অধস্তন কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ীকরণ ও আবাসন সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) তিন কর্মচারী গত ১৩ বছরে ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযুক্ত শ্রমিকনেতারা হলেন সড়ক ও জনপথ শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও বনানীর সড়ক উপবিভাগের কর্মচারী মো. ইউসুফ নবী, সওজের সার্কেল অফিসের কর্মচারী ও ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. শামীম মিঞা, মুন্সীগঞ্জের সওজ সার্কেলের কর্মচারী ও ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ গাজী মোস্তফা কামাল। ২০১১-এর সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত এই তিন শ্রমিকনেতার দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ ছিলেন সওজের সাধারণ কর্মচারীরা।
জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নাম ভাঙিয়ে রাজধানীতে সওজের বিপুল পরিমাণ জমি দখল করেছেন এই তিন কর্মচারী। সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা অনুষ্ঠানের নামেও কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি করেছেন তারা, যার বেশ কিছু প্রমাণ খবরের কাগজের হাতে এসেছে।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চাঁদাবাজির মামলায় ইউসুফ নবী গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে বাকি দুই নেতা পলাতক। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নানা অপকর্মের অভিযোগ উত্থাপিত হলেও সওজ কর্তৃপক্ষ কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়নি তাদের বিরুদ্ধে। গত ২৮ অক্টোবর সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ এই তিন শ্রমিকনেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। তবে সওজের প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখা, সম্পত্তি শাখা ও ঢাকা সার্কেলের কর্মকর্তারা বলছেন, এই তিন শ্রমিকনেতা সম্পর্কে ‘কিছুই জানেন না’।
১৩ বছরে ১০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি
সড়কের বিভিন্ন বিভাগের অধস্তন কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই তিন শ্রমিকনেতা সওজের সরকারি কোয়ার্টারের জায়গা দখল করে অবৈধভাবে বসতঘর, রিকশার গ্যারেজ, হোটেল ও দোকানঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। এসব ঘরের ভাড়া বাবদ ৪ কোটি টাকা আয় করলেও সেই অর্থ সওজের কোষাগারে জমা দেননি।
এ ছাড়া দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী করার প্রলোভন দেখিয়ে ৩ কোটি টাকা চাঁদাবাজি করেছেন।
সওজের সাধারণ কর্মচারীদের সওজ কোয়ার্টারে বাসা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ২ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে ওই তিনজনের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন কর্মসূচির নামে তারা ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছেন বলে জানা গেছে। পুরোনো ওয়ার্কচার্জ কর্মচারীদের সার্ভিস কাউন্টের নামে আনুমানিক ২০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ এসেছে।
সম্প্রতি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় ওই তিন শ্রমিকনেতার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন শ্রমিকনেতা এ কে এম ছাইফুর রহমান। মামলার এজাহারে ৯ কোটি টাকা আত্মসাতের পাশাপাশি ৫০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্রমিকনেতাদের দৌরাত্ম্যে ভুক্তভোগী সওজের নিরীক্ষা ও হিসাব কার্যালয়ের গাড়িচালক মো. আব্দুস সালাম। তিনি বেশ কয়েক বছর পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করেছেন রাজধানীর মিরপুরের সড়ক গবেষণাগারের স্টাফ কোয়ার্টারে। কিন্তু এ বছরের শুরুতে সড়ক গবেষণাগারের উন্নয়নের স্বার্থে স্টাফ কোয়ার্টারের টিনশেড বাসাগুলো ভেঙে ফেলা হয়। পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েন আব্দুস সালাম। নিরুপায় হয়ে তিনি সওজ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি শামীম মিঞা ও সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ নবীর কাছে যান। এই দুই নেতা আব্দুস সালামকে সরকারি কোয়ার্টারে বাসা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ২ লাখ টাকা উৎকোচ নেন। কিন্তু আব্দুস সালামকে ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। কোনো টাকাও ফেরত দেওয়া হয়নি।
শুধু আব্দুস সালাম নন; সওজের ঢাকা সার্কেল, মুন্সীগঞ্জ, রাজশাহীসহ অনেক জেলার অধস্তন কর্মচারীরা শ্রমিকনেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ আনেন। সওজের প্রধান কার্যালয়ের পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণ উইংয়ের কর্মচারী শহীদ উল্যাহ সওজের কোয়ার্টারে বাসা পেতে দিয়েছেন ২ লাখ টাকা। চাকরি স্থায়ী করতে সওজের রাজশাহী সার্কেলের কর্মচারী এ কে আজাদ ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ও মো. সাঈদুর রহমান ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন তিন শ্রমিকনেতাকে। তবে অনেক পর অধস্তন কর্মচারীরা জানতে পারেন তাদের ঠকানো হয়েছে। একাধিকবার ধরনা দিয়েও সেই টাকা আর উদ্ধার করতে পারেননি তারা।
অভিযোগ রয়েছে রিকশা গ্যারেজ, দোকানপাট ভাড়া দিতে এই তিন শ্রমিকনেতা ৩০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তিনামা করতেন। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলে সাধারণ কর্মচারীদের বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হতো, ক্ষেত্রবিশেষে অফিসে তুলে নিয়ে আসা হতো।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মদদে ইউনিয়ন সভাপতি ইউসুফ নবী ও সাধারণ সম্পাদক মো. শামীম মিঞা মহাখালীর নাখালপাড়া ও আগারগাঁওয়ের তালতলা এলাকায় সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলেন। এরা শ্রমিক লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য চাঁদা আদায় করতেন।
কোনো তথ্য ‘জানেন না’ সওজ কর্মকর্তারা
অনুসন্ধানে জানা যায়, সওজের এই তিন কর্মচারী সওজের ঢাকা সার্কেল, প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন ও সংস্থাপন বিভাগ, এস্টেট ও আইন শাখার কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ও যোগসাজশে এই লুটপাট ও চাঁদাবাজি চালিয়ে গেছেন। ভুক্তভোগী সওজ কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত ১৩ বছরে সওজের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা এসব অপকর্মে ইন্ধন দিয়েছেন।
সওজের এই তিন শ্রমিকনেতার বিষয়ে জানতে এ তিন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে খবরের কাগজ। এই তিন নেতার বিষয়ে কোনো অভিযোগ বা তথ্য জানেন না বলে তারা মন্তব্য করেন।
সওজের শ্রমিক ইউনিয়নের এই তিন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গত ২৮ অক্টোবর সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের তদন্ত ও শৃঙ্খলা শাখা থেকে সওজের প্রধান প্রকৌশলীকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কিন্তু এ খবর জানে না সওজের প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন ও সংস্থাপন সার্কেল। এই শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এ ধরনের কোনো চিঠির বিষয়ে আমার কাছে বা আমার সার্কেলে কোনো তথ্য নেই। এই তিন শ্রমিকনেতার বিষয়ে ভালো বলতে পারবে ঢাকা সার্কেল অফিস।’
সওজের জমি বেহাত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শ্রমিকনেতারা জমি দখল করে কী করেছেন, তা আমার একদম জানা নেই। আমার কাছে ঢাকা সার্কেল অফিস থেকে লিখিত অভিযোগ আসেনি।’
ঢাকা সার্কেল অফিসে যোগাযোগ করা হলে নির্বাহী প্রকৌশলী রিতেশ বড়ুয়া বলেন, ‘আমি জানি না এই তিন শ্রমিকনেতা কে কী করেছেন। জমি দখল করেছেন না চাঁদাবাজি করেছেন, তা বলতে পারব না।’
সওজের এস্টেট ও আইন কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ খানও এই তিন নেতার বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন। তিন শ্রমিকনেতা জমি দখল করে অবৈধভাবে দোকানপাট নির্মাণ করেছেন কীভাবে- জানতে চাওয়া হয় তার কাছে। তবে লতিফ খান কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।