বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) গত বছর থেকেই এয়ারলাইনসগুলোর কাছ থেকে বকেয়ার টাকা তুলতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পার্কিংয়ে থাকা ১২টি উড়োজাহাজ নিলামের বিক্রির তোড়জোড় শুরু করে। তবে সম্প্রতি বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, এসব এয়ারলাইনসের অধিকাংশই তাদের উড়োজাহাজের বিপরীতে ঋণ নিয়েছে বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে। ফলে চাইলেই এসব উড়োজাহাজ নিলামে তুলতে পারবে না বেবিচক।
বেবিচক সূত্রে জানা যায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পড়ে থাকা ওই ১২টি উড়োজাহাজের মধ্যে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসেরই ৮টি। এ ছাড়া রিজেন্টের ২টি, জিএমজির ১টি ও এভিয়েনা এয়ারলাইনসের ১টি উড়োজাহাজ। আর দীর্ঘ এক যুগ ধরে পড়ে থাকা এসব উড়োজাহাজের পার্কিং চার্জ ও সারচার্জ ৮৫০ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ইউনাইটেডের কাছে পার্কিং চার্জ ও সারচার্জ বাবদ পাওনা ৩৫৫ কোটি টাকা এবং জিএমজি এয়ারলাইনসের কাছে পাওনা ৩৬০ কোটি টাকা।
দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় বেবিচকের। বিভিন্ন এয়ারলাইনসের অ্যারোনোটিক্যাল ও নন-অ্যারোনোটিক্যাল চার্জই কেবল সংস্থাটির আয়ের উৎস। বছর কয়েক আগে যাত্রী নিরাপত্তা ফি ও বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করলেও তা মোট ব্যয়ের তুলনায় নগণ্য। ফলে এয়ারলাইনসগুলোর কাছ থেকে এসব পাওনা আদায় হলে বেবিচক আর্থিক চাপ থেকে মুক্ত হবে বলে বলছেন সেখানকার কর্মকর্তারা।
বেবিচক সূত্র আরও জানায়, অকেজো এসব উড়োজাহাজ সরিয়ে নিতে মালিকপক্ষকে বারবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পার্কিং ও সারচার্জ জমা দেওয়ার ভয়ে সরিয়ে নেয়নি কেউ।
শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো নিলামে বিক্রির জন্য আমাদের পক্ষ থেকে যে যে ধাপ রয়েছে, সেগুলো সম্পন্ন করা হয়েছে। আর এসব উড়োজাহাজ যে এখন উড়তে পারবে না, এ বিষয় নিয়েও টেকনিক্যাল টিমের সঙ্গে মিটিংও হয়েছে। আমাদের জব্দ তালিকাও করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংককেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত করা উড়োজাহাজগুলো নিলামের জন্য এখন বেবিচকে কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেবিচকের এক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘বেবিচক চাইলেই এসব উড়োজাহাজ নিলামে তুলতে পারবে না। নিলামে তোলার আগে এসব উড়োজাহাজের মূল্য নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক বা প্রতিষ্ঠান লাগবে। তা ছাড়া এসব উড়োজাহাজ যেসব কোম্পানির, তারাও বলছে, বেবিচক চাইলেই নিলামে তুলতে পারবে না। আইনগত ঝামেলায় পড়বে। কারণ সব কোম্পানির ব্যাংকের কাছে দায় রয়েছে। ফলে ব্যাংক এগুলো বিক্রি করতে দেবে না।’
নিলামের বিষয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এ টি এম নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, যে এয়ারক্রাফটগুলোর ওপরে ঋণ বা অর্থঋণ মামলা আছে সেগুলোকে চাইলেই বেবিচক নিলাম করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে অনেক জটিলতা রয়েছে। কারণ যাদের কাছ থেকে উড়োজাহাজগুলোর বিপরীতে ঋণ নিয়েছে এয়ারলাইনসগুলো তাদের সেই ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত ওই উড়োজাহাজগুলোর দাবিদার তারাও।
এভিয়েশনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হিসেব করলে দেখা যাবে এসব উড়োজাহাজ নিলামে বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যাবে, তার থেকে এসব উড়োজাহাজের মূল্য নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক বা প্রতিষ্ঠানকে বেতন বাবদ বেশি টাকা দিতে হবে। অন্যদিকে প্রায় এক যুগ ধরে শাহজালালে এগুলো জায়গা দখল করে আছে। এগুলো না থাকলে ওই জায়গায় কমপক্ষে ৭টি উড়োজাহাজ রাখা যেত। সেগুলোর থেকে যে ভাড়া পাওয়া যেত তার সিকি ভাগও নিলামে বিক্রি করে পাওয়া যাবে না। ফলে দুই দিক থেকেই আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।