একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর সারা জীবনে কত টাকা বেতন পান? সাকল্যে মাসে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা হিসাবে বছরে তার আয় সাড়ে ৮ লাখ টাকার মতো। ৩০ বছর চাকরি করলে সর্বমোট আড়াই কোটি টাকার মতো তার আয় হতে পারে। কিন্তু সংসারের খরচ মিটিয়ে এই পুরো টাকা তার পক্ষে সঞ্চয় করা সম্ভব নয়। ফলে চাকরিতে থাকাবস্থায় এই আয় দিয়ে তার একটি ফ্ল্যাট কেনা অত্যন্ত কঠিন।
সাধারণ হিসাব হচ্ছে, অবসর নেওয়ার পরে হয়তো বড়জোর ১টি ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারেন ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। এর বাইরে শান্তি মিশনে গিয়ে অনেকেরই এখন ফ্ল্যাট ও গাড়ি কেনার সুযোগ হচ্ছে। কিন্তু চাকরিতে থাকাবস্থায়ই একজন ইন্সপেক্টরের ৫টি ফ্ল্যাট কেনার তথ্য পাওয়া গেছে।
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএনে) চাকরিরত ওই ইন্সপেক্টরের নাম আব্দুর রউফ। অভিযোগ আছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতি করে তিনি এগুলোর মালিক হয়েছেন। বিগত সরকারের আমলে দুর্নীতিগ্রস্ত অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকেই অবসরে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু রউফ এখনো বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন এপিবিএনে। এর আগে তিনি র্যাব ও ট্রাফিক ইন্সপেক্টর পদে কর্মরত ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রউফ এখন থাকছেন রাজধানীর মিরপুরের এসওএস হারম্যান মেইনার কলেজের পেছনে ৪টি ফ্ল্যাটের দুটিতে। বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রউফের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের বিষয়ে জানতে অনুসন্ধান চালায় খবরের কাগজ টিম। প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা অনুসন্ধানে মিলেছে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য।
আব্দুর রউফের যত সম্পদ
অনুসন্ধানে জানা যায়, মিরপুরের ৫০১/৪ পূর্ব সেনপাড়ায় হ্যাভেন নামের ১০ তলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের একটি (৬ এর ডি) ও এসওএস হারম্যান মেইনার কলেজের পেছনে ৪টি ফ্ল্যাট, এর পাশেই আছে কোটি টাকার একটি প্লট। তার এই ফ্ল্যাটগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য ৪ কোটি টাকারও বেশি। তিনি একটি দামি গাড়িও ব্যবহার করেন।
হারম্যান মেইনার কলেজের যে ৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে সেখানে দুটি ফ্ল্যাট মিলিয়ে এক বিলাসবহুল বাসায় থাকেন ইন্সপেক্টর রউফ। সম্প্রতি ৫০ লাখ টাকা খরচ করে এই ফ্ল্যাটের বেডরুম, ডাইনিং ও ড্রইং রুমের দৃষ্টি নন্দন ডিজাইনও করিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া গ্রামের বাড়ি পাবনায়ও তার কয়েক বিঘা ফসলি জমি ও পাকা বাড়ি আছে বলেও অনুসন্ধানে জানা যায়।
আব্দুর রউফের সেনপাড়ার ফ্ল্যাটটি ১৬০০ স্কয়ার ফুট হলেও তার আয়কর রিটার্নে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছে মাত্র ১ হাজার স্কয়ার ফুট। ফলে ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা হলেও আয়তন কম দেখানোর কারণে সেখানে দাম দেখানো হয়েছে প্রায় অর্ধেক। এ ছাড়া হারম্যান মেইনার কলেজের পেছনে ৪টি ফ্ল্যাটের তথ্য আয়কর রিটার্নে উল্লেখ নেই।
পূর্ব সেনপাড়ায় হ্যাভেন নামের ১০ তলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের গার্ড আব্দুল হক খবরের কাগজকে বলেন, স্যার এখানে থাকতেন। তিনি এই ভবনের সভাপতি ছিলেন। ভবনের ৬ এর ‘ডি’তে তার বাসা। তিন মাস আগে তিনি এই বাসা ছেড়ে চলে গেছেন। এখন এই ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘শুনেছি স্যারের অনেকগুলো ফ্ল্যাট। এখন তিনি হারম্যান মেইনার কলেজের পেছনের ফ্ল্যাটে উঠেছেন।
এই ভবনে থাকেন আরও দুই পুলিশ সদস্য। খবরের কাগজকে তারা জানান, পুলিশ ইন্সপেক্টর রউফের চলাফেরাই অন্যরকম। কে বলবে এত সাধারণ চাকরি করেন! গাড়ি ছাড়া তিনি চলেন না। শুনেছি, এটি ছাড়াও তার আরও কয়েকটি ফ্ল্যাট আছে।
আব্দুর রউফের এক সহকর্মী খবরের কাগজকে বলেন, ‘বেশ কয়েকবার রউফের বাসায় আমি গিয়েছি। বাসার ভেতরে প্রায় ৫০ লাখ টাকার কাজ করানো হয়েছে। দেখে মনে হয় একটা তাজমহল। ৭ বছর আগেও ভাড়া থাকতে দেখেছি। ২০১৪-১৫ সালে বেতন পেতেন ২০ হাজার টাকার মতো। ওই টাকায় সঞ্চয় তো দূরের কথা, সংসার চালানোও দায় ছিল। এর আগে বেতন পেতেন ১৩ হাজার টাকার মতো। আর ২০০০ সাল থেকে ২০১০ সালে বেতন ছিল ১০ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রভিডেন্ড ফান্ডও ছিল না। তখন ঘুষের টাকায় সংসার চলত। ফলের দোকান থেকে শুরু করে আবাসিক হোটেল সব জায়গা থেকে আব্দুর রউফ ঘুষ নেন বলেও অভিযোগ করেন তার এই সহকর্মী।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের কথা উল্লেখ করে ওই সহকর্মী আরও জানান, যে পদে কাজ করেন তাতে মিশনে গেলে খুব হলে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পাওয়ার কথা। আর বর্তমানে তিনি প্রায় ১০ কোটি টাকার মালিক বলে দাবি করেন তার সাবেক ওই সহকর্মী।
রউফের দুই মেয়ে বেশ বিলাসবহুল জীবন-যাপন করেন বলে প্রতিবেশীরা জানান। একজন পড়াশোনা করছে সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর ছোট মেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেছেন।
সাবেক ওই সহকর্মী বলেন, হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া এসব পুলিশের কারণে পুলিশ বাহিনীর সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ ছাড়া আমরা যারা তাদের সঙ্গে চাকরি করি তাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপনের ওপর চাপ পড়ে। অসৎ পুলিশের অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। নইলে সমাজে অপরাধ দমন করা কঠিন হবে।
আব্দুর রউফের আয় ও সম্পদের বিষয়ে জানতে কথা হয় তার স্ত্রীর সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের বিষয়ে আপনাকে এসব তথ্য কে দিল, কীভাবে পেলেন। আমার স্বামীর টাকা থাকলে কার কী আসে যায়। সে কথা আপনাকে বলব কেন? ‘কেন ফোন দিছেন, কিসের জন্য’ বলে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করতে থাকেন।
আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাব সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না জানতে চাইলে আব্দুর রউফ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার সব সম্পদ বৈধভাবে করা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের টাকা দিয়ে এসব করেছি।’
আয়কর রিটার্নের তথ্যে এসব সম্পদের হিসাব নেই কেন জানতে চাইলে এই পুলিশ পরিদর্শক বলেন, ‘সেনপাড়ার ফ্ল্যাটের তথ্য আয়কর রিটার্নে আছে। তবে হারম্যান মেইনার কলেজের পেছনে ৪টি ফ্ল্যাট এখনো রেজিস্ট্রি হয়নি, তাই আয়কর রিটার্নে তোলা সম্ভব হয়নি।’
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করে আসা ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, একজন ইন্সপেক্টর এক বছরের জন্য মিশনে গেলে সবকিছু বাদ দিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা সঞ্চয় করতে পারেন। এসব মিশন সাধারণত এক বছরের জন্য হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আব্দুল্লাহ আল-মাহমুদ (এপিবিএন পুলিশ হেডকোয়ার্টার) খবরের কাগজকে বলেন, কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুনীতি ও ঘুষ-বাণিজ্যসহ যেকোনো অপরাধের অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে যে ধরনের অপরাধ করে সেই আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অপরাধ করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।