বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যাত্রাবাড়ীতে রিয়াজ মিয়া (৩০) নিহতের ঘটনায় তার স্ত্রী পরিচয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় মামলা করেন ফারজানা (২৫) নামের এক নারী। তবে তিনি আসল ফারজানা নন। মিথ্যা মামলা দিয়ে টাকা আদায় আর হয়রানি করতেই হয়ে ওঠেন মৃত রিয়াজের স্ত্রী। তবে ঘটনা প্রকাশের পর পালিয়েছেন এই ভুয়া মামলার বাদী। ফারজানার এমন কাণ্ডে ‘বিস্মিত’ আদালত ও তদন্তকারী সংস্থা।
পুলিশ জানায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট সকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন দিনমজুর রিয়াজ। এ ঘটনায় তার স্ত্রী ফারজানা বেগম (২৫) বাদী হয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন আদালতে মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। নিহত রিয়াজের স্ত্রী দুই কন্যাসন্তান নিয়ে ভাড়া থাকেন ডেমরা এলাকায়। তাদের গ্রামের বাড়ি ভোলার দৌলতপুরে।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, গত ২৮ অক্টোবর এই রিয়াজের মৃত্যুর ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় আরেকটি মামলা করেন একই নামের অন্য আরেক নারী (২৫)। মামলায় ঘটনাস্থল দেখানো হয় ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকাকে। ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করেন ফতুল্লার চরাঞ্চল বক্তাবলীর গোপালনগর। মামলায় সংযুক্ত করা হয় জন্মসনদও। মামলাটিতে অজ্ঞাতনামাসহ আসামি করা হয় ২০০ জনেরও বেশি মানুষকে।
বিষয়টি জানতে পেরে আদালতে ছুটে আসেন রিয়াজের আসল স্ত্রী ফারজানা। এরপর উন্মোচিত হয় আসল রহস্য। আদালতকে তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জে নয়, মামলাটি তিনি করেছেন ঢাকার আদালতে। ফতুল্লা থানার মামলার বাদী ভুয়া ফারজানা।
মামলার কপি জালিয়াতির মাধ্যমে হস্তগত করে ফারজানা সেজে মামলাটি করা হয়েছে বলে খবরের কাগজকে জানান নিহত রিয়াজের আসল স্ত্রী ফারজানা। তিনি বলেন, ‘ঘটনার আগের দিন রিয়াজ আন্দোলনে অংশ নেন। ৫ আগস্ট সকালে নাশতা খাওয়ার পর ঘর থেকে বেরিয়ে যান। সকাল ১০টার দিকে তাকে ফোন করলে জানান তিনি যাত্রাবাড়ী আছেন। ১২টার দিকে আবার ফোন করে দেখি তার মোবাইল বন্ধ। এরপর আমিসহ আমার বাবা রিয়াজকে খুঁজতে বের হই। আড়াইটার দিকে ফেসবুকে রিয়াজের ছবি দেখে গ্রামের এক আত্মীয় ফোন করে জানান সে মারা গেছে। পরে আমরা যাত্রবাড়ী থানার সামনে তার লাশ পাই। সেখান থেকে লাশ নিয়ে ভোলায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করি।’
তিনি বলেন, ‘রিয়াজের মৃত্যুর পর অনেকে সাহায্য করার কথা বলে আমার কাছ থেকে মামলার কাগজপত্র নিয়ে গেছে। সাহায্যের কথা বলে মামলার কপি জালিয়াতি করে নিয়ে ফারজানা নামের একজন ফতুল্লায় মামলা করেছে। আমি আদালতকে বলেছি, ওই মামলা আমি করি নাই। ফতুল্লার মামলার বাদী ভুয়া ফারজানা।’ আদালতে কথাগুলো বলার সময় পুলিশ উপস্থিত ছিল।
পুলিশের পরিদর্শক কাউয়ুম খান খবরের কাগজকে বলেন, গত ১১ ডিসেম্বর মামলা থেকে দুজন আসামির নাম বাদ দেওয়ার জন্য হলফনামা দিতে আমলি আদালতে আসেন ভুয়া ফারজানা। এ সময় আসল ফারজানা সেখানে হাজির হলে ‘বিস্মিত’ হন আদালত। এরপর আদালত মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে তলব করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে রিয়াজের প্রকৃত স্ত্রীকে শনাক্ত করতে নির্দেশ দেন। কিন্তু শুনানি শেষ হওয়ার পর ভুয়া ফারজানাকে আর পাওয়া যায়নি। তিনি আদালত থেকে পালিয়ে যান। এরপর আদালত তাকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন।
রিয়াজের স্ত্রী ফারজানার আইনজীবী অ্যাডভোকেট রিফাত বলেন, রিয়াজের স্ত্রীর মামলার কপি ও জন্মসনদ সংগ্রহের পর ঘটনাস্থল এবং ঠিকানা পরিবর্তন করে মিথ্যা মামলা করেন ফতুল্লার ওই নারী। তিনি একটি জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে জড়িত। নিরীহ মানুষদের হয়রানি করা আর মোটা অঙ্কের টাকার জন্য চক্রটি মিথ্যা মামলা করেছেন। সেই মামলার দুই আসামির কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়ে ওই দুই আসামির নাম বাদ দিতে হলফনামা করতে আদালতে আসেন।
ফতুল্লা থানায় করা ভুয়া ফারজানার মামলায় হয়রানির শিকার শিমরাইল এলাকার মাছ বিক্রেতা সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমিসহ আরও চারজন মাছ বিক্রেতার নাম দেওয়া হয়েছে এ মামলায়। অথচ রাজনীতি তো দূরের কথা, মিছিল-মিটিংয়ে আমি কখনো যাইনি। রোজ চার শ টাকার মজুরিতে মাছের আড়তে কাজ করি। এই দিয়ে সংসার চলে।’ মামলা হওয়ার পর থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে মামলার বিষয়ে জানতে ভুয়া ফারজানার ঠিকানায় গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। এজাহারে যে ফোন নম্বর দিয়েছেন, তাও অন্য আরেকজনের। তবে তার আইনজীবী মো. শাহীন হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু হলফনামা করেছি। মামলার বিষয়ে আমার জানা নেই। তদন্ত ছাড়াই মামলাটি নিয়েছে পুলিশ। মামলার দায়ভার তাদের, আমার আসল-নকল বোঝার উপায় ছিল না।’
ভুয়া ফারজানা এখন কোথায় আছেন, তা তিনি জানেন না দাবি করে বলেন, ‘তার (ফারজানা) ফোন নম্বর দিয়ে যাননি। বলে গেছেন আবার হলফনামা করতে এলে দেখা হবে। এখন তিনি কোথায় আছেন জানা নেই। পুলিশ তাকে খুঁজছে।’
তদন্ত ছাড়াই মামলা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শরিফুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চিন্তিত। ভুয়া বাদী সেজে মিথ্যা মামলা করা ফারজানার খোঁজ করা হচ্ছে।’
মামলাটি নিষ্পত্তিসহ ভুয়া বাদীর বিরুদ্ধে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে জানিয়ে ওসি বলেন, ‘আমরা আদালতে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করব। ভুয়া ফারজানাকে খুঁজে পেলেই বেরিয়ে আসবে কার ইন্ধনে তিনি মামলাটি করেছেন। মামলাটি নিষ্পত্তির আবেদনসহ ভুয়া বাদীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’
নারায়ণগঞ্জের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফারহানা মুনা বলেন, ‘শুধু ফতুল্লাতেই নয়, সিদ্ধিরগঞ্জ-সোনারগাঁসহ বিভিন্ন থানায় এমন মামলা হয়েছে। এ ধরনের মামলা ছাত্র হত্যার বিচার নিয়ে ষড়যন্ত্র। যারা এই ষড়যন্ত্র করছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’