সমিতির সদস্য থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায়ের অফিসারদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ প্রশিক্ষণের মধ্যে মৎস্য উন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর উন্নয়নে প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে বিভিন্ন বিষয়ে ৫ লাখ ৩৫ হাজার জনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে ১৫১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু এই খরচের ক্ষেত্রে মানা হয়নি সরকারি ক্রয় নীতিমালা। কোনো ধরনের দরপত্র আহ্বান ছাড়াই প্রকল্প পরিচালক নিজের ইচ্ছামতো এসব করেছেন।
এ ছাড়া অন্যান্য খাত মিলিয়ে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২৭৭ কোটি টাকারও বেশি। এটি হচ্ছে ‘সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন কর্মসূচির (সিভিডিপি) তৃতীয় পর্যায়’ প্রকল্পের বাস্তব চিত্র। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রকল্পটির প্রথম প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ছিলেন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. আলফাজ হোসেন। বর্তমানে উপসচিব ড. মো. গোলাম মোস্তফা পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ব্যাপারে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি পিডি হিসেবে কিছুদিন আগে অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়েছি। প্রকল্পের অগ্রগতি ভালোই হচ্ছে। উপদেষ্টার সঙ্গে মাঝে মাঝে মিটিং করা হচ্ছে। অক্টোবর পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৮৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। আগেই প্রায় কাজ হয়েছে। আগের ঘোষণা অনুযায়ী ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। তবে মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।’ প্রশিক্ষণের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আইএমইডি যে অভিযোগ করেছে তা সত্য নয়। কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। তারা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করার কোনো সুযোগ নেই।’
এ ব্যাপারে আইএমইডির সচিব মো. আবুল কাশেম মহিউদ্দিন বলেন, ‘প্রকল্পে নিয়মের ব্যত্যয় হয়ে থাকলে প্রকল্প পরিচালক দায়ী থাকবেন। আমরা চলমান প্রকল্প মনিটরিং করে শক্তভাবে সবকিছু দেখার চেষ্টা করছি। কোনো দুর্বলতা বা অনিয়ম পেলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করে থাকি। তারা আমলে না নিলে খুবই দুঃখজনক।’
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘যারা এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বা নীতিমালা মানেননি তাদের শাস্তির আওতায় আনা দরকার। কারণ প্রথমত আইএমইডি কষ্ট করেই এই অনিয়ম ধরেছে। তাদের সুপারিশ আমলে নিলে অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। অন্যদিকে যে টাকা খরচ করা হয়েছে এটা জনগণের করের টাকা। আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। শাস্তির ব্যবস্থা হয়নি বলেই বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে।’
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চারটি সংস্থা। এগুলো হচ্ছে সমবায় অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিপি), বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) এবং পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ)। প্রকল্পের আওতায় ৮ বিভাগের ৬৪ জেলার ১৬২টি উপজেলা রয়েছে। এর মধ্যে সমবায় অধিদপ্তর ৪৬টি উপজেলায়, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) ৪৬টি উপজেলায়, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) ৩৫টি উপজেলায় এবং পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) ৩৫টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গ্রামের ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব পেশা ও শ্রেণির জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে সামগ্রিক উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করা।
প্রকল্পের বিশেষ উদ্দেশ্যগুলো হলো- গ্রাম পর্যায়ে ১০ হাজার ৩৫টি সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি গঠন। প্রকল্পের আওতায় ৯ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের ১৪ লাখ ৫০ হাজার জন সমবায়ীকে প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এবং ৬ লাখ ৬৮ হাজার ২৩০ জন সমবায়ীকে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি করা। শেয়ার ও সঞ্চয় আমানতের সাহায্যে ৫১০ কোটি টাকা পুঁজি গঠন। বয়স (১৮ বছর এবং তদুর্ধ্ব) ধর্ম, পেশা ও শ্রেণি নির্বিশেষে প্রতিটি ব্যক্তির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। সফল সমবায় নীতিগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে বেগবান করা।
২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য তৎকালীন সরকার ২০১৮ সালের ৫ জানুয়ারি অনুমোদন দেয়। এ সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না হলে সংশোধন করে দুই বছর সময় বাড়ানো হয় অর্থাৎ ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে প্রথমে খরচ ধরা হয় ৩০১ কোটি টাকা। পরে সংশোধন করে ১ কোটি কমিয়ে ২৯৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা খরচ ধরা হয়। পরে আবার দুই বছর সময় বাড়ানো হয়।
২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও প্রকৃতপক্ষে সেপ্টেম্বর মাস থেকে প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের শুরু থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ২৭৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বা ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ। এর মধ্যে প্রকল্পের পরিচালকসহ অন্যদের যাতায়াতের জন্য ৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা খরচ করে একটি জিপ গাড়ি, ডাবল কেবিন পিকআপ ৪টি ও ৯৬টি মোটরসাইকেল কেনা হয়েছে। ল্যাপটপ, কম্পিউটার, আলমারি, অফিস টেবিল ও চেয়ারও কেনা হয়েছে। এ ছাড়া কর্মকর্তাদের বেতন, সম্মানী, যাতায়াত ভাতা, নববর্ষ ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতা বাবদ প্রায় ৩৭ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে।
বিভিন্ন খাতে প্রশিক্ষণের জন্য ৫ লাখ ৩৫ হাজার জনের পেছনে ১৫১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে ২ কোটি টাকা খরচ করে ৪৪ হাজার জনকে এক দিন, দুই দিন ও তিন দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কেঁচো কম্পোস্ট, হাঁস-মুরগি, কৃষি, মৎস্য, সমবায় সমিতির সদস্য ও উপজেলা পর্যায়ে অফিসারদের এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বাকি ১৪৯ কোটি টাকা কোনো দরপত্র ছাড়াই নিয়মবহির্ভূতভাবে বিশেষ প্রশিক্ষণের নামে খরচ করা হয়েছে। ইনকাম জেনারেটিং অ্যাকটিভিটিজ (আয়বর্ধক কার্যক্রম) নামে ৩০ ও ৬০ দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণে প্রায় ৫ লাখ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে টেইলারিং অ্যান্ড গার্মেন্টস, বিউটি কেয়ার, ওভেন, সুইং মেশিন অপারেশন বিষয়ে ১১ হাজার ৪০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে খরচ করা হয়েছে ৪০ কোটি টাকা। ইলেকট্রনিকস, ইলেকট্রিক্যাল, কম্পিউটারের ওপরে ১২ হাজার ৬৩৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে খরচ করা হয়েছে ৪৬ কোটি ১০ লাখ টাকা।
প্লাম্বিং অ্যান্ড পাইপ ফিটিংস, ওয়েলন্ডিং ও পেইন্টিংয়ের ওপর ৩ হাজার ৩০৯ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে খরচ করা হয়েছে ১২ কোটি টাকা। মোটরসাইকেল অ্যান্ড থ্রি-হুইলার মেরামত ও সার্ভিসিং এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনের ওপর ২ হাজার ৫৭৮ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে খরচ হয়েছে ১০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে ৩ হাজার ৭৯ জনের পেছনে ১২ কোটি ১৭ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে। সোলার প্যানেল টেকনিক্যাল কোর্স, অটো মেকানিক্স টিম্বার ও সিকিউরিটি গার্ড খাতে ২ হাজার ৪৫৯ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাদের জন্য খরচ হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ৫ লাখ ৯২ হাজার সমবায়ীকে নিয়ে মাসিক সভা করা হয়। তাদের পেছনে খরচ করা হয়েছে ১৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার ৩৫টি সমিতি গঠনের কথা ছিল। কিন্তু অক্টোবর পর্যন্ত ৯ হাজার ৬২২টি সমিতি গঠন করা হয়েছে।
বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও দরপত্র আহ্বান ছাড়াই প্রকল্প পরিচালক ইচ্ছামতো তার পছন্দের প্রতিষ্ঠানে এসব প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। কোনো ধরনের পিপিআর-২০০৮ নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। ফলে অনেক সংস্থার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তারা কাজ পায়নি।