জাতীয় পরিচয়পত্রের কার্যক্রম ও নির্বাচনি ডেটাবেজ সংরক্ষণের জন্য ৪৯টি নির্বাচন ভবন নির্মাণ করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। চারটি বিশেষায়িত নকশায় পরিকল্পনাধীন এই ৪৯ ভবনের মধ্যে একটি আঞ্চলিক, তিনটি জেলা ও ৪৫টি উপজেলায় স্থাপন করা হবে। প্রথম পর্যায়ে ৪৯টি ভবন নির্মাণের পর দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ২৮টি একই ধরনের ভবন নির্মাণ করা হবে।
এ বিষয়ে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, নতুন উপজেলাগুলোর কার্যক্রম নিজস্ব ভবনে স্থানান্তর এবং জেলা/উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচনি মালামালের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই প্রকল্প। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আগে নির্মিত পুরোনো ক্ষতিগ্রস্ত ৩৯৪টি নিজস্ব নির্বাচন ভবন সংস্কার এবং আয়তনে ছোট থাকা ভবনগুলোর উচ্চতা/আয়তন বাড়ানোর লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইসির পরিকল্পনা উন্নয়ন ও গবেষণা বিভাগ এবং আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নতুন ভবনের পরিকল্পনাধীন সব উপজেলাই নতুন; ফলে তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক নির্বাচন ভবন নেই। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ভবনের ফ্লোর ভাড়া নিয়ে চলছে কার্যক্রম। এই প্রকল্পের জন্য এখনো পরিচালক নিয়োগ করা না হলেও বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বেসরকারি একটি ফার্মকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা ভবনগুলো নির্মাণের নির্ধারিত স্থান পর্যবেক্ষণ ও মাটি পরীক্ষা করেছে। অঞ্চলভিত্তিক (হাওর, উপকূল ও সমতল) প্রাকৃতিক অবস্থা বিবেচনায় ভবনগুলোর নির্মাণে চার ধরনের নকশা তৈরি করা হয়েছে। এসবের মধ্যে শুধু বিভাগীয় নির্বাচন ভবন হবে চারতলা। আর প্রতিটি উপজেলা আঞ্চলিক ভবন হবে তিনতলা। আয়তন ৫ হাজার বর্গফুট থেকে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৮০০ বর্গফুট পর্যন্ত হবে। প্রতিটি ভবনের নিচতলায় রিসেপশন ছাড়াও গোডাউন থাকবে। নির্মাণ ব্যয়ের ক্ষেত্রে পিডব্লিউডির ২০২৩ সালের রেট শিডিউল অনুযায়ী প্রাক্কলিত ব্যয় প্রস্তুত করা হয়েছে; যা ৪৯৭ কোটি ৩৩ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, নতুন এই ভবনগুলোর অবস্থান হবে আট বিভাগের ১০টি অঞ্চলের ৩০ জেলায়। এর মধ্যে ঢাকায় একটি আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস ভবন নির্মাণ করা হবে। জেলা নির্বাচন ভবন তৈরি হবে শুধু ঢাকা, গাজীপুর ও মাদারীপুরে। অঞ্চল ও জেলাভিত্তিক উপজেলা নির্বাচন ভবন নির্মিত হবে ৪৫টি। সেগুলো হলো মুন্সীগঞ্জের লৌহজং, গাজীপুর সদর, ফরিদপুরের সালথা, মাদারীপুরের ডাসার, রাজবাড়ীর কালুখালী, গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া, ময়মনসিংহের তারাকান্দা, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী, বগুড়ার শাজাহানপুর, নাটোরের নলডাঙ্গা, সিরাজগঞ্জের চৌহালী, গাইবান্ধার ফুলছড়ি, দিনাজপুরের বিরল, বরগুনার তালতলী, পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী, পিরোজপুরের ইন্দুরকানী, খুলনার কয়রা, মেহেরপুরের মুজিবনগর, লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলায় অবস্থিত। এ ছাড়া কুমিল্লার সদর দক্ষিণ, লালমাই, মেঘনা, তিতাস ও মনোহরগঞ্জ; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর; চাঁদপুরের হাইমচর ও উত্তর মতলব; নোয়াখালীর সেনবাগ, বেগমগঞ্জ, কবিরহাট, সোনাইমুড়ি ও সুবর্ণচর; চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও সন্দ্বীপ; কক্সবাজারের পেকুয়া ও ঈদগাঁও; সিলেটের ওসমানীনগর ও দক্ষিণ সুরমা; সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ, দিরাই ও মধ্যনগর, মৌলভীবাজারের জুড়ি, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ এবং খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় ভবনগুলো নির্মিত হবে। এসব ভবনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৫টি ভবন নির্মিত হবে কুমিল্লা জেলায়। এ ছাড়া সিলেট জেলায় সাতটি, চট্টগ্রামে পাঁচটি, ফরিদপুরে চারটি, রাজশাহী ও বরিশালে তিনটি করে এবং ঢাকা, রংপুর, ময়মনসিংহ ও খুলনায় দুটি করে আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসারের কার্যালয় ও সার্ভার স্টেশন নির্মাণ করা হবে। তিনতলাবিশিষ্ট এসব ভবনের আয়তন নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ১০০ স্কয়ার ফুট থেকে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৮০০ স্কয়ার ফুট পর্যন্ত। গত বছরের সেপ্টেম্বরে হাতে নেওয়া এই প্রকল্পের কার্যকাল ধরা হয়েছে ২০২৫-এর জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত।
প্রকল্পের লক্ষ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচনি মালামাল রাখতে জেলা-উপজেলায় আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসারের কার্যালয় ও সার্ভার স্টেশনগুলোতে জায়গার সংকট দীর্ঘদিনের। এ ছাড়া নতুন ৪৫টি উপজেলায় নেই নিজস্ব ভবন। অফিসের কার্যক্রম চলছে ভাড়া বাড়ি বা ফ্ল্যাটে। নির্বাচনি সরঞ্জামগুলো স্থানীয় বিভিন্ন হাইস্কুল, কলেজের রুম ভাড়া নিয়ে রাখতে হচ্ছে। তবে আয়তন ও জনবলসংকটে অনেক নির্বাচন অফিসারের কার্যালয়ে রাখা বিভিন্ন সরঞ্জাম অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে, অপচয় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় অর্থ। এমন পরিস্থিতির উত্তরণে এ পর্যায়ে নতুন ৪৫টি উপজেলায় নির্বাচন ভবন নির্মাণের প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইসির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আগামী জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত সেবাসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনায় সংস্থার অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বাড়বে, সেবা গ্রহণকারী নাগরিকদের ভোগান্তি কমবে। প্রকল্পটি প্রথম পর্যায়ে যাচাই-বাছাই শেষে জনবল নির্ধারণের লক্ষ্যে নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের পদ সৃষ্টি/জনবল নির্ধারণ-সংক্রান্ত কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।