রাজধানীর গুলিস্তান এলাকার হকার ছিলেন মো. আফজাল হোসেন। রাস্তার পাশে বসে বিক্রি করতেন জুতা। পরে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের হাত ধরে তিনি রাজনীতিতে পা রাখেন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কিশোরগঞ্জ-৫ আসন (নিকলী-বাজিতপুর) থেকে টানা চারবার সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। এ সময়ে দিনমজুর বাবার ছেলে আফজাল হোসেন শূন্য থেকে বনে যান হাজার কোটি টাকার মালিক। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া আফজালের ঢাকা, কিশোরগঞ্জ, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া এবং মালয়েশিয়ায় অসংখ্য বাড়ি ও ফ্ল্যাট রয়েছে।
বাজিতপুর-নিকলী উপজেলায় এমপি আফজাল হোসেনের কথাই ছিল শেষ কথা। ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন আশরাফকে নিয়ে জমি দখল থেকে শুরু করে হেন কোনো অপকর্ম নেই যা তিনি করেননি। আফজাল তার সেই ভাইকে বানিয়েছিলেন পৌর মেয়র। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর আফজাল ও আশরাফ আত্মগোপনে চলে যান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলের একাংশের মতবিরোধকে উপেক্ষা করে ২০০৮ সালে আফজালকে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ওই নির্বাচনে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। এমপি হওয়ার আগে আওয়ামী লীগের সদস্যপদও ছিল না তার। পরবর্তী তিন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে আফজালকে টানা মনোনয়ন পাইয়ে দেন সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। ২০০৮ সালে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর আফজালের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সহযোগী হয়ে ওঠেন তার ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন আশরাফ। ২০১২ সালে আফজাল উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক হন। এরপর ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। নিজস্ব বলয় শক্তপোক্ত করার জন্য আফজাল ২০১৫ সালে আশরাফকে বাজিতপুরের পৌর মেয়র বানান। এরপর দুই ভাই মিলে নিকলী-বাজিতপুর উপজেলায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। ২০১৮ সালে আফজাল আবারও এমপি নির্বাচিত হন। পরের বছর ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাজিতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।
স্থানীয়রা জানান, এলাকায় জমি দখলের দৌড়ে প্রথম ছিলেন আফজাল ও তার ছোট ভাই। দুই ভাই মিলে বাজিতপুর উপজেলায় সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের জমি দখলে নিয়ে মার্কেট নির্মাণ করেন। এ ছাড়া দীঘিরপাড়, মাইজচর, হুমাইপুর, দিলালপুরের সরকারি খাসজমি বেঙ্গলা নদী দখল করেন তারা। বাজিতপুরের নোয়াপাড়া গ্রামে দখল করা ৭০ শতাংশ জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করেন। ভাগলপুর ফায়ার সার্ভিসের পাশে ২৯ শতাংশ জমি, সিনেমা হল রোডে একটি দোকান, বসন্তপুর মৌজায় সরকারি জমিতে পাঁচটি দোকান ও মৌজায় আরও ২৫ শতাংশ জমি দখল করে তিনতলা মার্কেট নির্মাণ করেন তারা। তা ছাড়া দড়িঘাগটিয়া মৌজায় সিনেমা হলের ১৫ শতাংশ জমি, বাজিতপুর পৌরসভার দড়িঘাগটিয়ায় দুই একর জমি দখল, বাজিতপুর বাজারের নাপিত মহলের পুকুর, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দক্ষিণ পাশে দুই একর জমি, নান্দিনা আলিয়াবাদ মৌজার ব্যাপারীপাড়ার ২০ শতাংশ জমি, তাতলচর মৌজায় ৬০ শতাংশ জমি তারা দখল করেন। এ ছাড়া বাজিতপুর-নিকলী উপজেলার বাজারগুলোর ইজারা নির্ধারণ করে দখল করতেন আফজাল ও আশরাফ। তারা দীঘিরপাড় মৌজার ২০ শতাংশ জমিতে দোকান ও ঘর নির্মাণ, গাজীরচর মৌজায় আট একর জমি, শশেরদীঘি মৌজার ১০ একর ফসলি জমি, মতুরাপুর গ্রামের ২০ শতাংশ জমি, নাজিরদীঘি পুকুর দখল করেছিলেন। দুই ভাইয়ের কারণে নিকলী-বাজিতপুরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভীতিকর হয়ে ওঠে। তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে সাহস পেত না। আর যারাই মুখ খুলত কিংবা প্রতিবাদ করত, তাদেরকে হামলা ও মামলার শিকার হতে হতো।
তারা আরও জানান, আশরাফ বাজিতপুর পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আফজাল আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। নিজ দলের প্রতিপক্ষ ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা, খুন, নারী নির্যাতন থেকে শুরু করে খাসজমি, দোকানপাট, বাড়িঘর, জলমহাল, বালুমহাল দখলের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। মানুষকে মামলা দিয়ে হয়রানি ও মাদক কারবারের অভিযোগও রয়েছে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া আত্মীয়স্বজনকে ঠিকাদারির দায়িত্ব দিয়ে নিম্নমানের কাজ, হাওর-বিল নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যবহার করতেন তারা। তাদের বিরুদ্ধে হুমাইপুর, বেঙ্গলা চরবাদা, কইয়া খায়রা, মাইজচর, বাহেরবালীসহ বেশ কয়েকটি জলমহালের ইজারাদারের থেকে ৫০ শতাংশ হারে ভাগ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অবৈধ সম্পদের পাহাড়
আফজাল বাজিতপুর পৌরসভা এলাকায় ২০ শতাংশ জমি দখল করে নিজ বাসভবনসহ সাততলা মার্কেট নির্মাণ করেছেন। দিলালপুর ইউনিয়নের নোয়াপাড়া গ্রামে ৭০ শতাংশ জমিতে তৈরি করেছেন তিনতলা অট্টালিকা। রাজধানীর সেগুনবাগিচার হাসিনুর গ্রিন হাউসে আফজালের দুটি ফ্ল্যাট, পুরান ঢাকায় একটি পাঁচতলা ভবন, লালমাটিয়া ফায়ার ব্রিগেডের পেছনে স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাট ও দক্ষিণ বনশ্রীতে ছেলে সাঈদ হোসেনের নামে পাঁচতলা বাড়ি, বংশালে দুটি সাততলা বাড়ি, দক্ষিণ বনশ্রীতে একটি বাড়ি, উত্তরায় সাত কাঠার প্লট, কেরানীগঞ্জ ব্রিজের ঢালে ছয় কাঠা জমির ওপর বাড়ি, আফতাবনগরের সি ব্লকে প্লট, রাজউক ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পের ১৩/এ রোডে প্লট, পূর্বাচলে পাঁচ কাঠার প্লট, সিদ্দিকবাজারে ছয়তলা একটি বাড়ি রয়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, আফজাল এবং তার স্ত্রী-সন্তান ও ভাইয়ের পরিবার ও নিকট আত্মীয়দের নামে হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে আফজালের নামে সিঙ্গাপুরে একাধিক ফ্ল্যাট, অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি-গাড়ি ও মালয়েশিয়ায় একাধিক বাড়ি-গাড়ির খোঁজ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আফজাল মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, দুবাইসহ বেশ কয়েকটি দেশে গড়ে তোলেন হুন্ডির রমরমা ব্যবসা। তা ছাড়া তার বাহিনী দিয়ে বিদেশে অনলাইন জুয়ার এজেন্ট তৈরি করে ব্যবসা চালাতেন।
বাজিতপুর উপজেলার বসন্তপুর ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও ফিশারি প্রজেক্টের মালিক আমিরুল ইসলাম সুজন (৫৭)। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘ডাকবাংলোর সামনে আমার ২৭৫ শতাংশ জমি ছিল। আফজাল ও তার বাহিনী অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নামমাত্র মূল্য দিয়ে আমার কাছ থেকে সেই জমি লিখে নেন। এলাকায় কারোর কোনো সাহস ছিল না তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলার বা করার। কেউ কোনো প্রতিবাদ করলেই তাকে পেটুয়াবাহিনী দিয়ে অত্যাচার-নির্যাতন করা হতো। নিকলী-বাজিতপুরে আফজালের কথাই ছিল শেষ কথা। তার কথার পর আর কারোর কোনো কথা বা নির্দেশ চলত না।’
৫ নম্বর ওয়ার্ডের বীর মুক্তিযোদ্ধা বিল্লাল মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘২০১৭ সালে আমার বাড়ির পেছনের বড় বড় গাছ কেটে নিয়ে যান তৎকালীন মেয়র আশরাফ। এ ছাড়া আশরাফ মৃত ফিরোজা আক্তার খাতুনের কাছ থেকে একটি জমি কেনেন। ভুলবশত ফিরোজার নামে আমার জমি মাঠ রেকর্ড হয়ে যায়। সেই জমি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমাও চলছে। তবে মাঝখান থেকে মারধর করে আমার দুই হাত ও এক পা ভেঙে দেয় আশরাফের লোকজন। এ ছাড়া দুই ভাই মিলে আমার ২৯ শতাংশ দখল করে নিয়ে গেছেন।’
বাজিতপুর সিনেমা হল রোডের চঞ্চল খবরের কাগজকে বলেন, ‘মতবিরোধের জেরে তিন বছর আমার দোকানে তালা দিয়ে রাখেন তারা। অনেক চেষ্টা করেও দোকানটা উদ্ধার করতে পারিনি। তবে ৫ আগস্টের পর আমার তালাবদ্ধ করে রাখা দোকান নিজের দখলে নিই।’
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক এমপি আফজাল ও তার ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন আশরাফের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মোবাইলে কল দিলেও বন্ধ পাওয়া যায়।