ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ধারণক্ষমতা চার হাজার হলেও বর্তমানে সেখানে রয়েছেন প্রায় আট হাজার। কাশিমপুর-২ কারাগারের ধারণক্ষমতা মাত্র ৩০০ জন, অথচ সেখানে বন্দি রাখা হয়েছে আড়াই হাজার! কেবল এই দুটি কারাগারই নয়, সারা দেশের সব কটি কারাগারেই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দি রয়েছেন। বাড়তি বন্দিদের চাপে এসব কারাগারের কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারাগারগুলোর ভেতরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। এর মাঝে প্রতিদিনই নতুন বন্দির সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিটি কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে গড়ে প্রায় দ্বিগুণ বেশি বন্দি আছেন। কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, সারা দেশে মোট কারাগারের সংখ্যা ৬৮টি। এর মধ্যে ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগার এবং ৫৫টি জেলা কারাগার। এসব কারাগারে সব মিলে বন্দি ধারণক্ষমতা মোট ৪২ হাজার ৫৯০ জন। তবে গত ২ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশের এসব কারাগারে বন্দি ছিলেন মোট ৬৯ হাজার জন।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ঢাকাসহ সারা দেশে শুরু হওয়া ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ চলমান রয়েছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এ অভিযানে গত ১ মার্চ পর্যন্ত (২১ দিনে) মোট ১২ হাজার ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডেভিল হান্টসহ অন্যান্য নিয়মিত মামলায় এই সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন মোট ৩০ হাজার ৩৮৫ জন। পুরোনো বন্দির পাশাপাশি নতুন বন্দি যুক্ত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই চাপ বেড়েছে কারাগারগুলোতে। যদিও এই সময়ে অনেক আসামি জামিনেও মুক্ত হয়েছেন; তারপরও কারাগারের অভ্যন্তরে ব্যবস্থাপনাগত বিষয়ে হিমশিম অবস্থা বিরাজ করছে বলে জানিয়েছেন কারাসংশ্লিষ্টরা।
কারা অধিদপ্তর ও পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, কারাগারগুলোতে প্রায় সময়েই বন্দির সংখ্যা ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশিই থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা বা ধরপাকড় বাড়লে বন্দির সংখ্যাও বেড়ে যায়। এর মধ্যে গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যৌথ বাহিনীর ‘অপারেশন ডেভিল হান্টে’ এবং অন্যান্য নিয়মিত অভিযানে বন্দির সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেড়ে গেছে। যদিও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও কোনো কোনো সময় এর চেয়েও আরও বেশিসংখ্যক বন্দি কারাগারগুলোতে ছিলেন বলে জানিয়েছেন কারাসংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে কারা অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) মো. জাহাঙ্গীর কবির খবরের কাগজকে বলেন, ‘বন্দির সংখ্যা ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত হলে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার ওপর প্রভাব পড়ে। একদিকে বিদ্যমান জনবল দিয়েই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। অন্যদিকে বন্দিদের থাকার কষ্ট, ঘুমের কষ্ট বাড়ে। যদিও জেলাখানার সবচেয়ে বড় কষ্ট হচ্ছে ইচ্ছেমতো চার দেয়ালের বাইরে যেতে না পারা। তবে পাঁচ আগস্ট-পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত বন্দির সংখ্যা সহনীয় পর্যায়ে আছে বলেই মনে হয়।’
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ঢাকা বিভাগের আওতাভুক্ত কারাগারগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কাশিমপুরের চারটি কেন্দ্রীয় কারাগার, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার। ঢাকা বিভাগের এসব কারাগার ছাড়াও দেশের প্রায় সব কারাগারেই অত্যধিক বন্দি রয়েছেন। ফলে গাদাগাদি অবস্থায় ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বন্দিদের। অন্যদিকে বাড়তি বন্দির চাপে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও দেখভালে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে কারারক্ষীদের।
এর মধ্যে গত রবিবার কারা অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুসারে, কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দি ধারণক্ষমতা রয়েছে চার হাজার। তবে এখানে এখন রয়েছেন আট হাজার বন্দি। গাজীপুরের কাশিমপুর কারা কমপ্লেক্সের চারটি কারাগারের মধ্যে কাশিমপুর কারাগার-১-এর ধারণক্ষমতা ৩০০ জন হলেও এখানে বন্দি রাখা হয় ১ হাজার। কাশিমপুর কারাগার-২-এর ধারণক্ষমতা ৩০০ জন, অথচ এখানে বন্দির সংখ্যা ২ হাজার ৫০০ জন। কাশিমপুর-৩-এর (মহিলা কারাগার) ধারণক্ষমতা ২১২ জনের স্থলে এখানেও বন্দি রয়েছেন ৪৫০ জন। এ ছাড়া কাশিমপুর-৪ (হাই সিকিউরিটি) কারাগারে বন্দির ধারণক্ষমতা যেখানে ১ হাজার, সেখানে আছেন ২ হাজার আসামি।
এদিকে গাজীপুর জেলা কারাগারে ৩০০ বন্দি ধারণক্ষমতার জায়গায় বর্তমানে রাখা হয়েছে ১ হাজার ৪০০ জনকে। নরসিংদী জেলা কারাগারে ৩৫০ জনের স্থলে রাখা হয় ৮০০ জনকে। এভাবেই দেশের প্রতিটি কারাগারেই ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ, কোথাও তারও বেশি কয়েদিকে রাখা হয়েছে। এতে করে মানবেতর অবস্থা বিরাজ করছে কারাগারগুলোতে।
এই পরিস্থিতি সম্পর্কে কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ধারণক্ষমতার বেশি বন্দি থাকলে মূলত দুই ধরনের সমস্যা বেশি হয়। প্রথমটি হচ্ছে, বন্দিদের থাকার খুব কষ্ট হয়। কারাসংশ্লিষ্টরা চাইলেও জায়গা দিতে পারেন না। দ্বিতীয়টি হলো তাদের দেখভাল করার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কারারক্ষী বাড়ানোর কোনো সুযোগ থাকে না। কারাগারের ভেতরে কারারক্ষীদের দায়িত্ব ও সময় ভাগ করে দেওয়া থাকে। অর্থাৎ ১০ জন বন্দির জন্য যে একজন কারারক্ষী দায়িত্ব পালন করেন, সেখানে বন্দির সংখ্যা ৫০ জন হলেও তাকেই একা সব সামলাতে হয়।
এর বাইরেও বন্দির সংখ্যা বেশি হলে কারাগারে তাদের গোসলখানা, টয়লেট ব্যবহারসহ নানাবিধ সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। কারণ কারাগারের ধারণক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই সেখানে গোসলখানা ও টয়লেটসহ আনুষঙ্গিক সবকিছু নির্মাণ করা হয়। কেবল খাবারের বিষয়টি বন্দির সংখ্যা অনুসারে ঠিকঠাক মতো বরাদ্দ হয়ে থাকে।
কারা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, দেশে কারাগারের ধারণক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প আর কোনো উপায় নেই। যদিও ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, খুলনা, নরসিংদী ও জামালপুরে কারাগার নির্মাণ ও সম্প্রসারণের কাজ চলমান রয়েছে। এই কাজগুলো শেষ হলে কারাগারগুলোতে বন্দিদের বাড়তি চাপ কিছুটা লাঘব হবে বলেও মন্তব্য করেন তারা।
এ প্রসঙ্গে কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘কারাগারের ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি বন্দি রয়েছেন। আমরাও কষ্ট করে তাদের ম্যানেজ (ব্যবস্থাপনা) করছি। তবে অতীতে আমরা এর চেয়েও বেশি বন্দি ম্যানেজ করে এসেছি। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের আছে।’