওয়াতি সংগঠন তাবলিগে বাংলাদেশে মারকাজ পরিচালনা নিয়ে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। এক পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাওলানা জুবায়ের আর আরেক পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর অনুসারীরা। ৭ বছর আগে মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর অনুসারীদের আকিদা ও নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বের সূচনা হলেও চলতি বছর এটি প্রকট আকার ধারণ করেছে।
জানা গেছে, কাকরাইল মসজিদে মারকাজ হস্তান্তর ও টঙ্গীতে। ইজতেমাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শুক্রবার (১৫ নভেম্বর) মাওলানা জুবায়েরের কাছে মারকাজ হস্তান্তর করার কথা রয়েছে সা’দপন্থিদের।
কিন্তু সা’দপন্থিরা ইতোমধ্যে জানিয়েছেন যে, তারা জুবায়েরপন্থিদের কাছে মারকাজ হস্তান্তর করবেন না। কাকরাইল মসজিদে তারাই মারকাজ পরিচালনা করবেন। অপর পক্ষ জুবায়েরপন্থিরা জানিয়েছেন, সা’দপন্থিদের বিশেষ সুবিধা দিয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তাবলিগ বিভক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাত রয়েছে। সা’দপন্থিরা হেফাজতে ইসলামের বিরোধিতাসহ আওয়ামী লীগ সরকারের বিশেষ সুবিধাভোগী ছিলেন।
তারা তাবলিগের বদনাম করেছেন। এ ছাড়াও মাওলানা সা’দ তার কিতাবে ভ্রান্ত আকিদা তুলে ধরেছেন বলে জুবায়েরপন্থিদের অভিযোগ। তাই তাদের অবিলম্বে কাকরাইলে মারকাজ ছেড়ে দেওয়ার দাবি তুলছেন জুবায়েরপন্থিরা; নাহলে সাধারণ তাবলিগেরর মুরব্বিরা তাদের প্রতিরোধ করবেন বলে তারা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। অন্যদিকে, সা’দপন্থিরা বলছেন, জুবায়েরপন্থিরা যেসব অভিযোগ করেছেন তা একেবারেই সত্য নয়। তারা বিশেষ গোষ্ঠীর কাছে সুবিধা পাওয়ার জন্য এসব অভিযোগ করেছেন।
এ বিষয়ে রমনা জোনের পুলিশের সহকারী কমিশনার আবদুল্লাহ আল মামুন গতকাল সকালে খবরের কাগজকে জানান, ‘আমাদের কাছে দুই পক্ষই এসেছে। তাদের সঙ্গে আমরা আলাদা আলাদা বৈঠক করেছি। তিনি আরও জানান, মারকাজ হস্তান্তর নিয়ে দুই পক্ষ যদি আইনশৃঙ্খলার বিঘ্ন ঘটায় তাহলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব। কোনো পক্ষকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
গতকাল সকালে তাবলিগের কাকরাইল মসজিদে গিয়ে দেখা যায়, মসজিদের বাইরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সেখানে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। মসজিদের ভেতরে যাতে বহিরাগত কেউ প্রবেশ করতে না পারে সেই জন্য সতর্ক রয়েছেন মসজিদের নিরাপত্তারক্ষীরা।
তবে ইজতেমায় আসা কোনো তাবলিগের মুরব্বি এ বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মসজিদের এক খাদেম জানান, আমরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। দুই পক্ষ কাকরাইলের মারকাজ দখল নিয়ে শক্তি প্রদর্শন করছে। আমরা শান্তি চাই।
তাবলিগের দুই পক্ষের শীর্ষ মুরব্বিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই তাবলিগের কার্যক্রম ভালোভাবেই চলছিল। কোনো গ্রুপ ছিল না। বরং যেই গ্রুপ করতে যেত তাকেই জামায়াত থেকে সরিয়ে দেওয়া হতো। এ ছাড়াও তাবলিগে মজলিশে শুরা ও মজলিশে আমেলার সব সদস্যের পরামর্শক্রমে কার্যক্রম পরিচালনা হতো। সর্বসম্মতভাবে সব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হতো। কোনো ধরনের বিরোধ হতো না। কিন্তু ৭ বছর আগে মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর আকিদা নিয়ে বাংলাদেশের তাবলিগের উল্লেখযোগ্য মুরব্বিরা নানা প্রশ্ন তুলেন।
সূত্র জানায়, এ নিয়ে বিভিন্ন মতবিরোধ তৈরি হয়। তবে তাবলিগের মুরব্বিরা জানান, এই বিরোধ আদর্শিক বিরোধ নয়। মাওলানা সা’দের ভ্রান্ত মতাদর্শের কারণেই মূলত জুবায়েরপন্থি আলেমরা তার বিরোধিতা করছেন। দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজ থেকেই প্রথম সা’দবিরোধিতা শুরু হয় বলে অভিযোগ আছে। জুবায়েরপন্থিদের অভিযোগ, দারুল উলুম দেওবন্দ সা’দের ব্যাপারে ফতোয়া দিয়েছে। মাওলানা সা’দের বাংলাদেশে আসা ঠেকাতে এবং টঙ্গীর মাঠে একটি মাত্র ইজতেমা অনুষ্ঠিত করতে একাট্টা হয়ে মাঠে নামে বাংলাদেশের মাওলানা জুবায়েরপন্থি তাবলিগ জামায়াতের সাথীরা।
তারা অভিযোগ করেছেন যে, সা’দপন্থি আলেমরা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিয়েছেন। দুই পক্ষই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করে। এর মধ্যে মাওলানা সা’দপন্থি আলেম আযীমুদ্দীনের নেতৃত্বে একটি দল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করে। উভয় প্রতিনিধিদল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে দুই পক্ষই একে অপরকে দালাল বলে অভিযোগ করে। পৃথক ওই দুই বৈঠকে কোনো সুরাহা হয়নি বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, এরই পরিপ্রেক্ষিতে মাওলানা জুবায়েরপন্থিরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গত ৫ নভেম্বর সমাবেশ করেছে। তারা মাওলানা সা’দকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেবে না বলে হুমকি দিয়েছেন। অপর পক্ষ সা’দপন্থিরা আগামী ৭ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের মাওলানা জুবায়েরপন্থি তাবলিগের মুরব্বি মাওলানা আকবর হোসেন খবরের কাগজকে জানান, মাওলানা সা’দ আগেই বিতর্কিত হয়েছেন। তাকে আমরা বাংলাদেশে আসতে দেব না। তিনি আরও দাবি করেন, সা’দপন্থি আলেমরা আওয়ামী লীগ সরকারের বিশেষ সুবিধাভোগী এবং ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকায় যে হেফাজতের গণহত্যা হয়েছে ওই হত্যার ঘটনায় তারা কোনো প্রতিবাদ করেননি। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল তাদের প্ররোচনা দিয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে এ বিষয়ে সা’দপন্থি তাবলিগ জামায়াতের মুরব্বি মাওলানা জিয়া বিন কাসেম এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তারা যেসব অভিযোগ করেছেন সেই সব অভিযোগ একেবারেই সত্য নয়। ইতোমধ্যে আমরা তাদের সঙ্গে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছি। তাদের নামে খোলা চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তারা আমাদের ডাকে সাড়া দেননি। মাওলানা সা’দের বিষয়ে তারা যে অভিযোগ করেছেন সেটিও সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি।