গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার জামালপুর গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে উম্মে কুলসুম স্মৃতি। জেনারেল শিক্ষা থেকে স্নাতকোত্তর ও পরে গাইবান্ধা আইন কলেজ থেকে ‘ল’ পাস করেন। কিছুদিন আইন পেশায় জড়িত ছিলেন। একপর্যায়ে বেকার স্বামী মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে চলে যান ঢাকায়। ছাত্রজীবনে কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী বা সমর্থক ছিলেন, তা জানেন না স্থানীয়রা। হঠাৎ একদিন তারা জানতে পারেন ‘স্মৃতি বাংলাদেশ কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক’ হয়েছেন।
এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্রমেই হয়ে ওঠেন ‘দুর্নীতির মহারানি। গড়েছেন অঢেল অর্থ-সম্পদ। দোচালা টিনের ঘর থেকে পলাশবাড়ী পৌর এলাকায় নির্মাণ করেছেন অট্টালিকা। শুধু তা-ই নয়, দিনাজপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কিনেছেন শত বিঘা জমি। ঢাকায় রয়েছে চারটি ফ্ল্যাট। দেশের বাইরে কানাডার বেগমপাড়ায় রয়েছে বাড়ি। তার এই উত্থান যেন আলাদিনের চেরাগকেও হার মানায়।
কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর উম্মে কুলসুম স্মৃতি টানা তিনবার সংসদ সদস্য হন। গাইবান্ধা-৩ আসনে ক্ষমতাসীন দলের এমপি থাকার কারণে উম্মে কুলসুম স্মৃতি হয়ে ওঠেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী। চাঁদার জন্য মানুষের বাড়িতে পাঠাতেন নিজস্ব বাহিনী। জনসমক্ষে মারপিট করতেন লোকজনকে। গাছ কাটা থেকে শুরু করে নিয়োগ পরীক্ষা সবখানেই তার জন্য বিশেষ বরাদ্দ থাকত। এলাকাকে গড়ে তোলেন অনিয়ম-দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য হিসেবে। পরিবারের সদস্যরা এ রাজ্যে বিচরণ করে প্রত্যেকেই হয়েছেন কোটিপতি। উন্নয়নকাজের ভাগ-বণ্টন, কমিশন-বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলীয় এ জনপ্রতিনিধি এখন লাপাত্তা। তার পরিবারের লোকজনের কাছে টাকা দিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন অসংখ্য চাকরিপ্রত্যাশী।
২০২০ সালের ২১ মার্চে উপনির্বাচনে উম্মে কুলসুম স্মৃতি সংসদ সদস্য হন। এর আগে তিনি প্রথমে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দলীয় টিকিটে সংসদ সদস্য হন তিনি। এর পরই তার আচার-আচরণ, কথাবার্তায় চলে আসে রূঢ়তা। অকারণে মানুষের সঙ্গে করতেন দুর্ব্যবহার। ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাননি কেউ। ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে বিনা ভোটে চাচাতো ভাই গোলাম সারোয়ারকে বানিয়েছিলেন পলাশবাড়ী পৌর মেয়র। ছোট বোনের স্বামী সেকেন্দার আলী রেডিও-টেলিভিশনের মেকার থেকে হয়ে যান তদবির পার্টির প্রধান। ছোট ভাই আমিরুল ইসলাম চাকরি দেওয়ার কথা বলে হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনি এলাকায় তিনি উন্নয়নের নামে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। কমিশন না দিলে প্রকল্পের কাজে নানা ঝামেলার সৃষ্টি করতেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দপ্তরগুলোতে তার আস্থাভাজন কর্মকর্তা বসিয়েছেন। দুই উপজেলার বিদ্যালয়ে বিভিন্ন কমিটিতেও ছিল তার বিশ্বস্ত লোক। কোথাও চাকরি ও নিয়োগ পরীক্ষা হলেই নয়ছয় করে দুই হাতে লুটেছেন কোটি কোটি টাকা। সরকারি নিয়ম মেনে এলাকার কোনো সড়কের গাছ কাটা হলেও চাঁদা দিতে হতো এমপিকে। বিভিন্ন দপ্তরে করতেন তদবির। এ কাজে সহযোগী ছিলেন তার স্বামী।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। তিনি পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। সরকার পতনের পর থেকে উম্মে কুলসুম স্মৃতি ও তার পরিবারের সদস্যরা গা ঢাকা দিয়েছেন। এমপি ও তার সহযোগীদের নামে প্রতারণা ও চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে।
পলাশপুরের হরিনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর কবির হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘পলাশবাড়ী উপজেলার হরিনাথপুর ইউনিয়নের চারটি রাস্তার দুই পাশে ইউক্যালিপটাসগাছ রোপণ করে হরিণাবাড়ী সমাজকল্যাণ সমিতি। সরকারি বিধি মোতাবেক আমরা গাছ বিক্রির জন্য দরপত্র আহ্বান করি। পরে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে ২৯ লাখ ৫০ হাজার টাকায় গাছগুলো বিক্রি করা হয়। কিন্তু গাছ কাটা চলমান অবস্থায় সাবেক সংসদ সদস্য উম্মে কুলসুম স্মৃতির বাহিনী ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। তাৎক্ষণিক চাঁদার টাকা না পেয়ে তারা আমাকে মারধর করে। এর এক দিন পরই জামালপুর এলাকায় এমপির নিজ বাসায় আমাকে নিয়ে যায়। জীবনের ভয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে আসি।’
রানা মিয়া নামের আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘উম্মে কুলসুম স্মৃতি এমপির ছোট ভাই উপজেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম পাপুল আমার কাছ থেকে বরিশাল দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা নেন। প্রায় চার বছর অতিক্রান্ত হলেও চাকরি হয়নি আমার। টাকা ফেরত চাইলে আমিনুল এমপির ক্ষমতার ভয় দেখান। সরকার পতনের পর তাদের আর দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতারণার মাধ্যমে এমপির ভাই আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন।’
স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে ইচ্ছুক ছিলেন এমন প্রার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, বিগত নির্বাচনে সাবেক এমপি তার ছোট ভাই গোলাম সারোয়ারকে মেয়র বানিয়েছেন। নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বাইরে কাউকে নির্বাচন করতে দেওয়া হয়নি। যারা তার নির্দেশ উপেক্ষা করে নির্বাচন করেছেন, এমপির ক্যাডার বাহিনী তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এমপি ঘুষ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে সহযোগিতা করেন।
পলাতক থাকায় এসব অভিযোগের বিষয়ে উম্মে কুলসুম স্মৃতির কাছ থেকে বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মুঠোফোনে ফোন দিলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।