দেশের ৬৮টি কারাগারের ৫৪টিতেই নেই কোনো অ্যাম্বুলেন্স। এসব কারাগারের বন্দিরা অসুস্থ হলে বড় বিপদে পড়েন সেখানকার দায়িত্বরতরা। উপায় না পেয়ে অসুস্থ বন্দিদের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় লেগুনা।
দেশের কারাগারগুলোতে বন্দি ধারণক্ষমতা মোট ৪২ হাজার ৫৯০ জন। তবে এই সংখ্যা সারা বছরই কমে-বেড়ে ৭০ হাজারের মধ্যে থাকে। যে ৫৪ কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স নেই সেসব কারাগারে বর্তমানে বন্দিসংখ্যা ৩৪ হাজার ৮৪০ জন। এত বন্দির জন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স না থাকাকে বড়সংকট বলে মনে করছেন কারাসংশ্লিষ্টরা।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ১০৭টি অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে প্রথম দফা একটি চিঠি দেয় কারা অধিদপ্তর। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কারা অধিদপ্তরকে বাজেট কাটছাঁট করতে বলা হয়। পরবর্তী সময়ে বাজেট কাটছাঁট করে সর্বশেষ ৪৬টি অ্যাম্বুলেন্সের কথা বলা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো অ্যাম্বুলেন্স পায়নি কারা অধিদপ্তর।
জানা গেছে, ৪৬টি অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে পাঠানো আবেদন নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চিঠি চালাচালি চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিষ্পত্তির অভাবে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার বিষয়টি এখনো ঝুলে আছে।
কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের ৬৮টি কারাগারের মধ্যে মাত্র ১৪টিতে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এর মধ্যে কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২টি অ্যাম্বুলেন্স, কাশিমপুর-১, কাশিমপুর-২, হাইসিকিউরিটি, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, যশোর এবং বরিশাল ও খুলনা কারাগারে ১টি করে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। কক্সবাজার কারাগারের একটি অ্যাম্বুলেন্স ছিল। কিন্তু সম্প্রতি এক সড়ক দুর্ঘটনার পর অ্যাম্বুলেন্সটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
কারাসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেন, কারাগারের বন্দিরা কিডনি, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্নায়ু, গ্যাস্ট্রিক, মানসিকসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত থাকেন। সাধারণ বন্দিদের পাশাপাশি ভিআইপি বন্দিরাও এখন বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অসুস্থ হলে এই বন্দিদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকার বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হয়ে থাকে। তাদের চিকিৎসার জন্য এখন অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে বলে কারা কর্মকর্তারা জানান।
তারা আরও বলেন, অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে একই সময় একাধিক বন্দিকে কারাগার থেকে হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হয় না। কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে বাধ্য হয়েই লেগুনায় পাঠানো হয়। এ ক্ষেত্রে দেখা যায় অনেক বন্দি পথেই মারা যান।
কারা অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন ১৫৭৭ জন। এ ছাড়া অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার সময় পথে মারা গেছেন ৪৯১ জন।
কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স সংকটের বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশের ৫৪ কারাগারে কোনো অ্যাম্বুলেন্স নেই। কারাগার থেকে পথে বা হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রায়ই অসুস্থ হয়ে বন্দিরা মারা যাচ্ছেন। এর একটি বড় কারণ হচ্ছে কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স নেই। এমনও কারাগার আছে যেখানে একাধিক অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন। কিন্তু আমরা দিতে পারছি না। তিনি জানান, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার, যশোর, কক্সবাজার, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট কারাগারে একাধিক অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘কারাগারে হঠাৎ একাধিক বন্দি অসুস্থ হলেও বড় বিপদে পড়েন সেখানে দায়িত্বরতরা। এ ছাড়া এখন কারাগারে অনেক ভিআইপি বন্দি রয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই জটিল রোগে আক্রান্ত। এমনও অনেকে আছেন যাদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবার প্রয়োজন হয়। অ্যাম্বুলেন্স না থাকার কারণে সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত ব্যবস্থা নিলে আমরা স্বস্তি পাব।’ যোগ করেন এই কারা কর্মকর্তা।
কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খবরের কাগজকে বলেন, অ্যাম্বুলেন্স সংকটের বিষয়টি অনেক আগেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। নিষ্পত্তির অভাবে বিষয়টি এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ে ঝুলে রয়েছে। আশা করি যথাযথ কর্তৃপক্ষ দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করবে।