বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি হওয়া রিজার্ভের বেশির ভাগ অর্থ এখনো উদ্ধার হয়নি। দেশি-বিদেশি চক্রের যোগসাজশে সাইবার সিস্টেম হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে রিজার্ভ চুরির সেই মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই রিজার্ভ চুরির ঘটনায় জড়িত মূল হ্যাকারদের ইতোমধ্যেই শনাক্ত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
এদিকে ৯ বছর আগের এই রিজার্ভ চুরির ঘটনা পর্যালোচনায় আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়েছে।
সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই রিজার্ভ চুরির ঘটনায় জড়িত পাঁচটি দেশের ৭৬ জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ অংশেও এক ডজনের বেশি সন্দেহভাজন রয়েছেন, যারা বাংলাদেশ ব্যাংকে তৎকালীন বিভিন্ন দায়িত্বশীল পদে ছিলেন। এ ছাড়া তদন্তের স্বার্থে আটটি দেশ থেকে প্রয়োজনীয় নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক হ্যাকারদের বিস্তারিত পরিচয়সহ প্রয়োজনীয় তথ্যাদি পাওয়ার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত ‘এফবিআই’ প্রতিনিধির সঙ্গেও আলোচনা করেছে তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি। এসব প্রক্রিয়া শেষ করে ‘দ্রুততম’ সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি চালাচ্ছে সিআইডি।
এ প্রসঙ্গে আরও জানতে চাইলে সিআইডি সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পর থেকে এখন পর্যন্ত মামলার তদন্তে সিআইডির বিশেষ টিমের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আছে। তদন্তাধীন বিষয় হওয়ায় সব কটিই গণমাধ্যমে প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তবে এসব অগ্রগতির সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান-সংস্থাকে জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বিষয়টি নিয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করা হচ্ছে।’
সিআইডি জানিয়েছে, ২০১৬ সালের ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি ভোরে একদল হ্যাকার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে ১৯২৬.১ মিলিয়ন ডলার চুরি করার চেষ্টা চালায়। ‘সুইফট’ সিস্টেমের মাধ্যমে ৭০টি অবৈধ পেমেন্ট ইনস্ট্রাকশন পাঠানো হয়, তবে ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃপক্ষ ৬৫টি ইনস্ট্রাকশন বন্ধ করতে সক্ষম হয়। চারটি লেনদেন সফল হলে ফিলিপিন্সের ‘আরসিবিসি’ ব্যাংক ও শ্রীলঙ্কার একটি ব্যাংকে তা পৌঁছে যায়। এই হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বমোট ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার চুরি করা হয়। এর মধ্যে ৮১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপিন্সের আরসিবিসি ব্যাংকের মাধ্যমে ক্যাসিনো চক্রের হাতে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালে ফিলিপিন্স থেকে ১৪.৬১ মিলিয়ন ডলার এবং শ্রীলঙ্কা থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনো উদ্ধার হয়নি ৬৬.৩৯ মিলিয়ন ডলার। যদিও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় অবশিষ্ট ওই ৬৬.৩৯ মিলিয়ন ডলার ফেরত আনতে সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা যায়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, হ্যাকিংয়ে জড়িত যে ৭৬ জনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন ফিলিপিন্সের ৪২ জন, শ্রীলঙ্কার ৮ জন, চীনের ১৭ জন, ভারতের ৮ জন এবং জাপানের ১ জন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সন্দেহভাজন কর্মকর্তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ ও ফরেনসিক তদন্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নরসহ ১২ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায় পেয়েছে সিআইডি। বাকি কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন একজন নির্বাহী পরিচালক, একজন মহাব্যবস্থাপক, পাঁচজন যুগ্ম পরিচালক, তিনজন উপমহাব্যবস্থাপক ও দুজন উপপরিচালক।
তদন্ত সূত্র জানিয়েছে, মামলা রুজুর পর তথ্য পাওয়ার জন্য ফিলিপিন্স, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, শ্রীলঙ্কা, বেলজিয়াম, ভারত, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় যোগাযোগ করা হয়। এর মধ্যে ফিলিপিন্স, ভারত ও জাপান থেকে জবাব বা তথ্য পেলে সেগুলো পর্যালোচনা করা হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জব্দ করা হার্ডডিস্ক ও ল্যাপটপসহ দলিল দস্তাবেজগুলো সিআইডির ফরেনসিক রিপোর্ট প্রাপ্তির পর পর্যালোচনা করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা আরও জানান, আন্তর্জাতিক তদন্ত ও মামলা চলমান- এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির বিষয়টি ফিলিপিন্স ও যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এরই মধ্যে তদন্তের প্রয়োজনে আটটি দেশ থেকে নানা তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে ফিলিপিন্স, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, শ্রীলঙ্কা, ভারত, বেলজিয়াম, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া। সিআইডি কর্মকর্তারা বলেছেন, আগে বিষয়টি নিয়ে কেবল সিআইডি এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করলেও বর্তমানে তদন্ত কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক)। এরই মধ্যে দুদককে মামলার নথিপত্রসহ তদন্তের নানা বিষয়ে সহযোগিতা করা হয়েছে।
মামলা ও তদন্ত প্রতিবেদন
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার ৩৯ দিন পর ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ ঢাকার মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়। দীর্ঘ এই ৯ বছরেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। এরই মধ্যে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পিছিয়েছে মোট ৭৭ বার। সর্বশেষ গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সে দিনও জমা না দেওয়ায় আগামী ৬ মের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
অন্যদিকে ২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক ৬৬ মিলিয়ন ডলার চুরি হওয়া রিজার্ভ পুনরুদ্ধারে মার্কিন আদালতে রিজাল ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করে। সেই মামলা এখনো চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।