কবরের চিহ্ন কিছুটা ধূসর হয়ে এলেও বাবা-মায়ের বুকে মেয়ে হারানোর ক্ষত ১৪ বছরেও মুছেনি। অশ্রুসিক্ত নয়নে বিচার না পাওয়ার হতাশা নিয়ে মেয়ের কবরের গায়ের ধুলোবালি পরিষ্কার করে চলেছেন ফেলানীর মা জাহানারা বেগম। অশ্রুপাত করেন বাবা।
আজ ৭ জানুয়ারি। ফেলানী হত্যার দিন। দিনটিতে দোয়া ও মিলাদের আয়োজন করে পরিবার। কয়েকদিন আগে থেকে কবরের ধোয়া-মোছা চলে। অন্য বছরগুলোর মতো এবারও কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনিটারী গ্রামে ফেলানীর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল এই দৃশ্য।
হত্যা ও বিচার
সীমান্তে কিশোরী ফেলানীকে গুলি করে চার ঘণ্টা ঝুলিয়ে থাকার দৃশ্য সারা বিশ্বে আলোচনার ঝড় তুললেও বিচার মেলেনি ১৪ বছরেও। খুনের দায় স্বীকার করলেও ফেলানীকে গুলি করা বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে দুই দুইবার খালাস দেয় বিএসএফের বিশেষ কোর্ট। ভারতের ‘মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (মাসুম)-এর সহায়তায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টে পুনর্বিচার চেয়ে ফেলানীর বাবার করা রিট গৃহীত হলেও শুনানি হয়নি আজও। ফেলানীর পর কুড়িগ্রামের বিভিন্ন সীমান্তে প্রাণ গেছে দুই ভারতীয়সহ অন্তত ২৯-৩০ জনের। এসব মৃত্যু তেমন আলোচনায় আসেনি। থামেনি সীমান্ত-হত্যা।
ফেলানী হত্যা নিয়ে বাবা নুরু
বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তঘেঁষা রামখানা ইউনিয়নের কলোনিটারী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন নুরুল ইসলাম নুরু। সংসারের টানাপোড়েন ঘোচাতে ঘটনার প্রায় ১২ বছর আগে দেড় বছরের ফেলানীকে নিয়ে স্ত্রী জাহানারাসহ অবৈধ পথে ভারতে যান। সেখানে বঙ্গাইগাঁও গ্রামে বসবাস শুরু করেন। ফেলানীর বয়স যখন ১৩, বাংলাদেশে তার বিয়ে ঠিক হয়। বিয়ে দেওয়ার জন্য বাবা নুরু মেয়েকে নিয়ে ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারি বঙ্গাইগাঁও থেকে রওনা দেন বাংলাদেশে। আসার সময় মেয়েকে বিয়ের সাজ পরিয়ে দিয়েছিলেন মা জাহানারা।
ওই দিন প্রথমে কাঁটাতার পাড় হন বাবা নুরুল ইসলাম। এরপর ফেলানী কাঁটাতার পাড় হতে মই বেয়ে ওপরে উঠলে ভারতের ১৮১ ব্যাটালিয়নের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ তাকে গুলি করলে কাঁটাতারে ঝুলে পড়ে ফেলানীর নিথর দেহ। প্রায় চার ঘণ্টা পর ফেলানীর লাশ কাঁটাতার থেকে নামিয়ে নিয়ে যায় বিএসএফ। ময়নাতদন্তের একদিন পর লাশ ফেরত দেয় তারা। ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম নুরু বলেন, ‘আমার চোখের সামনে আমার মেয়েকে গুলি কইরা মারছে। এ দৃশ্য আমি ভুলতে পারি না।’
বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমে সমালোচনা
কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর লাশের ছবি বিশ্ব গণমাধ্যমে উঠে এলে আলোচনার ঝড় ওঠে। এর চাপে ঘটনার আড়াই বছর পর ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট কোচবিহারের বিএসএফের কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। কোর্টে গুলি করার কথা স্বীকার করেন বিএসএফ২ সদস্য অমিয় ঘোষ। ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম ও মামা আবু হানিফ বিএসএফের বিশেষ কোর্টে সাক্ষ্য দেন। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর অমিয় ঘোষকে খালাস দেন কোর্ট।
বিএসএফ কোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টে হয়নি ন্যায্য বিচার
সুবিচার না পেয়ে ফেলানীর বাবা ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম)-এর সহায়তায় পুনরায় বিচার ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে আজও এই মামলার শুনানি হয়নি। ইতোমধ্যে কেটে গেছে প্রায় সাড়ে ৮ বছর। তবে ফেলানীর বাবার আইনজীবী জানিয়েছেন আজ (৭ জানুয়ারি) ফেলানীর মৃত্যুর দিনে সুপ্রিম কোর্টে শুনানির কার্যাদেশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
ফেলানীর পর ২ ভারতীয়সহ ৩০ মৃত্যু
ফেলানীর মৃত্যুর পর কুড়িগ্রাম সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে দুই ভারতীয়সহ ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত শতাধিক। নিহতরা হচ্ছেন- মিঠু মিয়া, আলমগীর হোসেন, সামচুল হক, মুকুল মিয়া, শ্যামল চন্দ্র বাদ্যকার, বায়েজিদ হোসেন, সবুর মিয়া, আবুল হাসেম, ছবিল উদ্দিন, জামাল উদ্দিন, হাসিনুর রহমান, ফুলু মিয়া, তাহারুল ইসলাম, নুরল আমিন, নুর ইসলাম, বাহারুল ইসলাম, মনসের আলী, খয়বর আলী, শাহিনুর রহমান, ফকির চাঁদ, আখিরুল ইসলাম, হাসিবুর রহমান, সহিবর রহমান, রাশেদুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী, আব্দুল বারেক, জাহাঙ্গীর আলম, আখেরুল ইসলাম ও সহিবর। এ ছাড়া সীমান্তে নদী পার হতে গিয়ে নদীতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে আরও দুই শিশুর।
বিচারের জন্য আর কত অপেক্ষা !
দীর্ঘদিন ধরে ফেলানী হত্যার সুষ্ঠু বিচারের দাবি করে আসছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। তারা এবারও গ্রহণ করেছে বিভিন্ন কর্মসূচি। ৭ জানুয়ারি ‘ফেলানী হত্যা দিবস’ ঘোষণা করারও দাবি উঠেছে।
১৪ বছর ধরে বিচারের অপেক্ষায় আছে ফেলানীর পরিবার। প্রতি বছর ৭ জানুয়ারিতে ফেলানীর বাড়িতে দোয়া ও মিলাদ হয়। ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম নুরু বলেন, ‘আমি ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছি। বর্তমান সরকারও যেন বিচারটা চায়। ভারতের কাছে বিচারের দাবি তোলে।’ ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘মেয়েকে হারিয়ে ১৪টা বছর ধরে কান্তাছি (কাঁদছি)। কত কান্দি, বিচার পাইলাম না। আমার পরিবারের জন্য কেউ কিছু করল না। খুব কষ্টে চলতাছি। এই সরকার যেন বিষয়টা দেখে।’
ফেলানীর হত্যা মামলায় তার বাবাকে আইনি সহায়তা দেওয়া অ্যাডভোকেট এসএম আব্রাহাম লিংকন বলেন, ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে ফেলানীর বাবার রিট পড়ে আছে। তারা চাইলে এর দ্রুত শুনানি শেষ করে রায় দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও তা হচ্ছে না। বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা করে দ্রুত বিচার করা উচিত। ফেলানীর বাবা যাতে ন্যায়বিচার পায় সেটা নিশ্চিত করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘পূর্ববর্তী রায়ে ফেলানীর বাবাকে পাঁচ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছিল। সেটাও আপিল করে রুদ্ধ করা হয়েছে। সেই ক্ষতিপূরণটা দেওয়া দরকার। ৭ জানুয়ারি (আজ) রিটের শুনানি হওয়ায় কথা রয়েছে। কিন্তু তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। আমরা চাই শুনানি হোক। বিচার দ্রুত শেষ হোক।’