দেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী দেশ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক নতুন কিছু নয়। কিন্তু গত সরকারের আমলে একটি বড় দেশের আপত্তির কারণে বাংলাদেশের বেশ কিছু প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ থাকলেও সেটি পারেনি চীন। ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ছিল এই অদৃশ্য বাধা। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই চাপ না থাকলেও এ অঞ্চলের আধিপত্য নিয়ে একটি প্রতিযোগিতা নতুন রূপ পেতে যাচ্ছে। আর এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে দেশটির সরকার।
কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সম্প্রতি যোগাযোগ আরও বেড়েছে। চীনের চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং নতুন নতুন প্রকল্পে কীভাবে অর্থায়ন করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করতে গতরাতেই ঢাকায় এসেছেন চীনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থার (সিআইডিসিএ বা সিডকা) ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়ং উইকনের নেতৃত্বে একটি দল। দুই দিনের সফরে প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের অর্থায়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করবে। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে আরও কীভাবে চীন সহায়তা দিতে পারে সেটি আলোচনায় আসবে। মূলত এই অঞ্চলে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) সমর্থনেও কাজ করে যাচ্ছে এই সংস্থাটি। এ ছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে আরও বৃহত্তর পরিসরে কাজ করার লক্ষ্যে চীনের একটি পূর্ণাঙ্গ কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠায় অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদন চেয়েছে দেশটি।
চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ এ বিষয়ে খবরের কাগজকে জানান, বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের অবদান আছে। চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন করতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রতিবেশী একটি দেশের আপত্তির কারণে সেটি তৃতীয় একটি দেশকে দিতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চীন চাইবে আরও নতুন নতুন ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত হতে। চীন অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন কীভাবে আরও বেশি সম্পৃক্ত হওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ শুরু করবে- এটাই স্বাভাবিক। এ ছাড়া ভূ-রাজনৈতিক কারণে এমনিতেই দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক উন্নয়নে উভয়েরই স্বার্থ রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রতি চীনের আগ্রহ বেড়েছে। তারা বৃহত্তর পরিসরে অর্থাৎ জনগণের মধ্যে আরও সম্পৃক্ততা বাড়াতে ঢাকার বারিধারা বা গুলশান এলাকায় একটি কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যা আগে কখনো এমন আগ্রহ দেখায়নি। এ ছাড়া চীনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থার একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসছে। সফরকালে তারা বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে আরও কীভাবে কাজ করতে পারে, এ জন্য সড়ক ও রেল যোগাযোগবিষয়ক উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গেও প্রতিনিধিদলটি বৈঠক করবে। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা আরও প্রসারিত করার বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
কূটনীতিকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে বিরোধ ও দ্বন্দ্ব, তার রঙ্গমঞ্চ হয়ে উঠেছে ইন্দো-প্যাসিফিক এলাকা। বিশেষ করে, বিশ্বের একক সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল। দেশটি এতদিন মধ্যপ্রাচ্য এবং আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তার নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও ধীরে ধীরে তারা নজর সরিয়ে এনেছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে। ইউক্রেনে যুদ্ধ সত্ত্বেও এটা বলা যায়, আমেরিকার ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনায় ইন্দো-প্যাসিফিক হচ্ছে বড় টার্গেট। এটা চীনকে প্রতিহত করতেই এই স্ট্র্যাটেজি আমেরিকা ও তার মিত্রদের। আর ইন্দো-প্যাসিফিক এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ ও বঙ্গোপসাগর। কাজেই এই উদ্যোগকে প্রতিহত করতেই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনেরও আধিপত্য বাড়ানো দরকার। এ লক্ষ্যে পিছিয়ে নেই চীনও। তারাও চায় বাংলাদেশসহ এই ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা।