ফেব্রুয়ারিতে নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ এলাকায় জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে এক্সক্যাভেটর ড্রিলের আঘাতে চট্টগ্রাম ওয়াসার ৪৮ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ ফেটে যায়। ওই পাইপ মেরামত করতে সময় লাগে ৭-৮ দিন। এই সময়ের মধ্যে নগরের ৩০ এলাকায় দেখা দেয় তীব্র পানিসংকট। নাওয়া-খাওয়া থেকে শুরু করে নিত্যকাজে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হয় মানুষকে। এরপর গেল ৭ দিন ধরে নগরের আরও ২০ এলাকায় পানিসংকট দেখা দেয়। এবারও কারণ একই। প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে পাইপ ফাটিয়ে ফেলে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ। ফলে একই দশায় পড়তে হয় নগরের ২০টি এলাকার কয়েক লাখ মানুষকে। আর রমজান মাস হওয়ায় সেই ভোগান্তি বাড়ে কয়েক গুণ।
এভাবেই বিভিন্ন সংস্থার ভুলের মাশুল গুনতে হচ্ছে নগরবাসীকে। এ যেন পানিসংকটের শহর চট্টগ্রাম। আজ এখানে তো কাল ওখানে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। চসিক থেকে অনুমতি নিয়ে ওয়াসার কাছ থেকে পাইপের অবস্থান সম্পর্কে বুঝে নিচ্ছে সংস্থাগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এরপর মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন অন্য কেউ। ফলে পাইপ সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকায় প্রায় সময় ঘটছে দুর্ঘটনা।
জানা গেছে, গত ৮ মার্চ শনিবার রাতে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এর বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও সম্প্রসারণ শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে নগরের হালিশহরের সাগরিকায় ওয়াসার ১১০০ এম এম এর প্রধান পানি সঞ্চালন লাইন ফেটে যায়। সিডিএর মতো তারাও এস্কক্যাভেটর ড্রিল দিয়ে খনন করছিল। এরপর থেকে নগরের আগ্রাবাদ, গোসাইলডাঙ্গা, হালিশহর, বৌ বাজার, নতুন বাজার, ঈদগাঁ, বড়পুল, ছোটপুল, দেওয়ানহাট, পোস্তারপাড়, পানওয়ালাপাড়া, ধনীয়ালাপাড়া, মুহুরীপাড়া, পাহাড়তলী, কদমতলী, হাজীপাড়া, শান্তিবাগ, মাদারবাড়ি, মোগলটুলি, পাঠানটুলিসহ আশপাশের ২০টি এলাকায় পানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এমনিতেই ওই এলাকাগুলোতে আগে থেকেও পানিসংকট চলছিল দুই ধরনের পাইপ সংস্থাপনের কারণে।
গোসাইলডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা মো. আবু তাহের বলেন, ‘কখন এক লাইনে পানি থাকে আরেক লাইনে থাকে না। দুই ধরনের পাইপে পানি দেওয়া হচ্ছে। জাইকার নতুন পাইপের কাজ চলমান আছে। এসব কারণে পানিসংকট প্রায় সময় থাকে। তারপরও কোনো কারণে পাইপ ফাটলে তো কথা নেই। সেই সংকট আরও স্থায়ী হয়।’
হালিশহর বি-ব্লকের বাসিন্দা আরাফাত এলাহী বলেন, ‘৪ দিন ধরে পানি ছাড়াই জীবনযাপন করছি। আমি বন্ধুর বাসায় গিয়ে গোসল করেছি। কিন্তু মা-বোনেরা কোথায় যাবে? না সাহরি খেতে পারছি, না ইফতার। বোতলজাত পানি কিনে খাচ্ছি।’
সাহেদ নামে এক বাসিন্দা বলেন, পানি কেনার কোনো সামর্থ্য আমার নেই। রোজা রেখে ৫ কলসি পানি টেনেছি। খুব কষ্ট হয়েছে।’ আমেনা বেগম বলেন, ‘সারা দিন কাজ করেছি। এখন বিকেলে এসে পানি টানছি। না টেনে উপায় নেই। না হয় সাহরি, ইফতার কোনোটাই হবে না।’
এ বিষয়ে ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাগরিকার প্রধান সঞ্চালন পাইপ মেরামত শেষ হয়েছে। ভোর রাত থেকে পানি সরবরাহ শুরু হয়েছে। আস্তে আস্তে আমরা পানির চাপ বাড়াচ্ছি। কারণ যখন এটা মেরামত করা হয় তখন সেটা কাঁচা থাকে। এর ফলে পানির চাপ এখনি বাড়ানো যাচ্ছে না।’
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রামের স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিচালক আনোয়ার পাশা বলেন, ‘নিয়মানুযায়ী তারা (পিজিসিবি) ৫ ফিটের বেশি গভীরতায় যেতে পারবে না। কিন্তু পাওয়ার গ্রিড কেন মাটির ১১ ফিট গভীরে গেল। আমরা ক্ষতিপূরণ দাবি ও থানায় জিডি করেছি। একটি প্রধান পানি সঞ্চালন লাইন যখন অন্য কোনো পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়, তখন সেটা সারানো অনেক ধকল পোহাতে হয় আমাদের।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের প্রকল্প পরিচালক (চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ ) বিজয় কুমার দাসকে একাধিকবার কল করা হলে তিনি সাড়া দেননি।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘মেয়র মহোদয়ের কাছে এসব ব্যাপারে অনেক অভিযোগ আসছে। আগামীতে সংস্থাগুলো পাইপ লাইনে কোনো উন্নয়ন বা সংস্কার করতে অনুমতি চাইলে আমরা ভেবেচিন্তে দেব। তারা কতটা নিয়ম রক্ষা করছে সেগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করব।