এক হাতে দরজা আর অন্য হাতে নাক চেপে দাঁড়িয়ে আছেন এক নারী। আর বলছেন, ‘মা আমি দাঁড়ানো আছি। তুমি চিন্তা করো না।’ কিছুক্ষণ পরই সংকেত পেয়ে ওই নারী ধরে রাখা দরজা ছেড়ে দেন। ভেতর থেকে একটি মেয়ে বেরিয়ে আসে। মেয়েটিকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ক্ষুব্ধ কণ্ঠে ওই নারী বলছিলেন, ‘এটা হাসপাতালের টয়লেট! এত নোংরা। কেন হাসপাতালের টয়লেট এত নোংরা থাকবে? প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে আসে। টয়লেটের অবস্থা যদি এমন হয়, তাহলে মানুষজন কোথায় যাবে।’
এ ঘটনা গত ১৮ জানুয়ারির। তখন দুপুর ১২টা ৪০ মিনিট। কথা হয় হেলেনা নামের ওই নারীর সঙ্গে। তিনি রাজধানীর ওয়ারী থেকে চিকিৎসক দেখাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) বহির্বিভাগে এসেছেন। মেয়ের টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়লে বিভিন্ন জায়গায় টয়লেট খুঁজতে থাকেন। একজনের কাছে জানতে পারেন প্রবেশ গেটের দুই পাশে টয়লেট রয়েছে। একটিতে প্রবেশ করতে ৫ টাকা করে দিতে হয়। অন্যটিতে কোনো টাকা লাগে না। এটি প্রবেশ গেট থেকে বের হওয়ার আগে বাম পাশে। মেয়েকে নিয়ে তিনি সেখানে যান। কিন্তু ব্যবহার অনুপযোগী দেখে তিনি ক্ষুব্ধ হন।
হেলেনা বলেন, ‘এটা কি কোনো মানুষ ব্যবহার করতে পারে? টিস্যু না থাকুক, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা তো থাকবে।’ কথা বলার সময় নারীদের টয়লেট দেখিয়ে এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘ওটায় গিয়ে দেখে আসেন। বমি চলে আসবে।’
এই টয়লেটের ভবনটির পুরুষ লেখা অংশে দুটি টয়লেট এবং দুটি প্রস্রাবের জায়গা রয়েছে। প্রস্রাবের জায়গা দুটিতে প্রস্রাব জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। টয়েলেটের অবস্থা খুবই খারাপ। দরজার ছিটকিনি ভাঙা। নারীদের যে দুটি টয়লেট তার ভেতরে যাওয়ার পরিবেশ নেই। ওপরেই জমে আছে মলমূত্র। বাধ্য হয়ে নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই পুরুষ লেখা টয়লেট দুটিতে প্রবেশ করেন।
প্রতিদিন ঢামেকের বহির্বিভাগ এবং জরুরি বিভাগে অন্তত পাঁচ হাজার রোগী আসেন। রোগীর সঙ্গে অন্তত এক-দুজন স্বজন থাকেন। সেই অনুযায়ী নেই পর্যাপ্ত টয়লেট। নেই হাত জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা। তাই প্রতিদিন স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা মানুষদের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। ঢামেকের ইনডোরে গড়ে ৪ হাজার ২০০ জন করে রোগী ভর্তি থাকেন। তাদের সঙ্গেও এক-দুজন স্বজন থাকেন।
শুধু বহির্বিভাগেই নয়, ইনডোরের অধিকাংশ ওয়ার্ডের টয়লেটগুলো নোংরা। টয়লেটের ভেতর সাবান থাকা তো দূরের কথা, নেই সাবান রাখার ব্যবস্থাও।
শুধু ঢামেক নয়; ঢাকার সব সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও ওয়ার্ডের টয়লেটগুলোর বেশির ভাগের অবস্থাই এমন। তবে এদিকে কর্তৃপক্ষের নজর খুবই কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অকার্যকর এবং অপরিষ্কার টয়লেটের ব্যাপকতা হাসপাতালের স্যানিটেশন চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। সাবান বা হাত জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা না থাকায় টয়লেট ব্যবহারের পর তিনি যেখানে যা ধরছেন, তাতেই জীবাণু লাগছে। আর সেখানে যখন অন্য কেউ স্পর্শ করছেন, সেই জীবাণু তারও হাতে লাগছে। এভাবে একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে যাচ্ছে রোগ-জীবাণু। অপর্যাপ্ত এবং অপরিষ্কার টয়লেটের কারণে অনেকেই প্রস্রাব আটকে রাখেন। আর এ কারণে অনেকের কিডনি জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
কোভিড-পরবর্তী ঢাকার ১৩টি হাসপাতালের টয়লেট পরিস্থিতি জানতে একটি সমীক্ষা চালায় আইসিডিডিআরবি। এতে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনি এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সহযোগিতা করে, যা গত বছর প্লাস ওয়ান জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ২ হাজার ৮৭৫টি টয়লেটের মধ্যে ২ হাজার ৪৫৯টি টয়লেট পরিদর্শন করে গবেষক দল। রোগীর টয়লেটের সংলগ্ন হাত ধোয়ার বেসিনের মাত্র ২৬ শতাংশে হাত ধোয়ার জন্য একসঙ্গে পানি এবং সাবান পাওয়া যায়। বাকি ৭৪ শতাংশে একসঙ্গে সাবান-পানি পাওয়া যায়নি। টয়লেটগুলোর একটিতেও রোগীর ব্যবহারের জন্য টয়লেট পেপার সরবরাহ করেনি। ২ হাজার ৮৭৫টি টয়লেটের মধ্যে ৪১৬টি অর্থাৎ ১৪ শতাংশ টয়লেট পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি গবেষক দল। কারণ এর ১০ শতাংশে তালাবদ্ধ থাকা বা প্রবেশের অনুমতি না পাওয়া।
সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালের টয়লেটের ৬৮ শতাংশ এবং বেসরকারি হাসপাতালের ৯২ শতাংশ টয়লেট কার্যকর ছিল। সরকারি হাসপাতালে মাত্র ৩৩ শতাংশ টয়লেট পরিষ্কার ছিল। বাকি ৬৭ শতাংশ টয়লেট ছিল অপরিষ্কার। বেসরকারি হাসপাতালে ৫৬ শতাংশ টয়লেট পরিষ্কার ছিল।
আইসিডিডিআরবির সহযোগী বিজ্ঞানী এবং গবেষণার প্রধান তদন্তকারী ডা. মো. নুহু আমিন বলেন, ‘হাসপাতালের ইনডোরে রোগী অনুপাতে রেশিও ঠিক থাকলেও বহির্বিভাগে রোগী অনুযায়ী টয়লেট খুব কম পাওয়া যায়। স্ট্যান্ডার্ড হচ্ছে ৩০ জনের ব্যবহারের জন্য একটি টয়লেট থাকবে। কিন্তু বাস্তবে বহির্বিভাগে গড়ে ২১৪ জনের ব্যবহারের জন্য মাত্র একটি, কোনো এক প্রতিষ্ঠানে ৯০০ জনের জন্য একটি টয়লেট পাওয়া গেছে। আর বেসরকারি হাসপাতালে ৯৪ জনের জন্য একটি টয়লেট। মাত্র ৩ শতাংশ টয়লেটে স্যানিটারি প্যাড ফেলার বিন ছিল এবং ১ শতাংশেরও কম টয়লেটে প্রতিবন্ধীদের জন্য সুবিধা ছিল।’
ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, অপরিচ্ছন্ন টয়লেট উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, কলেরা ও টাইফয়েডের মতো রোগ ছড়াতে পারে। তবু টয়লেটের দিকে কর্তৃপক্ষের নজর কম। নজর কম থাকার কারণও জানতে পেরেছে আইসিডিডিআরবির গবেষক দল।
যেসব হাসপাতালের টয়লেট অপরিষ্কার ছিল, সেসব হাসপাতালের পরিচালকদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তারা বলেছেন, শীর্ষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয় রোগীর চিকিৎসায়, যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং সেগুলো নষ্ট হলে রক্ষণাবেক্ষণে। চিকিৎসায় অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু হলে জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চাকরি চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কিন্তু টয়লেটের বিষয়ে কেউ কখনো কিছু জিজ্ঞেস করে না। সে জন্য এই বিষয়ে তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তারা বলেছেন, ‘এটার গুরুত্ব বুঝলেও বিবেচনা করেন না। গুরুত্ব দেন সেবা প্রদানের বিভিন্ন বিষয়ে।’
গত ১৯ জানুয়ারি ঢামেকের বহির্বিভাগের নিচতলায় সরেজমিন দেখা যায়, সেখানে রোগী গিজগিজ করছে। যেন তিল ধারণেরও জায়গা নেই। নিচতলায় রয়েছে সার্জারি বিভাগ, মেডিসিন বিভাগ, স্ত্রীরোগ বিভাগ। কোথাও রোগীদের ব্যবহারের জন্য টয়লেট নেই। এমনকি গর্ভকালীন সেবা ও প্রসব-পরবর্তী সেবা বিভাগে ভেতরের টয়লেটেও তালাবদ্ধ। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে নাক-কান-গলা, মানসিক রোগ, ইউরোলজি, চক্ষু এবং যৌন ও চর্ম বিভাগ। ঢামেকের যৌন ও চর্ম বিভাগে দুটি টয়লেট থাকলেও তা শুধু এমও, এইচএমও এবং মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য। অর্থাৎ এখানে রোগী আর সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে বৈষম্য দেখা গেছে।
এ প্রসঙ্গে ডা. মো. নুহু আমিন বলেন, এটা কমিয়ে আনা সম্ভব। একজন সহযোগী অধ্যাপকের জন্য একটি টয়লেট রাখার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। শিক্ষকদের কয়েকজনের জন্য একটি টয়লেট রাখা যেতে পারে।
একটি সূত্র জানায়, যেকোনো প্রতিষ্ঠানেই ভর্তি রোগীদের জন্য যতসংখ্যক টয়লেট থাকে, হাসপাতালের স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক, কর্মকর্তা, নার্সসহ স্টাফদের জন্য সেই সংখ্যক টয়লেট থাকে। এই বৈষম্য কমিয়ে আনতে পারলে রোগীদের দুর্ভোগ কমবে।
ঢামেকের নাক-কান-গলা বিভাগে দুটি টয়লেট থাকলেও একটি তালাবদ্ধ। অন্যটি রোগীদের ব্যবহারের জন্য। তার ভেতরে সাবান থাকা তো দূরের কথা, সাবান রাখার জায়গাও নেই। এই টয়লেটটি নারী-পুরুষ সবাই ব্যবহার করেন। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রস্রাব ও মলত্যাগের সময় বেশি স্থান, গোপনীয়তা এবং সময়ের প্রয়োজনের কারণে নারীদের জন্য আলাদা টয়লেট থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে তাদের মাসিকের কথা বিবেচনা করে।
আইসিডিডিআরবির গবেষণায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় হাসপাতালেই পুরুষ ও মহিলা উভয় রোগীদের জন্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক টয়লেট ছিল। বিশেষত সরকারি হাসপাতালে ৭৯ শতাংশ টয়লেট মিশ্র-লিঙ্গের, ১১ শতাংশ পুরুষদের এবং ১০ শতাংশ নারীদের জন্য।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, এখানে ৭০০-এর মতো টয়লেট আছে। এত টয়লেট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য যেসংখ্যক জনবল প্রয়োজন তা নেই। যারা আছেন তারাও আন্তরিক না। যে কারণে কর্তৃপক্ষ যেভাবে চাচ্ছে, টয়লেট থেকে শুরু করে ওয়ার্ডগুলো সেভাবে পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘হাত জীবাণুমুক্ত করার উপকরণ টয়লেটে রাখা যায় না। চুরি হয়ে যায়। বালিশ, চাদর, ট্রলি পর্যন্ত চুরি হয়ে যায়। রোগীদের অনেকেই সচেতন নন। তারাও কমোডে টিস্যুসহ বিভিন্ন জিনিস ফেলে রাখেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ ও আন্তরিক জনবল প্রয়োজন।’
বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘হাসপাতালের টয়লেটে যদি সাবান না থাকে, রোগীরা যেন নিজের জীবনের স্বার্থে নিজ দায়িত্বেই হাত জীবাণুমুক্ত করেন। সে জন্য বাইরে বের হলে সঙ্গে সাবান বা স্যানিটাইজার রাখার পরামর্শ দেন তিনি। হাসপাতালে নেই বলে করবেন না, তা মোটেও ঠিক হবে না। কারণ আপনার সুরক্ষা নিয়ে সবার আগে আপনাকেই ভাবতে হবে।’
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাবান চুরি হয়ে যায় বলে অভিযোগ তুলে থাকে। সে ক্ষেত্রে স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে কেউ সাবান নিয়ে যেতে না পারে। দেয়ালে স্থায়ীভাবে লিকুইড সাবান রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। চাপ দিয়ে লিকুইড নিয়ে হাত ধুয়ে ফেলবে। এটা সবাই নাও জানতে পারে। দেয়ালে নির্দেশিকা লিখে লাগিয়ে রাখতে হবে। চুরি হয়ে যায় এই অজুহাতে টয়লেটে সাবান রাখা বন্ধ থাকবে, তা হতে পারে না।’
হাসপাতালের টয়লেট অপরিচ্ছন্ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পর্যাপ্ত ক্লিনার নিয়োগ দিতে হবে। সারা দিন একজন ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করালে হবে না। হাসপাতালে প্রতি ২ ঘণ্টা পরপর পরিষ্কার করতে হয়। বিমানবন্দরের টয়লেট যদি সব সময় পরিষ্কার রাখতে পারি, তাহলে হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর স্থান কেন পারব না।’
আইসিডিডিআরবির সহযোগী বিজ্ঞানী এবং গবেষণার প্রধান তদন্তকারী ডা. মো. নুহু আমিন বলেন, পর্যাপ্তসংখ্যক স্যানিটেশনকর্মী নিশ্চিত করে এবং এইচসিএফগুলোয় স্যানিটেশন সুবিধাগুলো উন্নত করার জন্য টয়লেট হাইজিন এবং আইপিসি সম্পর্কে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বাংলাদেশের হাসপাতাল এবং এলএমআইসিতে টয়লেটের প্রাপ্যতা, কার্যকারিতা এবং পরিচ্ছন্নতা আরও বিস্তৃতভাবে উন্নত করার জন্য মাল্টিসেক্টরাল পন্থা এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের পরিকল্পনা জরুরিভাবে প্রয়োজন।