আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ছিলেন জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহিদ এ এইচ এম কামারুজ্জামানের সন্তান। ফলে দলীয় সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিল তার নিবিড় সখ্য। সেই সম্পর্কের সুবাদে গত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে টানা চারবার নৌকা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনবার মেয়র নির্বাচিত হন। এতে ক্ষমতার দাপটে হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। ৯৪ বর্গকিলোমিটারের রাসিকে উন্নয়নযজ্ঞের নামে দখলে নেন সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জমি। নিজেদের সুবিধা হাসিলের স্বার্থে নির্বিকার ছিলেন সংশ্লিষ্টরা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্ট লিটনও আত্মগোপনে চলে যান।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাসিক এলাকার প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানেরই রয়েছে নিজস্ব জমি ও সীমানাপ্রাচীর। তবে নগরীতে রাস্তাঘাট সংস্কারসহ উন্নয়নযজ্ঞের নামে অনেক প্রতিষ্ঠানের মূল্যবান জমি দখলে নেন তৎকালীন নগরপিতা লিটন। ভেঙে ফেলেন সীমানাপ্রাচীর। ক্ষমতার দাপটে অনুমতি নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করতেন না তিনি। ক্ষতিগ্রস্তরা ভয়ে প্রতিবাদ করতে না পারলেও এখন আপত্তি তুলছেন অনেকেই।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২৯১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে মহানগরীর বর্ণালীসংলগ্ন বন্ধ গেট এবং নতুন বিলসিমলা লেভেল ক্রসিং পর্যন্ত ১ হাজার ২৫৫ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১২ মিটার প্রস্থের ফ্লাইওভার নির্মাণ করছে রাসিক। এ কাজে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সীমানাপ্রাচীরের ভেতর ফ্লাইওভারের পিলার বসানো হয়েছে। অথচ রাসিক এ জন্য কোনো অনুমতি নেয়নি। এমনকি মেডিকেল কলেজের অজান্তেই প্রতিষ্ঠানটির অনেকগুলো গাছও কেটেছে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ।
একই অবস্থা ঘটেছে রাজশাহী কলেজেও। তাদেরও সীমানাপ্রাচীর ভেঙে বর্ধিত করা হয়েছে সাহেববাজার থেকে কোর্ট পর্যন্ত সড়ক। আর রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজের প্রাচীর ভেঙে প্রশস্ত করা হয়েছে চালপট্টি থেকে বর্ণালীর মোড় পর্যন্ত রাস্তার। এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীর ভেঙে বর্ধিত করা হয়েছে কাজলা থেকে কড়ইতলা ও বিনোদপুরের সড়ক। এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমিতে উন্নয়নকাজ করলেও ব্যবহারের জন্য নেওয়া হয়নি বৈধ অনুমতি।
এদিকে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), রাজশাহীর জায়গা দখল করে নগরীর কাটাখালী-চোদ্দপাই-বিনোদপুর সড়ক বর্ধিতকরণের পাঁয়তারা করলেও উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে সরে আসেন লিটন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. খন্দকার মো. ফয়সল আলম বলেন, ‘উন্নয়নের স্বার্থে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমি আরেকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান নিতেই পারে। তবে এ ক্ষেত্রে অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। আর মেডিকেল কলেজ যেহেতু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে তাই এর মালিক ওই মন্ত্রণালয়। কলেজের জমি ব্যবহার না করার জন্য আমরা লিখিত আপত্তি জানিয়েছি। তবে বাধা তো দিতে পারি না। কারণ একনেকে পাস হয়েছে, আর সেখানেও সচিবরাই অনুমোদন দিয়েছেন।’
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্রদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে কয়েক দফায় ছাত্রদের নিয়ে আলোচনায় বসা হয়েছিল। কলেজের জমি দিতে ছাত্ররা প্রথমে রাজি হননি। পরে হোস্টেল করে দেওয়া, গ্যাসের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে শান্ত হন তারা। তবে এখনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি, প্রক্রিয়াধীন আছে। আর গাছ কাটার বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. সালেহ হাসান নকীব বলেন, ‘ক্যাম্পাসের জমিটি রাসিক কীভাবে নিয়েছে জানা নেই। তবে জমি ব্যবহারের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা এটি নিয়ে আলোচনা করছি। বিষয়টি দেখছি। যদি নিয়ম না মেনে এটি নেওয়া হয় তাহলে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
রাজশাহী বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. সেলিম খান বলেন, ‘আমাদের এই প্রতিষ্ঠানটি কেপিআই। তার পরও এটি তারা ভাঙতে চেয়েছিল। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানালে তৎকালীন মন্ত্রীর ধমকে লিটন সরে আসে। তবে কাটাখালী-চোদ্দপাইয়ের এই রাস্তা উঁচু করায় আমাদের ওয়াল নিচে পড়ে গেছে। এতে নিরাপত্তার সমস্যা হওয়ায় আনসার সদস্যদের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বিষয়টি মন্ত্রালয়কেও জানিয়েছি।’
রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. জুবাইদা আয়েশা সিদ্দীকা বলেন, ‘রাসিক অন্য প্রতিষ্ঠানের জমি যেভাবে নিয়েছে, আমাদের প্রতিষ্ঠানেরও সেভাবে নিয়েছে। তারা আমাদের কাছে চিঠি দিয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় আমাদের জমি দেওয়ার কোনো অনুমতি দেয়নি। তার পরও তারা এটি নিয়েছে।’
অনুমতি ছাড়া কীভাবে প্রাচীর ভেঙে জমি দখলে নিল- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এখন কীভাবে নিয়েছেন সেটি আপনারা সিটি করপোরেশনের কাছেই জানতে চান। আমাদের জানা নেই, কীভাবে তারা নিয়েছেন। তার পরও তারা ব্যবহার করছেন।’
রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মু. যহুর আলী বলেন, ‘রাজশাহী কলেজের হোস্টেলের সামনে রাস্তা সংস্কারের জন্য বেশ কিছু জমি সিটি করপোরেশন নিয়েছে। তবে সেটি নিয়ম মেনেই নিয়েছে বলে আমি জানি।’
এ বিষয়ে অনুমতিপত্র বা বৈধ কাগজপত্র আছে কি না জানতে চাইলে অধ্যক্ষ ছয় দিন সময় নেন। সেই সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো কাগজপত্র প্রতিবেদককে দেখাতে পারেননি তিনি।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাসিকের সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এ বি এম শরীফ উদ্দিন বলেন, প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকেই নিজেদের জমি ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। অন্যের জমি ব্যবহার করা উচিত নয়। যদি রাজশাহী সিটি করপোরেশন অন্যের কোনো জমি ব্যবহার করে সেটি দেখা হবে। কেননা যেকোনো উন্নয়নযজ্ঞ আইনগত নিয়ম মেনেই করা উচিত।
সার্বিক বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার খোন্দকার আজিম আহমেদ বলেন, ‘কোনো জমি ব্যবহার করলে নিয়ম মেনেই করতে হয়। এখন আমারও প্রশ্ন- অনুমতি ছাড়া এগুলো কীভাবে হলো। বিষয়টি নিয়ে এখন খোঁজখবর করা হবে।’